logo

লোকসান কাটিয়ে আগাম আলু চাষে ব্যস্ত নীলফামারীর কৃষকেরা

লোকসান কাটিয়ে আগাম আলু চাষে ব্যস্ত নীলফামারীর কৃষকেরা
নীলফামারীতে আগাম আলু রোপণের ব্যস্ততা কৃষকেরা। ছবি: এশিয়া পোস্ট

গত মৌসুমে আলুর বাজারদর ছিল হতাশাজনক। উৎপাদন খরচ তুলেও লোকসান গুনতে হয়েছে অনেক কৃষককে। সেই ক্ষত কাটিয়ে নতুন মৌসুমে আগাম আলু চাষে আবারও বিনিয়োগ করছেন তারা। লক্ষ্য শীত আসার আগেই নতুন আলু বাজারে তুলে চড়া দাম পাওয়া এবং আগের বছরের লোকসান পুষিয়ে ঘুরে দাঁড়ানো।

নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার মাঠজুড়ে এখন আগাম আলু রোপণের ব্যস্ততা। আমন ধান কাটার পরপরই উঁচু জমি প্রস্তুত করে আলুর বীজ বুনছেন কৃষকেরা। কারও জমিতে রোপণ শেষ, কেউ ব্যস্ত জমি তৈরিতে। অনুকূল আবহাওয়া ও তুলনামূলক কম বীজের দাম থাকলেও সারসংকটের আতঙ্ক রয়েছে। তবে ভালো ফলন ও বাজারে আশানুরূপ দাম—দুটিই নির্ভর করছে প্রকৃতি ও বাজার পরিস্থিতির ওপর।

উপজেলার বাহাগিলী, নিতাই, পুটিমারী, গাড়াগ্রাম ও রণচণ্ডী ইউনিয়নের বিভিন্ন মাঠ ঘুরে দেখা যায়, আমন ধান কাটার পরপরই জমিতে আলু রোপণ করছেন কৃষকেরা। কোথাও চলছে জমি চাষ ও মাটি প্রস্তুতের কাজ, কোথাও সারি সারি বীজ আলু লাগানো হচ্ছে। তাদের সঙ্গে কাজে নেমেছেন কৃষিশ্রমিকেরাও। মৌসুম ঘিরে বেড়েছে শ্রমিকের চাহিদা ও মজুরি।

কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আগাম আলু চাষে স্থানীয়ভাবে জনপ্রিয় ‘সেভেন’ জাতের আলু ব্যবহার করছেন অনেকে। রোপণের ৫০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে এ জাতের আলু তোলা সম্ভব বলে জানান তারা। শীতের শুরুতে বাজারে নতুন আলুর চাহিদা ও দাম বেশি থাকার প্রত্যাশাই তাদের আগেভাগে চাষে উৎসাহিত করছে।

বাহাগিলী ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি পশ্চিমপাড়া গ্রামের কৃষক নুর ইসলাম এবার ৭০ শতাংশ জমিতে আগাম আলু চাষ করছেন। জমি ইজারা থেকে শুরু করে আলু তোলা পর্যন্ত তার সম্ভাব্য ব্যয় প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা।

নুর ইসলাম বলেন, আমি এবার ৭০ শতাংশ জমিতে আগাম আলু রোপণ করছি। জমি ইজারা, হালচাষ, শ্রমিক ও কৃষি উপকরণসহ আলু তোলা পর্যন্ত প্রায় ৮০ থেকে ৯০ হাজার টাকা খরচ হতে পারে। বাজারদর ভালো থাকলে প্রতি কেজি আলু ৯০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারলে আশা করা যায় লাভবান হব।

এত টাকা বিনিয়োগের পরও আশাবাদী নুর ইসলাম। তবে তার লাভ-লোকসানের হিসাব নির্ভর করছে উৎপাদন খরচের বিপরীতে ফলন ও বিক্রয়মূল্য কতটা অনুকূলে থাকে, তার ওপর।

একই এলাকার কৃষক নাজমুল ইসলামের অভিজ্ঞতাও প্রায় একই। গত মৌসুমের লোকসান তাকে নতুন করে হিসাব কষতে বাধ্য করেছে। এবার আগাম আলু চাষের মধ্য দিয়ে সেই ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখছেন তিনি। নাজমুল ইসলাম বলেন, গত বছর বিঘাপ্রতি বেশ লোকসান হয়েছে। এবার সেই লোকসানের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে আগাম আলু চাষ করছি। প্রাকৃতিক দুর্যোগ না হলে ভালো ফলন ও চড়া দাম পাওয়ার আশা করছি।

পুটিমারী ইউনিয়নের কৃষক মনছুর আলী এবার দুই বিঘা জমিতে আগাম আলু রোপণ করেছেন। বীজ হিসেবে ব্যবহার করেছেন হিমাগার থেকে সংগ্রহ করা আলু। এতে খরচ কিছুটা বেশি হলেও বাজারে ভালো দাম পাওয়ার আশায় বিনিয়োগ করেছেন তিনি।

মনছুর আলী বলেন, প্রতি বছরই আমাদের উপজেলায় আগাম আলু চাষ হয়। আমি এবার দুই বিঘা জমিতে আলু রোপণ করেছি। হিমাগার থেকে আলু এনে বীজ হিসেবে ব্যবহার করেছি। খরচ কিছুটা বেশি হয়েছে। তবে ভালো দাম পেলে লাভ হবে।

কিশোরগঞ্জ উপজেলা কৃষি কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে উপজেলায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে আগাম আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা লোকমান আলম বলেন, চলতি মৌসুমে কিশোরগঞ্জ উপজেলায় ৪ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে আগাম আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সার সরবরাহ নিশ্চিত করতে কৃষি বিভাগ কাজ করছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে কৃষকেরা ভালো বাজারদর পেয়ে লাভবান হবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

নীলফামারী জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক হোমায়রা মন্ডল বলেন, চলতি বছর নীলফামারীতে ২২ হাজার ৭০০ হেক্টর জমিতে আলু চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে আগাম আলুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৮ হাজার ৩০০ হেক্টর। এ পর্যন্ত পাঁচ হেক্টর জমিতে আলু লাগানো হয়েছে। তবে গত বছরের তুলনায় আলু চাষ কিছুটা কমবে।

তিনি আরও বলেন, বর্তমান আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় উঁচু জমিতে আলু চাষে কৃষকদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। নিচু জমিতে আবহাওয়া দেখে রোপণের কথা বলা হচ্ছে।