সিজারের পর পেটে গজ রেখে সেলাই, ৫১ দিন পর প্রসূতির মৃত্যু

ফরিদপুরে সিজারিয়ান অপারেশনের পর প্রসূতির পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ-ব্যান্ডেজ রেখে সেলাই করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক চিকিৎসকের বিরুদ্ধে। অপারেশনের প্রায় ৫১ দিন (এক মাস ২১ দিন) পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু হয়েছে ওই নারীর। এ ঘটনায় চিকিৎসকের বিরুদ্ধে অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগ এনে বিচার দাবি করেছেন নিহতের স্বামী।
নিহত নারীর নাম কনিকা মন্ডল। তিনি রাজবাড়ী জেলার বালিয়াকান্দি উপজেলার বহরপুর ইউনিয়নের বাঘুটিয়া গ্রামের অশান্ত মন্ডলের স্ত্রী। মৃত্যুকালে তিনি প্রায় দুই মাস বয়সি একটি কন্যাসন্তান রেখে গেছেন।
নিহতের স্বামী অশান্ত মন্ডলের অভিযোগ, গত ২৯ জুন তার স্ত্রী কনিকা মন্ডল অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলিপাড়ার সমরিতা জেনারেল হাসপাতাল লিমিটেডে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসক ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তের তত্ত্বাবধানে কনিকাকে ভর্তি করা হয়। ওই দিন সন্ধ্যায় সিজারিয়ান অপারেশনের মাধ্যমে কন্যাসন্তানের জন্ম দেন তিনি।
অশান্ত মন্ডল এশিয়া পোস্টকে জানান, অপারেশনের পরদিন থেকেই তার স্ত্রীর পেট অস্বাভাবিকভাবে ফুলে যায় এবং তীব্র ব্যথা শুরু হয়। বিষয়টি চিকিৎসককে জানানো হলেও তিনি তা নানাভাবে এড়িয়ে যান বলে অভিযোগ নিহতের স্বামীর। পরে কনিকাকে ফরিদপুর শহরের অন্য কয়েকটি হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও তার শারীরিক অবস্থার অবনতির কারণে তারা ভর্তি নিতে রাজি হয়নি।
পরবর্তীতে গত ৩ জুলাই কনিকাকে রাজধানীর কল্যাণপুরের ইবনে সিনা হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। সেখানে ৭ জুলাই ডা. আব্দুল জলিলের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসা শুরু হয়। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর চিকিৎসকরা কনিকার পেটের ভেতরে সার্জিক্যাল গজ-ব্যান্ডেজ থাকার বিষয়টি শনাক্ত করেন বলে দাবি পরিবারের।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, একই দিন অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে কনিকার পেট থেকে ওই সার্জিক্যাল গজ বের করা হয়। এরপর দীর্ঘদিন ইবনে সিনা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। তবে শেষ পর্যন্ত বুধবার (১৯ আগস্ট) দিবাগত রাত সোয়া ২টার দিকে চিকিৎসাধীন অবস্থায় কনিকা মন্ডল মারা যান।
অশান্ত মন্ডলের দাবি, ডা. লক্ষ্মী রানী দত্ত হোয়াটসঅ্যাপে একটি বার্তা পাঠিয়ে ভুল স্বীকার করেছেন এবং ক্ষমা চেয়েছেন। বার্তাটিতে লেখা ছিল—
‘দাদা নমস্কার। ভালো থাকুন ঈশ্বরের কাছে সেই প্রার্থনা করি। সব কথার আগে করজোরে ক্ষমা প্রার্থী। ভুল মানুষেরই হয়...আমি ভুল করে ফেলেছি... আবারও ক্ষমা চাচ্ছি দাদা।’
অশান্ত মন্ডল বলেন, আমার স্ত্রীর পেটে গজ রেখে সেলাই করার কারণেই তার শারীরিক অবস্থার চরম অবনতি হয়। দীর্ঘদিন লড়াইয়ের পর সে মারা গেল। এখন এই দুই মাসের শিশুটিকে আমি কীভাবে মা-ছাড়া বড় করব? আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও দায়ীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই।
অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে ফরিদপুরের মুজিব সড়কে অবস্থিত সমরিতা হাসপাতালে গিয়ে ডা. লক্ষ্মী রানী দত্তকে পাওয়া যায়নি। তার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। হাসপাতালের এক কর্মচারী জানান, প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের বাসায় গিয়ে যোগাযোগ করা যেতে পারে।
পরে ঝিলটুলির টেরাকোটাসংলগ্ন ‘অচিন্ত্য টাওয়ারে’ চিকিৎসকের বাসায় গিয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও দেখা মেলেনি। বাসার দারোয়ান নাইম মোল্লা জানান, চিকিৎসক বাসায় আছেন; তবে তাকে যেন কেউ বিরক্ত না করেন, সে বিষয়ে নির্দেশ দেওয়া আছে।
সার্বিক বিষয়ে সমরিতা হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মহশিন শরীফ বলেন, আমার হাসপাতালে এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেছে বলে জানা নেই। তবে সাংবাদিকরা ফোন করে জানিয়েছেন যে, আগে একটি ঘটনা ঘটেছিল এবং সেই রোগী মারা গেছেন।
এ বিষয়ে ফরিদপুরের সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদুল হাসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিষয়টি আমার জানা ছিল না, সাংবাদিকদের মাধ্যমেই প্রথম শুনলাম। ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে তদন্ত সাপেক্ষে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



