দেশীয় মাছ কমছে দাদুড়িয়া বিলে, হারানোর শঙ্কায় পলো বাওয়া উৎসব

ভোর হতেই পলো, হুসা ও জাল হাতে বিলে নামেন শত শত মানুষ। কারও লক্ষ্য বড় মাছ ধরা, কারও কাছে এটি বাপ-দাদার স্মৃতি ধরে রাখার আয়োজন। তবে তিন ঘণ্টা পর অনেকেই ফিরেছেন সামান্য মাছ নিয়ে, কেউবা খালি হাতে। মানুষের ভিড়ে উৎসবের আমেজ থাকলেও মাছের স্বল্পতায় ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার দাদুড়িয়া বিলের পলো বাওয়া উৎসবে এবার আনন্দের চেয়ে হতাশাই বেশি ছিল।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সকাল ছয়টা থেকে ৯টা পর্যন্ত চলে এ আয়োজন। আশপাশের বিভিন্ন গ্রাম থেকে আসা মাছ শিকারি ও দর্শনার্থীদের ভিড়ে মুখর ছিল বিলপাড়। কেউ কাঁধে পলো, কেউ হাতে হুসা, আবার কেউ জাল নিয়ে বিলে নামেন। পানিতে পলো চেপে মাছ ধরার চেষ্টা, এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ছুটে চলা এবং পরিচিতদের সঙ্গে আড্ডায় সময় কাটে তাদের। তবে উৎসবের মূল আকর্ষণ মাছ শিকারেই ছিল হতাশা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় এ বিলে শিং, মাগুর, কই, বাইন, শোল, টাকি, পুঁটি, মলা ও ঢেলাসহ নানা দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। এখন আগের মতো মাছ মেলে না। এবারের আয়োজনেও সেই পরিবর্তন স্পষ্ট হয়েছে বলে জানান তারা।
গুনবহা গ্রামের বাসিন্দা মিকাইল বলেন, বাবা-দাদার সময় থেকে চলে আসা ঐতিহ্য ধরে রাখতেই পলো ও হুসা নিয়ে বিলে এসেছেন। তবে এবার আশানুরূপ মাছ পাননি। তার অভিযোগ, চায়না দুয়ারি জালের অতিরিক্ত ব্যবহার দেশীয় মাছ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ। এভাবে মাছ কমতে থাকলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো পলো বাওয়া উৎসবের কথা শুনবে, কিন্তু তা দেখার সুযোগ পাবে না।
আলফাডাঙ্গা থেকে আসা মাছ শিকারি আজিজুল ফকির বলেন, অনেক আশা নিয়ে বিলে এসেছিলেন। কিন্তু মাছ কম থাকায় প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। আয়োজনে অংশ নেওয়ার আনন্দ থাকলেও মাছ না পাওয়ার আক্ষেপ রয়ে গেছে।
শাহাবুল নামের আরেক মাছ শিকারি জানান, পলোতে মাছ না পেয়ে অনেকে বাঁশের কাঠামোয় মশারির কাপড় লাগানো বিশেষ হুসা দিয়ে ছোট মাছ ধরার চেষ্টা করেন। তাতেও তেমন মাছ মেলেনি।
কুশাডাঙ্গা গ্রামের ইমরান বলেন, পুরোনো দিনের স্মৃতি ধরে রাখতেই তারা এ আয়োজনে অংশ নেন। কেউ কিছু মাছ পেয়েছেন, কেউ ফিরেছেন খালি হাতে। তার মতে, দেশীয় মাছ রক্ষার পাশাপাশি পলো বাওয়ার মতো গ্রামীণ ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতেও কার্যকর উদ্যোগ দরকার।
বোয়ালমারী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার অতিরিক্ত দায়িত্বে থাকা পবিত্র কুমার দাস বলেন, দাদুড়িয়া বিলে দেশীয় মাছ কমে যাওয়ার বিষয়ে তাদের কোনো জরিপ নেই। তবে মাছের প্রজনন ও পোনা রক্ষায় জালের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
তিনি বলেন, মাছের ডিম থেকে পোনা হওয়ার পর সেগুলো সূক্ষ্ম ফাঁসের জালে আটকা পড়লে বংশবিস্তার বাধাগ্রস্ত হতে পারে। তাই নিষিদ্ধ বা ক্ষতিকর জালের ব্যবহার বন্ধ করা প্রয়োজন।
মৎস্য বিভাগের এ কর্মকর্তা আরও বলেন, জনবলসংকটে নিয়মিত অভিযান চালানো কঠিন। চায়না দুয়ারি জাল জব্দ করতেও নানা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়তে হয়। কিছু ব্যবসায়ী গোপনে এসব জাল বিক্রি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রেও নজরদারির সীমাবদ্ধতা আছে।