চার মরদেহ নিয়ে বঙ্গোপসাগরে ভাসছে ট্রলার

বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে একজনের মরদেহ উদ্ধার করা গেলেও এখনো চার লাশ ভাসছে। দুর্ঘটনার তিন দিনেও মরদেহ উদ্ধার না হওয়া উৎকণ্ঠায় স্বজনরা। সরকারি কোনো উদ্ধারকারী নৌযান না থাকায় স্থানীয়ভাবে দুটি মাছ ধরার ট্রলার নিয়ে উদ্ধার অভিযান চালাচ্ছে ট্রলার মালিক সমিতি। তবে উত্তাল সাগরের কারণে অভিযান ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত উদ্ধারে সরকারি সহায়তা চেয়েছেন জেলেদের পরিবার।
জেলে ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত ২৪ আগস্ট দুপুরে বৈরী আবহাওয়ার কবলে পড়ে ডুবে যায় পাথরঘাটার ‘এফবি বরকত’ নামে মাছ ধরার ট্রলারটি। উপকূল থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরে এ দুর্ঘটনা ঘটে। ট্রলারটিতে ১৩ জন জেলে ছিলেন। দুর্ঘটনার পর অন্য একটি মাছ ধরার ট্রলারের জেলেরা সাগরে ভাসমান অবস্থায় আটজন জেলেকে জীবিত উদ্ধার করেন। তবে ট্রলারটি উল্টে যাওয়ায় নিখোঁজ হন আরও পাঁচ জেলে।
নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে সরকারি কোনো বিশেষায়িত উদ্ধারকারী নৌযান না থাকায় দুটি মাছ ধরার ট্রলার নিয়ে সাগরে অভিযান শুরু করে মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতি। তিন দিন ধরে চেষ্টা চালিয়েও উত্তাল সাগরের কারণে ডুবে যাওয়া ট্রলারটি নিয়ন্ত্রণে নিতে পারছেন না তারা। তবে ঢেউয়ের তোড়ে ডুবে যাওয়া ট্রলারটির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা এক জেলের মরদেহ উদ্ধার করেছেন তারা।
এদিকে, বাকি চারজনের মরদেহ উদ্ধারে সরকারি সহায়তা চেয়েছেন স্বজনরা। নিখোঁজ নুর আলম মোল্লার বাবা জাহাঙ্গীর মোল্লা বলেন, আমার বড় ছেলে সাগরে ট্রলার ডুবে নিখোঁজ রয়েছে। ধারণা করছি, ট্রলারের কেবিনের মধ্যে আটকে পড়ে মারা গেছে। যারা উদ্ধার করতে গেছে, তাদের মাধ্যমে জানতে পারছি কেবিনটি এখনো অক্ষত আছে। তাই মরদেহ কেবিনের মধ্যেই আছে। সরকারের কাছে দাবি জানাই, নৌবাহিনী পাঠিয়ে আমার ছেলের মরদেহ যেন উদ্ধার করে আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
বরগুনার পাথরঘাটা এলাকার জেলে মো. আল আমিন, রহিম মাঝি, আজিজ হাওলাদার ও মোহাম্মদ কামাল হোসেনসহ অনেক জেলে বলেন, বরগুনাসহ উপকূলের লাখ লাখ জেলে বঙ্গোপসাগরে মাছ শিকার করেন। জেলেরা সরকারকে শত শত কোটি টাকা রাজস্ব দেন। অথচ এই জেলেদের জীবন সুরক্ষার জন্য সরকারের উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম নেই। জেলেদের ট্রলার সাগরে ডুবে গেলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা করা হয় না।
তারা আরও জানান, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের কোনো জেলে বা ট্রলার সাগরে ডুবে গেলে তাদের সরকার হেলিকপ্টার ও নৌবাহিনীর উদ্ধারকারী নৌযান দিয়ে তাদের উদ্ধার করে। অথচ আমাদের দেশের জেলেদের উদ্ধারে সরকার কার্যকর কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করে না। তাহলে কি সরকার তাদের মানুষই মনে করে না?
ট্রলার মালিক সমিতির নেতারা জানান, বঙ্গোপসাগরে প্রায়ই ট্রলারডুবির ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনার শিকার জেলে ও ট্রলার উদ্ধারে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের কাছে একটি আধুনিক উদ্ধারকারী নৌযানের দাবি জানিয়ে আসছেন তারা। বিভিন্ন সময়ে আশ্বাস মিললেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে প্রতিবারই নিজেদের ট্রলার নিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ উদ্ধার অভিযানে নামতে হচ্ছে।
বাংলাদেশ মৎস্যজীবী ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি গোলাম মোস্তফা চৌধুরী বলেন, সাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতির চাকা সচল রাখছেন জেলেরা। তাদের জীবন রক্ষায় বঙ্গোপসাগরে দ্রুত একটি আধুনিক ও বিশেষায়িত উদ্ধারকারী নৌযান মোতায়েন করা প্রয়োজন।
তিনি আরও জানান, সম্প্রতি ডুবে যাওয়া ট্রলারটি উদ্ধারের জন্য ট্রলার মালিক সমিতি দুটি জেলে ট্রলার ঘটনাস্থলে পাঠিয়েছে। তিন দিন ধরে ট্রলারটি উদ্ধারের চেষ্টা করছেন তারা। তবে সাগর উত্তাল থাকায় ডুবে যাওয়া ট্রলারের কাছে ভিড়তে পারছেন না। তাই নিখোঁজ জেলেদের উদ্ধারে দ্রুত নৌবাহিনীর জাহাজসহ সরকারি উদ্ধারকারী নৌযান পাঠানোর দাবি জানিয়েছেন তিনি।
এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ জিয়া উদ্দিন জানান, বরগুনার লক্ষাধিক জেলে সাগরে মাছ শিকার করেন। দুর্ঘটনা হলে তাদের উদ্ধারের জন্য অনেক আগেই জেলায় একটি উদ্ধারকারী নৌযান থাকা উচিত ছিল। একটি উদ্ধারকারী নৌযানের জন্য খুব শিগগিরই মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠাব। পাশাপাশি, যারা এখনো সমুদ্রে নিখোঁজ রয়েছেন, তাদের উদ্ধারের জন্য নৌবাহিনীর সহযোগিতা নিতে তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হচ্ছে।


