logo

সংরক্ষিত বনে এক মহিষ চরাতে ২ হাজার টাকা, গাছ কেটে খাল দখল!

রাকিবুল ইসলাম তনু
পটুয়াখালী
সংরক্ষিত বনে এক মহিষ চরাতে ২ হাজার টাকা, গাছ কেটে খাল দখল!
পটুয়াখালীর দশমিনার সংরক্ষিত বনাঞ্চলে মহিষ চরানো নিয়ে অর্থ বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সংরক্ষিত বনাঞ্চল, সরকারি সম্পদ রক্ষার দায়িত্ব বন বিভাগের। অথচ পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার চর হায়দর, লালচর ও আগলা চরের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরের খালেই দেওয়া হচ্ছে বাঁধ। কোথাও আবার মাটি ও গাছ কেটে তৈরি করা হয়েছে ছোট ছোট ‘বিট’। এসব খালে মাছ ধরার সুযোগ দিতে জেলেদের কাছ থেকে নেওয়া হচ্ছে টাকা। এমনকি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে মহিষ চরাতেও দিতে হচ্ছে অর্থ। এমনি অভিযোগ স্থানীয় জেলে, পশুপালক ও বাসিন্দাদের।

তাদের দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্র বন বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তাদের ‘ম্যানেজ’ করে দীর্ঘদিন ধরে সংরক্ষিত বনাঞ্চলের খাল ও বনভূমি নিয়ন্ত্রণ করছে। টাকা না দিলে খালে মাছ ধরার সুযোগ মেলে না। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম এসব জলাশয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করা জেলেদের অনেকেই এখন নিজেদের পরিচিত খালেও মাছ ধরতে পারছেন না।

বাঁধে আটকে গেছে খালের স্বাভাবিক প্রবাহ

স্থানীয়দের অভিযোগ, বনাঞ্চলের ভেতরে থাকা প্রবাহমান খালের বিভিন্নস্থানে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও বনাঞ্চল থেকে মাটি কেটে ও গাছপালা কেটে এসব বাঁধ তৈরির অভিযোগও রয়েছে। বাঁধ দিয়ে খালের একেকটি অংশকে ছোট ছোট এলাকায় ভাগ করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে এসব অংশকে ‘বিট’ হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এরপর সেখানে চাইসহ বিভিন্ন ধরনের নিষিদ্ধ জাল দিয়ে মাছ ধরার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, মাছ ধরতে আগ্রহী জেলেদের এসব ‘বিট’ ব্যবহারের জন্য দিতে হয় নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা। টাকা না দিলে তাদের খালে প্রবেশ কিংবা মাছ ধরতে বাধা দেওয়া হয়।

ফলে একদিকে জেলেদের জীবিকা সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়ে জলজ পরিবেশ ও মাছের প্রজননক্ষেত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

স্থানীয় জেলে শাহাবুদ্দিন বলেন , এসব খালে মাছ ধরার সুযোগ এখন আর সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের টাকা দিলেই কেবল মাছ ধরার সুযোগ পাওয়া যায়।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরো বেশ কয়েকজন জেলে বলেন, মাছ ধরতে টাকা দিতে না পারলে তাদের খালে যেতে বাধা দেওয়া হয়। এতে বাধ্য হয়ে দূরের এলাকায় যেতে হয় অথবা মাছ ধরা বন্ধ রাখতে হয়।

তাদের অভিযোগ, এসব বিষয়ে প্রতিবাদ করলে নানা ধরনের চাপ আসে। হামলা, মামলা ও হয়রানির ভয় দেখানো হয় বলেও দাবি করেছেন কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা।

তীর দশমিনা ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের মৎস্যজীবী দলের সাবেক সহসভাপতি নেছার রাড়ি, একই ওয়ার্ডের সদস্য হাবিব চৌকিদার সংরক্ষিত বনাঞ্চল নিয়ন্ত্রণ করছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।

patuakhali9

এ বিষয়ে দশমিনা ইউনিয়নের নেছার রাড়ি বলেন, আমি আমার মাছ ধরি, কাউকে টাকা দেই না। মাছ ধরে ভাত খাই। কেডা কি করে আমি জানি না। আপনার নামে অভিযোগ প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি জড়িত না এগুলো মিথ্যা বানোয়াট।

দশমিনা বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন এবং চর হায়দর বিট কর্মকর্তা রওশন হাসানের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে এসব বনাঞ্চল ও খাল ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করা হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

মহিষ চরাতেও ‘খাজনা’

বনাঞ্চল ঘিরে অর্থ আদায়ের অভিযোগ শুধু মাছ ধরার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। পশুপালকদের অভিযোগ, সংরক্ষিত বনাঞ্চলে মহিষ চরানোর জন্যও নেওয়া হচ্ছে টাকা।

স্থানীয় মহিষ মালিক সালাউদ্দিন আহমেদ শিমুল বলেন, একটি মহিষ বনাঞ্চলে চরাতে প্রায় ২ হাজার টাকা করে দিতে হয়। ফলে যেসব পরিবার মহিষ পালন করে জীবিকা নির্বাহ করে, তাদেরও বাড়তি অর্থ গুনতে হচ্ছে।

দশমিনা রেঞ্জ কর্মকর্তা মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বলেন, কাউকে বনাঞ্চল লিজ দেওয়া হয়নি। কেউ কেউ দলীয় প্রভাব বিস্তার করে থাকতে পারে। তবে যারা গাছ কেটেছে, বন বিভাগ তাদের বিরুদ্ধে মামলা দিয়েছে। সেই কারণে সংশ্লিষ্টরা এখন এমন অভিযোগ করতে পারেন।

স্থানীয়দের প্রশ্ন, যদি বনাঞ্চল লিজ দেওয়া না হয়ে থাকে, তাহলে খালের বিভিন্ন অংশে বাঁধ নির্মাণ ও মাছ ধরার নিয়ন্ত্রণ কারা করছে? আর বনাঞ্চলে মহিষ চরানোর নামে অর্থ আদায়ের ঘটনাই বা কারা ঘটাচ্ছে?

নিষিদ্ধ জালে মাছের প্রজননেও হুমকি বাড়ছে। এ বিষয়ে পটুয়াখালী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা বিজন কুমার নন্দী বলেন, চাইসহ অন্যান্য অবৈধ জাল দিয়ে মাছ ধরা মৎস্যসম্পদের জন্য ক্ষতিকর। বিশেষ করে ছোট মাছ ও জলজ প্রাণী নির্বিচারে ধরা পড়লে প্রাকৃতিকভাবে মাছের বংশবিস্তার ব্যাহত হতে পারে। একই সঙ্গে খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ বন্ধ করে মাছ ধরার ব্যবস্থা করা হলে জলজ প্রতিবেশের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

‘সংরক্ষিত বনভূমি লিজ দেওয়ার সুযোগ নেই’

অভিযোগের বিষয়ে উপকূলীয় বন বিভাগের সহকারী বন সংরক্ষক মোসা. নুরুন্নাহার বলেন, সংরক্ষিত বনভূমি লিজ দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। খালগুলো দ্রুত অবমুক্ত করার পাশাপাশি স্থানীয়দের করা অভিযোগের বিষয়টি তদন্ত করা হবে।

সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরে যদি দীর্ঘদিন ধরে খালে বাঁধ দেওয়া, মাটি কাটা, গাছ কাটার মতো কর্মকাণ্ড চলে থাকে, তাহলে বন বিভাগের মাঠপর্যায়ের তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে।

স্থানীয়রা বলছে, একটি বাঁধ একদিনে তৈরি হয় না। এর জন্য মাটি কাটতে হয়, শ্রমিক লাগে, নির্মাণসামগ্রী লাগে এবং নিয়মিত মাছ ধরার কার্যক্রম পরিচালনার জন্য লোকজনও প্রয়োজন হয়। ফলে স্থানীয়দের অভিযোগ সত্য হলে এসব কর্মকাণ্ড সম্পূর্ণ অগোচরে চলার বিষয়টি খতিয়ে দেখা জরুরি। একইভাবে, যদি নিয়মিত জেলেদের কাছ থেকে অর্থ আদায় করা হয়ে থাকে, তাহলে সেই অর্থের পরিমাণ, আদায়ের পদ্ধতি এবং কারা এর সঙ্গে যুক্ত এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।

উপকূলীয় বনাঞ্চল শুধু গাছের সমষ্টি নয়। ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের সময় উপকূলের মানুষের সুরক্ষা, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় এসব বনাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু সংরক্ষিত বনভূমির ভেতরে গাছ কাটা, মাটি কাটা, খালে বাঁধ দেওয়া কিংবা অর্থের বিনিময়ে বন ও জলাশয় ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হলে তার প্রভাব শুধু কয়েকজন জেলে বা পশুপালকের ওপর পড়বে না—ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে পুরো উপকূলীয় পরিবেশ।

স্থানীয় জেলে, পশুপালক ও বাসিন্দাদের দাবি, সংরক্ষিত বনাঞ্চলের ভেতরের সব অবৈধ বাঁধ দ্রুত অপসারণ করতে হবে। খালের স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে দিতে হবে, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার বন্ধ করতে হবে এবং অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে।