logo

দুই সেতু ঘিরে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের রঙের লড়াই

দুই সেতু ঘিরে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা সমর্থকদের রঙের লড়াই
ছবি: এশিয়া পোস্ট

শুরু হতে যাচ্ছে বিশ্ব ফুটবলের মহারণ। ৪৮ দলের বিশ্বকাপে বাংলাদেশ না থাকলেও, সমর্থনের দিক থেকে বাঙালি ফুটবলপ্রেমীরা কোনো অংশেই পিছিয়ে নেই। ফুটবলপ্রিয় এই জাতির সিংহভাগ মানুষ আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিল-এই দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে প্রতিনিয়ত মেতে উঠছেন তর্কযুদ্ধে। অনেকেই প্রিয় দলকে সমর্থন জানাতে ছাদে পতাকা ওড়াচ্ছেন কিংবা পুরো ভবনটিই প্রিয় দলের পতাকার রঙে রাঙিয়ে তুলছেন। তবে পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে ফুটবল উন্মাদনার চিত্রটি একটু ব্যতিক্রম ও আকর্ষণীয়। শহরের দুটি সেতুকে ঘিরে এখানকার ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা সমর্থকরা এখন মেতে উঠেছেন এক অভিনব বাকযুদ্ধে।

রাঙামাটি শহর থেকে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাওয়ার পথে পাশাপাশি দুটি সেতু রয়েছে, যাদের মধ্যবর্তী দূরত্ব ১০০ মিটারেরও কম। সাধারণ যাতায়াতের এই পথটি বিশ্বকাপ এলেই রূপ নেয় আবেগ ও উন্মাদনার এক ভিন্ন চত্বরে। হলুদ-সবুজ রঙের কারণে আসামবস্তির আলোচিত সেতুটি ব্রাজিল সমর্থকদের কাছে ‘ব্রাজিল সেতু’ নামে পরিচিত। ঠিক তার পাশেই আকাশী-সাদা রঙের আরেকটি সেতু রয়েছে, যা পরিচিত ‘আর্জেন্টিনা সেতু’ নামে। শহরের এই দুই সেতু নিয়ে দুই পক্ষের সমর্থকদের মধ্যে চলছে নিরন্তর লড়াই। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, পাহাড়ের বুকে যেন গড়ে উঠেছে ছোট্ট এক লাতিন আমেরিকা।

ব্রাজিল ভক্তদের আশা-এবার মিটবে তাদের দীর্ঘদিনের ট্রফি খরা। ২০০২ সালের পর আর সোনালী ট্রফি ছোঁয়া হয়নি পাঁচবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়নদের। এই দীর্ঘ শিরোপাহীনতা ঘোচাতে এবার মরিয়া সাম্বা ভক্তরা। তাই তো বিশ্বকাপ মাঠে গড়ানোর ঢের আগেই সেতু দুটি নিয়ে উচ্ছ্বাস চরমে ব্রাজিল সমর্থকদের।

অন্যদিকে, আসামবস্তির আলোচিত ব্রাজিল সেতুর পাশেই আকাশী-সাদা রঙের সেতুটি এখন আর্জেন্টিনা সমর্থকদের প্রধান আস্তানা। এ ছাড়াও বিশ্বকাপ এলেই শহরের ব্রাহ্মণটিলা ও রিজার্ভ বাজারের ‘ওয়াই আকৃতির’ সেতুটিও রঙের কারণে ‘আর্জেন্টিনা সেতু’ হিসেবে পরিচিতি পায়। ফলে শহরে ব্রাজিলের রঙের সেতু একটি হলেও আর্জেন্টিনার রঙের সেতু রয়েছে তিনটি। প্রতিদিন বিকেল হলেই নানা বয়সী ছেলেমেয়ের আড্ডায় প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে সেতুর পুরো অংশ।

দুই সেতুর রঙ ও নামকরণ নিয়ে সমর্থকদের মধ্যে যেমন রয়েছে আনন্দ-উচ্ছ্বাস, তেমনি একে-অন্যের সেতু নিয়ে টিপ্পনি কাটতেও ভুল করছেন না কেউ। কেবল দুই দেশের সমর্থকই নন, এই দুই সেতু এখন পর্যটকদের কাছেও দারুণ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। প্রতিদিন শত শত মানুষ এখানে আসছেন কেবল সেতু দুটির ভিন্নধর্মী সাজ ও ফুটবল আমেজ দেখতে।

বিশ্বকাপকে ঘিরে এদিকে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় পতাকা ও জার্সি বিক্রেতারা। প্রিয় দলের জার্সি ও পতাকা কিনছেন সমর্থকরা। বেচাকেনা বেশ ভালো বলেই জানিয়েছেন বিক্রেতারা।

আর্জেন্টিনা সমর্থক নাছির উদ্দিন সোহেল বলেন, যারা ২০০২ সালের পর আর কোনো বড় শিরোপা জিততে পারেনি, তাদের সাথে আমাদের তুলনা চলে না। তারা কেবলই বাপ-দাদার অতীত ইতিহাস নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। ২০২২ সালের মতো এবারও বিশ্বকাপ শিরোপা মেসির হাতেই উঠবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

আরেক আর্জেন্টিনা সমর্থক ইয়াছিন রানা সোহেল বলেন, শহরে ব্রাজিলের রঙের সেতু মাত্র একটি, আর আর্জেন্টিনার আকাশী-সাদা রঙের সেতু আছে তিনটি। আগামী ১১ তারিখ প্রিয় দলকে সমর্থন জানাতে আমরা আনন্দ শোভাযাত্রা করব। পাশাপাশি প্রতিটি খেলা বড় পর্দায় দেখার ব্যবস্থাও রাখা হবে।

পাল্টা জবাবে ব্রাজিল সমর্থক মো. ইব্রাহিম বলেন, আমাদের বাপ-দাদার ঐতিহ্য ও গৌরব আছে, তাই আমরা সেগুলো নিয়ে গর্ব করি। ওদের তো দেখানোর মতো তেমন কিছু নেই। আমরা ইতোমধ্যে ব্রাজিল দলের শুভকামনা জানিয়ে শোভাযাত্রা সম্পন্ন করেছি।

ব্রাজিল দলের আরেক সমর্থক মিশু মল্লিক তীব্র কটাক্ষ করে বলেন, আমরা আর্জেন্টিনাকে কোনো দলই মনে করি না। তাদের বিশ্বকাপ জেতার পেছনে রয়েছে নানা কলঙ্ক। হাত দিয়ে গোল করা, বিতর্কিত পেনাল্টি পাওয়া-আরও কত অভিযোগ! তারা কোন মুখে আমাদের সাথে বড়াই করে? আমাদের মতো জার্সিতে ফাইভ স্টার (পাঁচটি তারকা) যোগ করতে ওদের কম করে হলেও আরও ৩৬ বছর লাগবে।

ভৌগোলিকভাবে লাতিন আমেরিকার দেশ দুটির দূরত্ব অনেক হলেও, রাঙামাটির এই দুই সেতু তাদের যেন মিলিয়ে দিয়েছে এক সুতোয়। মাঠের লড়াই শুরু হতে এখনও কিছু সময় বাকি থাকলেও, পাহাড়ের এই জনপদে লড়াই শুরু হয়ে গেছে রঙে আর আবেগে। এই দুই সেতু যেন মনে করিয়ে দেয়-ফুটবল মানে কেবল জয়-পরাজয় নয়, ফুটবল মানে সম্প্রীতি আর উৎসবের এক বৈশ্বিক মেলবন্ধন।