তালা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করে ফায়ার সার্ভিস

ভোরের আলো ছড়াচ্ছে চারদিকে। ফোন এলো ফায়ার সার্ভিসে–আগুন লেগেছে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। আগুন নেভাতে ছুটে যায় বাহিনীর ১০টি ইউনিট। কিন্তু প্রথমেই তারা প্রতিবন্ধকতার শিকার হয়। হাসপাতালের গেটে তালা দেওয়া থাকায় তা ভেঙে ভেতরে প্রবেশ করতে হয়েছে। প্রায় এক ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়। ততক্ষণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অনেক কিছুই।
খুলনা ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মাসুদ সরকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, ভোর ছয়টার দিকে আগুন লাগার খবর পাই। প্রথমে তিনটি ও পরে সাত ইউনিট পাঠানো হয়। প্রথমে কিছু প্রতিবন্ধকতা ছিল। সব গেটে তালা দেওয়া ছিল, যা ভেঙে ভেতরে ঢুকতে হয়েছে।
তিনি বলেন, প্রায় এক ঘণ্টা পর আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। চারতলা ভবনের তিনতলার স্টোর রুমে আগুন ছিল। প্রথমে আমরা জানালা দিয়ে ৪-৫ জনকে উদ্ধার করি। আগুন নির্বাপন শেষে অন্য কোনো কাউকে হতাহত পাইনি।
এশিয়া পোস্টের হাতে আসা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, একজন নার্স আতঙ্কিত হয়ে তৃতীয় তলার জানালা দিয়ে বের হয়ে নিচে নামার চেষ্টা করছেন। তাকে উদ্ধারের জন্য ফায়ার সার্ভিস কর্মী হাত পেতেছেন। পা পিছলে ওই নার্স নিচে পড়ে গুরুতর আহত হন। এ সময় আরও দুইজন নার্স এবং একজন কর্মচারী আহত হন।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, সিনিয়র স্টাফ নার্স নওরিন, সিনিয়র স্টাফ নার্স দিপালী ও শারমিন এবং এক কর্মচারী (পরিচয় জানা যায়নি) আহত হয়েছেন। দিপালী ও শারমিন খুলনা সিটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তাদেরকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকায় পাঠানোর কথা রয়েছে। সেবা দেওয়ার অনুপযোগী হওয়ায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছে নিবিড় পচির্যা কেন্দ্রের (আইসিউ) রোগীদের। বন্ধ রয়েছে সব ধরনের অস্ত্রোপচার।
বড় দুটি বিস্ফোরণ
জরুরি অস্ত্রোপচার ও পোস্ট অপারেটিভ ইউনিট অবস্থিত হাসপাতালের তৃতীয় তলার বি ব্লকে। এই দুই ইউনিটের মাঝখানে পোস্ট অপারেটিভ স্টোর। আগুন লাগার সময় সেখানে দায়িত্ব পালন করছিলেন মো. রেজাউল।
তিনি দেখেন–আগুর লাগার পর শুরু হয় হুড়োহুড়ি। অস্ত্রোপচারের পর পোস্ট অপারেটিভ ইউনিট থেকে রোগীদের সরানোর চেষ্টা চলছিল। হঠাৎ বড় দুটি বিস্ফোরণের শব্দ হয়। আগুন ধরে যায় পোস্ট অপারেটিভ ইউনিটে।
রেজাউল এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রথমে হালকা ধোঁয়া দেখা যাচ্ছিল। প্রথমে অস্ত্রোপচার ইউনিটের রোগীদের সরিয়ে পেছনের দরজা দিয়ে সরিয়ে নেওয়া হয়। আইসিইউ থেকেও কয়েকজনকে বের করা হয়। মুহূর্তেই সব জায়গা ধোঁয়াচ্ছন্ন হয়ে যায়। মনে হয় শর্টসার্কিট থেকে আগন লেগেছিল।
অস্ত্রোপচার ইউনিটের এনেস্থেশিয়া কনসালট্যান্ট ডা. কাঞ্চন বলেন, শর্ট সার্কিট বা এসির আউটডোর বিস্ফোরণ থেকে আগুন লাগতে পারে মনে হচ্ছে। পুরো ওটি (অস্ত্রোপচার) ইউনিট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। আমার রুমসহ বেশির ভাগ জায়গা ব্যবহার অনুপোযোগী হয়ে গেছে।
রোগীর মৃত্যু
আইসিইউ থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার সময় নাসরিন নাহার নামে এক রোগীর মৃত্যু হয়েছে। তিনি খুলনার কয়রা উপজেলার নেছার আলীর মেয়ে। অক্সিজেন সংকটের কারণে তিনি মারা গেছেন বলে চিকিৎসকরা জানান।
হাসপাতালের আইসিইউ ইনচার্জ দিলীপ কুমার বলেন, ধোঁয়ার মধ্যে রোগীদের স্থানান্তর করছিলাম। আতঙ্কিত হয়ে নাসরিন নাহার নামে রোগীকে তার স্বজনরা সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন। বাইরে নেওয়ার পর সেই রোগী মারা যান। আইসিইউ থেকে রোগী স্থানান্তরের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া আছে। ভেন্টিলেশন খুলে নিজেরা নেওয়ার চেষ্টার কারণে ওই ঘটনা ঘটে থাকতে পারে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিদর্শন ও তদন্ত কমিটি গঠন
আগুনের ঘটনার খবর পেয়ে ছুটে গেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী মো. সরদার সাখাওয়াত হোসেন। দুপুর ১২টা ৫০ মিনিটে হাসপাতালে পৌঁছান। তার সঙ্গে ছিলেন খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু।
সেখানে আগে থেকে উপস্থিত ছিলেন খুলনা জেলা প্রশাসক হুরে জান্নাত, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মুজিবর রহমান, খুলনা মেডিকেল কলেজেরর অধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. গোলাম মাসুদ, হাসপাতাল পরিচালক ডা. কাজী আইনুল ইসলাম, সিভিল সার্জন ডা. মাহমুদা খাতুন।
হৃদরোগ বিভাগ হয়ে ঘটনাস্থলে যান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পাঁচ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছি। কমিটির প্রধান করা হয়েছে জেলা প্রশাসককে। বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আগে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গুরুতর আহতদের উন্নত চিকিৎসার জন্য প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি বলেন, গত ১৭ বছর কোনো কিছু কেনাকাটা (হাসপাতালের) করা হয়নি, হয়েছে শুধু লুটপাট। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার এবং অন্তবর্তী সরকার কেউ এই খাতে নজর দেয়নি। খুব শিগগিরই স্বাস্থ্য খাতের সব সমস্যা সমাধান করা হবে।
