logo

কক্সবাজার/সোনাদিয়া চ্যানেলে জলদস্যুদের তাণ্ডব, চার দিনে ১৫ ট্রলারে হামলা

সোনাদিয়া চ্যানেলে জলদস্যুদের তাণ্ডব, চার দিনে ১৫ ট্রলারে হামলা
হামলায় আহত কয়েকজন জেলে। ছবি : এশিয়া পোস্ট কোলাজ

কক্সবাজারের মহেশখালী উপকূলসংলগ্ন বঙ্গোপসাগরের সোনাদিয়া চ্যানেলে গত চার দিনে অন্তত ১৫টি মাছ ধরার ট্রলার জলদস্যুদের হামলা ও ডাকাতির শিকার হয়েছে বলে দাবি করেছেন জেলে ও ট্রলার মালিকেরা। এ সময় অস্ত্রের মুখে মাঝিমাল্লাদের জিম্মি করে ট্রলারগুলো থেকে আহরিত মাছ, জাল, জ্বালানি তেল, খাদ্যসামগ্রী ও ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ লুট করে নিয়ে যায় দস্যুরা।

জেলে ও ট্রলার মালিক সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, এসব হামলায় অন্তত ২০ জন জেলে আহত হয়েছেন। তাদের কয়েকজনকে মহেশখালী, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে ২৪ জন মাঝিমাল্লাসহ তিনটি ফিশিং ট্রলার নিখোঁজ রয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

তবে এসব হামলা ও নিখোঁজের বিষয়ে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে দস্যুদের কবলে পড়া ট্রলার, আহত কিংবা নিখোঁজ মাঝিমাল্লার সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিত করা হয়নি। কোস্টগার্ড জানিয়েছে, জলদস্যু দমনে সাগরে টহল ও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।

সোমবার মধ্যরাতে সোনাদিয়া চ্যানেলে জলদস্যুদের হামলার শিকার হন মহেশখালীর কুতুবজোমের বাসিন্দা ও ফিশিং ট্রলারের মাঝি কামাল উদ্দিন।

মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) দুপুরে তিনি বলেন, সোমবার রাত একটার দিকে আমার ট্রলারসহ কয়েকটি ট্রলার সাগরে মাছ ধরছিল। এ সময় একদল সশস্ত্র জলদস্যু ট্রলারগুলো ঘিরে ফেলে অতর্কিত হামলা চালায়।

কামাল উদ্দিন আরও জানান, জলদস্যুরা গুলি ও ধারালো অস্ত্র ব্যবহার করে জেলেদের ওপর হামলা চালায়। এতে ১০ জন জেলে আহত হন। পরে দস্যুরা আশপাশের আরও পাঁচটি ট্রলারে থাকা মাছ, জাল ও অন্যান্য মালামাল লুট করে নিয়ে যায়। আহত জেলেদের মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে ছয়জনকে উন্নত চিকিৎসার জন্য চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয় এবং চারজন স্থানীয়ভাবে চিকিৎসা নেন।

মহেশখালীর কালারমারছড়া জেলে কল্যাণ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আমির হোসেন বলেন, গত শুক্রবার থেকে রবিবার পর্যন্ত সোনাদিয়া চ্যানেলের পশ্চিমে ১২ বা’ এলাকায় ১০ থেকে ১২ জনের একটি সশস্ত্র দল ফিশিং ট্রলারে একের পর এক হামলা চালায়। জলদস্যুরা মাঝিমাল্লাদের মারধর করে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ট্রলারে থাকা মাছ, জাল, জ্বালানি তেল, খাদ্য ও ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ লুট করে নিয়ে যায়।

আমির হোসেনের দাবি, গত চার দিনে সোনাদিয়া চ্যানেলসংলগ্ন এলাকায় অন্তত ১০টি ফিশিং ট্রলার জলদস্যুদের হামলা ও ডাকাতির শিকার হয়েছে। প্রতিটি ট্রলার থেকে আনুমানিক সাত থেকে আট লাখ টাকার মালামাল লুট করেছে দস্যুরা।

এদিকে গত ৫ অক্টোবর কালারমারছড়ার মোহাম্মদ শাহ ঘোনা ঘাটে জলদস্যুদের হামলায় আহত কয়েকজন জেলে ফিরে এসেছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের মহেশখালী, কক্সবাজার ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে। আহতদের মধ্যে রয়েছেন মাহমুদুল হক মাঝি (৩৭), লকিয়াত উল্লাহ (৩২), আব্দুল মান্নান (৩৫), আব্দুল মজিদ (৩২), সাইফুল ইসলাম (২৮), মো. হাসান (২৪), সামুন (২৩) ও কামাল হোসেন মাঝি (৩৭)।

কালারমারছড়া জেলে কল্যাণ মৎস্যজীবী সমবায় সমিতির সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, ডাকাতির শিকার ট্রলারগুলো কালারমারছড়া, ধলঘাটা, ঘটিভাঙ্গা, গোরকঘাটা ও হোয়ানক এলাকার। কালারমারছড়ার মোহাম্মদ শাহ ঘোনার ওবায়দুল হক বহদ্দারের মালিকানাধীন দুটি এবং আহমদ উল্লাহ বহদ্দারের মালিকানাধীন একটি ট্রলারের ২৪ মাঝিমাল্লা এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

কালারমারছড়া বোট মালিক সমিতির সভাপতি আহমদ উল্লাহ বলেন, আমার ট্রলারসহ নিখোঁজ তিনটি ট্রলার ও মাঝিমাল্লাদের উদ্ধারে কোস্টগার্ড, নৌবাহিনীসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দ্রুত ও কার্যকর অভিযান চাই।

কক্সবাজার জেলা মৎস্য ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সভাপতি ও ট্রলার মালিক শওকত ওসমান ফারুক বলেন, সাগর শান্ত ও আবহাওয়া অনুকূল থাকলে জলদস্যুদের তৎপরতা বেড়ে যায়। বিভিন্ন মোহনা ও যেসব এলাকায় দস্যুরা আস্তানা গড়ে তুলেছে, সেখানে অভিযান চালিয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা প্রয়োজন। আমরা জলদস্যুমুক্ত নিরাপদ সাগর ও ব্যবসার নিরাপত্তা চাই। এজন্য সরকারের কাছে জোর দাবি জানাচ্ছি।

কক্সবাজার কোস্টগার্ড স্টেশনের কমান্ডার লে. কমান্ডার আরাফাত হোসেন বলেন, ডাকাত ও জলদস্যু দমনে কোস্টগার্ড নিয়মিত কাজ করছে। কক্সবাজার, মহেশখালী ও কুতুবদিয়াসংলগ্ন সমুদ্র এলাকায় বাণিজ্যিক জাহাজ ও মাছ ধরার নৌযানে সম্ভাব্য হামলার আশঙ্কায় মানুষের মধ্যে যে আতঙ্ক রয়েছে, তা দূর করতে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।

তিনি আরও জানান, জলদস্যু ও ডাকাত চক্রের অপতৎপরতা প্রতিহত এবং জড়িতদের গ্রেপ্তারের লক্ষ্যে নিয়মিত টহলের পাশাপাশি গোয়েন্দা তৎপরতা ও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। আধুনিক জাহাজ ও উচ্চগতির স্পিডবোটের পাশাপাশি রাডার, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা ও জিপিএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে সমুদ্র ও উপকূলীয় এলাকায় চলাচলকারী নৌযানের গতিবিধির ওপর তীক্ষ্ণ নজর রাখা হচ্ছে।