logo

নদী-চরের জীবনে ঘোড়ার গাড়িই জীবনরেখা

নদী-চরের জীবনে ঘোড়ার গাড়িই জীবনরেখা

দূরে বিস্তীর্ণ বালুচর। মাঝে মাঝে সরু নদীর ধারা, কোথাও আবার শুকনো বালির মাঠ। দিগন্তজোড়া এই চরভূমিতে নেই পাকা সড়ক, নেই আধুনিক কোনো যানবাহনের চিহ্ন। তবুও থেমে নেই জীবন। এখানে প্রতিদিনই চলছে মানুষের বেঁচে থাকার সংগ্রাম—আর সেই সংগ্রামের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য সঙ্গী ঘোড়ার গাড়ি।

সরেজমিনে কুড়িগ্রাম জেলার বিভিন্ন চর ঘুরে দেখা যায়, বালির পথ পাড়ি দিয়ে শত শত ঘোড়ার গাড়ি ছুটে চলছে এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। জেলা শহর থেকে ব্যবসায়ীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য কিনে এসব গাড়ির মাধ্যমে পৌঁছে দিচ্ছেন প্রত্যন্ত চরে। যেখানে মোটরচালিত যানবাহন পৌঁছাতে পারে না, সেখানে এই বাহনই হয়ে উঠেছে নির্ভরতার প্রতীক।

ঘোড়ার গাড়ির চালকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একটি গাড়ি তৈরি করতে খরচ হয় প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা। পুরোনো মাইক্রোবাসের চাকা ব্যবহার করে তৈরি করা হয় এসব গাড়ি। আর একটি ঘোড়া কিনতে লাগে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে কষ্ট করে গড়ে তোলা এই বাহনই তাদের সংসারের একমাত্র অবলম্বন। দিনভর কঠোর পরিশ্রম করে একজন চালক আয় করেন প্রায় ৮০০ থেকে ৯০০ টাকা। এই আয়ের ওপরই নির্ভর করে পরিবারের ভরণপোষণ, সন্তানের লেখাপড়ার খরচ।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একসময় রাজা-বাদশার বাহন হিসেবে পরিচিত ঘোড়া সময়ের বিবর্তনে আজ চরাঞ্চলের সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকার প্রধান অবলম্বন। রাজকীয় ঐতিহ্যের সেই বাহন এখন হয়ে উঠেছে সংগ্রামী মানুষের নিত্যসঙ্গী।

ঘোড়ার গাড়িচালক সিরাজুল ও রহিম বলেন, ‘আমাদের চরে অন্য কোনো যানবাহন চলে না। এই ঘোড়ার গাড়িই আমাদের সব। সারাদিন চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই সংসার চলে।

কুড়িগ্রাম সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের ঝুনকার চরের বাসিন্দা ছামিউল ইসলাম বলেন, ‘আমাদের চরে কোনো যানবাহন নেই। কৃষিপণ্য হাট-বাজারে নিতে ঘোড়ার গাড়িই একমাত্র ভরসা।’

সদরের যাত্রাপুর ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আব্দুল গফুর বলেন, ‘চরাঞ্চলে ঘোড়ার গাড়ি এখন অন্যতম প্রধান পরিবহন। বিশেষ করে শুকনো মৌসুমে এ পেশায় আয় ভালো হলেও বন্যার সময় কাজ বন্ধ হয়ে গেলে চালকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়। অনেকেই দিনমজুরির কাজ ছেড়ে ঘোড়ার গাড়ি চালানোকে পেশা হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। যাত্রাপুর ঘাট থেকে বিভিন্ন হাট-বাজারে মালামাল পরিবহনে এই গাড়ির ভূমিকা রাখছে।’bigStoryContent

এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের আহ্বায়ক শ্যামল ভৌমিক বলেন, ‘১৬টি নদ-নদী বেষ্টিত এই জেলায় চার শতাধিক চর রয়েছে। এসব এলাকায় আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা নেই বললেই চলে। তাই ঘোড়ার গাড়িই হয়ে উঠেছে চরের মানুষের জীবনরেখা। পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে হাটবাজার—জীবনের প্রতিটি প্রয়োজনেই তারা নির্ভর করছেন এই বাহনের ওপর।’