logo

পাকা আমের ঘ্রাণে মুখর বানেশ্বর হাট, হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা

পাকা আমের ঘ্রাণে মুখর বানেশ্বর হাট, হাজার কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা
আমের মোকাম পুঠিয়ার বানেশ্বর বাজার। ছবি: সংগৃহীত

ঈদের বিরতির পর জমে উঠেছে রাজশাহীর আমের বাজার। জেলার গ্রামাঞ্চলের ছোট হাট থেকে শুরু করে বড় আড়তেও এখন চোখে পড়ে বিভিন্ন জাতের পাকা আমের সমারোহ। আমের ঘ্রাণে প্রাণ ফিরে পেয়েছে জেলার অন্যতম বৃহৎ আমের মোকাম পুঠিয়ার বানেশ্বর বাজার। জেলায় চলতি মৌসুমে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার আম বেচাকেনা হবে বলে জানিয়েছেন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের জেলার উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন।

প্রতিদিন ভোর থেকেই বানেশ্বর বাজারমুখী সড়কগুলোতে দেখা যায় আমবোঝাই ভ্যান, ট্রলি ও ছোট যানবাহনের দীর্ঘ সারি। রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা থেকে উৎপাদিত আম এসে জমা হচ্ছে বাজারের শতাধিক আড়তে। দেশের বিভিন্ন জেলা, বিশেষ করে ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা, সিলেট ও কুমিল্লার ব্যবসায়ীরা এখান থেকে আম কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।

বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, বর্তমানে গুটি, গোপালভোগের পাশাপাশি হিমসাগর, লক্ষণভোগ, রানীপছন্দসহ বিভিন্ন জাতের আম উঠতে শুরু করেছে। পাইকারি কেনাবেচার পাশাপাশি খুচরা ক্রেতারাও পরিবারের জন্য আম কিনতে ভিড় করছেন হাটে।

বানেশ্বর বাজারের একাধিক আড়তদার জানান, পুঠিয়া, বাঘা, চারঘাট, দুর্গাপুর, বেলপুকুরসহ রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ আম বাজারে আসছে। অধিকাংশ আম গাছপাকা হওয়ায় স্বাদ ও গুণগত মান ভালো। দূরবর্তী জেলায় পাঠানোর জন্য কিছু আম আধাপাকা অবস্থায় সংগ্রহ করা হলেও বাজারে টাটকা আমের সরবরাহ রয়েছে পর্যাপ্ত।

বর্তমানে বাজারে জাতভেদে প্রতি মণ গুঁটি আম ৮০০ থেকে ১ হাজার, গোপালভোগ ১ হাজার ৬০০ থেকে ১ হাজার ৮০০, লকনা ৯০০ থেকে ১ হাজার, হিমসাগর ২ হাজার থেকে হাজার ২ হাজার ২০০, লক্ষণভোগ বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ১ হাজার ১০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। এ বছর ১০ জুন থেকে ব্যানানা ম্যাংগো ও ল্যাংড়া, ১৫ জুন থেকে আম্রপালি ও ফজলি, ৫ জুলাই থেকে বারি আম-৪, ১০ জুলাই থেকে আশ্বিনা ও ১৫ জুলাই থেকে গৌড়মতি আম সংগ্রহ করা যাবে।

আমচাষিরা বলছেন, প্রশাসনের নির্ধারিত সময়সূচি মেনে এবার আম সংগ্রহ করা হচ্ছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও সন্তোষজনক হয়েছে। তবে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় কিছুটা হতাশ চাষিরা।

আমচাষি রাকিবুল ইসলাম বলেন, ‘এবার গাছে প্রচুর আম ধরেছে। ফলন ভালো হলেও বাজারদর তুলনামূলক কম। আশা করছি, মৌসুমের মধ্যভাগে দাম কিছুটা বাড়বে।’

বাঘা উপজেলার আমচাষি আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এবার আবহাওয়া মোটামুটি অনুকূলে থাকায় আমের ফলন ভালো হয়েছে। গাছে আমও বেশ সুন্দর হয়েছে। তবে বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় মৌসুমের শুরুতে প্রত্যাশিত দাম পাওয়া যাচ্ছে না। আশা করছি, সামনের দিকে দাম কিছুটা বাড়বে।’

আমচাষি সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘জেলা প্রশাসনের নির্ধারিত সময় মেনেই আমরা আম সংগ্রহ করছি। এতে বাজারে অপরিপক্ব আম কম যাচ্ছে এবং ক্রেতারাও ভালো মানের আম পাচ্ছেন। তবে আমের খরচ বেশি এবার। আমারা প্রত্যাশিত দাম পেলে লাভবান হব।’

অপরদিকে বিক্রেতারা বলছেন, ভোর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন বিভিন্ন এলাকা থেকে আম বাজারে আসছে। সরবরাহ ভালো থাকায় ক্রেতারাও বেশি আসছেন। তবে বাজারে আমের পরিমাণ বেশি হওয়ায় দাম কিছুটা চাপের মধ্যে রয়েছে।

জাব্বির হোসেন নামে এক আম ব্যবসায়ী বলেন, ‘এখন গোপালভোগ, হিমসাগর ও বিভিন্ন আগাম জাতের আমের বেচাকেনা চলছে। কয়েক দিনের মধ্যে আরও নতুন জাতের আম বাজারে আসবে। তখন কেনাবেচার পরিমাণও অনেক বেড়ে যাবে।’

নাসির হোসেন নামে অপর আম বিক্রেতা বলেন, ‘ঢাকা, চট্টগ্রাম, খুলনা ও সিলেট থেকে ব্যবসায়ীরা নিয়মিত আম কিনতে আসছেন। ফলে রাজশাহীর আমের প্রতি মানুষের আস্থা আছে, বাজারও জমজমাট। সামনে ল্যাংড়া ও আম্রপালি উঠলে বাজার আরও জমজমাট হবে বলে আশা করছি।’

এদিকে রাজশাহীর সুমিষ্ট আমের চাহিদা ব্যাপক। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে এখন এ আম বিদেশেও রপ্তানি হচ্ছে। ইতি মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশ এবং আমেরিকায় রপ্তানি হয়েছে। এ বছরও বেসরকারিভাবে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপের বিভিন্ন দেশে আম যাবে।

রাজশাহী কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, রাজশাহীতে এ বছর ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমির আমবাগান থেকে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৯৯৩ টন আম উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী জেলার উপ-পরিচালক মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, এবার রাজশাহীতে আমের ভালো ফলন হয়েছে। এই মৌসুমে বড় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ হয়নি। আমারা আশা করছি, চলতি মৌসুমে প্রায় ৮০০ থেকে ১ হাজার কোটি টাকার আম বেচাকেনা হবে।