logo

জীবিত হয়েও সরকারি নথিতে ‘মৃত’ ২২২ জন

রাকিবুল হাসান রোকেল
কিশোরগঞ্জ
জীবিত হয়েও সরকারি নথিতে ‘মৃত’ ২২২ জন
সরকারি নথিতে মৃত জাহেরা খাতুন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

জীবিত মানুষ, অথচ সরকারি নথিতে মৃত! কিশোরগঞ্জে এমন বেশ কয়েকটি ঘটনায় উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। কেউ বয়স্ক ভাতা তুলতে গিয়ে, কেউ জমির কাজে, আবার কেউ বিদেশে পাসপোর্ট নবায়ন করতে গিয়ে জানতে পারেন নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডারে তারা মৃত।

আবেদনের সত্যতা, শনাক্তকারী ও স্বাক্ষর নিয়েও রয়েছে নানা অসঙ্গতি। এমনকি কোথাও মৃত দেখানোর আবেদনই খুঁজে পাচ্ছে না নির্বাচন অফিস। সর্বশেষ হালনাগাদে কিশোরগঞ্জ সদর, করিমগঞ্জ ও হোসেনপুরে বেশ কয়েকটি ঘটনায় উঠে এসেছে নানা অসঙ্গতি।

নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ভোটার তালিকা হালনাগাদে কিশোরগঞ্জের ১৩ উপজেলায় মোট ৪৬ হাজার ৬২২ জন ভোটারকে তালিকা থেকে কর্তন করা হয়। এর মধ্যে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত ২২২ জন ‘মৃত’ থেকে পুনরায় ‘জীবিত’ দাবি করে আবেদর করেছেন।

করিমগঞ্জের জয়কা ইউনিয়নের খোঁজারগাঁও এলাকার ৮৮ বছর বয়সী জাহেরা খাতুন। সম্প্রতি বয়স্কভাতা তুলতে গিয়ে জাহেরা খাতুন জানতে পারেন, তার জাতীয় পরিচয়পত্রটি সচল নেই। পরে ছেলে আসাদ মিয়া ও বোনের ছেলে আবদুল কাদিরকে সঙ্গে নিয়ে নির্বাচন অফিসে গেলে জানতে পারেন, সরকারি নথিতে তিনি মৃত। নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৫ জানুয়ারি তার মৃত্যু হয়েছে।

জাহেরা খাতুন অভিযোগ, বাবার বাড়ির প্রায় ১২ একর সম্পত্তিতে রয়েছে তারও অধিকার। সেই সম্পত্তির ভাগ থেকে তাকে বঞ্চিত করতে ভাইয়েরা ভিন্ন পথ বেছে নিয়েছেন। জাতীয় পরিচয়পত্র হালনাগাদের সময় ভুল তথ্য দিয়ে তাকে ‘মৃত’ দেখানো হয়েছে।

জাহেরা খাতুনের অভিযোগের ভিত্তিতে অনুসন্ধানে নামে এশিয়া পোস্ট। নির্বাচন অফিসের তথ্য অনুযায়ী, তাকে মৃত দেখানোর জন্য একটি আবেদন করা হয়েছিল। সেই আবেদনে ভাই হিসেবে শনাক্তকারী ব্যক্তি হেলাল উদ্দিনকে চেনেন না বলে দাবি করেছেন জাহেরা খাতুন।

জাহেরা খাতুন বলেন, তার বাবার বাড়িতে প্রায় ১২ একর জমি রয়েছে। এই সম্পত্তিতে তারও বড় একটি অংশ রয়েছে। সেই সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করতেই ভাইয়েরা এ পথ বেছে নিয়েছেন বলে তার অভিযোগ।

আবেদনে শনাক্তকারী হিসেবে দেখানো জয়কা ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য জসিম উদ্দিন দাবি করেছেন, আবেদনপত্রে থাকা স্বাক্ষর তার নয়। তার ভাষ্য, ফরমে তার নামে যে স্বাক্ষর করা হয়েছে, তিনি সেভাবে স্বাক্ষর করেন না।

অন্যদিকে, ভাই হিসেবে আবেদনকারী হেলাল উদ্দিনও দাবি করেছেন, আবেদনপত্রে থাকা স্বাক্ষর তার নয়। এমনকি জাহেরা খাতুন জীবিত না মৃত সেটিও তিনি জানেন না বলে দাবি করেন।

তবে আবেদনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শনাক্তকারী শিক্ষক মোহাম্মদ কামাল উদ্দিনের দাবি, স্বাক্ষর দুটি জসিম উদ্দিন ও হেলাল উদ্দিনেরই। তার ভাষ্য, বিপদে পড়ার আশঙ্কায় তারা এখন স্বাক্ষর অস্বীকার করছেন।

জাহেরা খাতুনের ছেলে আসাদ মিয়ার প্রশ্ন, সবাই যদি অস্বীকার করেন, তাহলে কে বা কারা তার মা জাহেরা খাতুনকে জীবিত থাকা অবস্থায় সরকারি নথিতে ‘মৃত’ বানাল?

তিনি বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রটি সচল করতে আমাকে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় যেতে হয়েছে, অটোরিকশা ভাড়া করতে হয়েছে। পরে নির্বাচন অফিসে গিয়ে তার মায়ের জাতীয় পরিচয়পত্রটি সচল করা হয়। তবে এর আগের ভোগান্তি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয় বলেও অভিযোগ আসাদ মিয়ার।

একইভাবে জাতীয় পরিচয়পত্রে ‘মৃত’ দেখানো হয়েছে কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার বগাদিয়া এলাকার আশরাফ উদ্দিন আসাদকেও। ভূমি অফিসে কর দিতে গিয়ে প্রথম বিষয়টি জানতে পারেন তিনি। পরে নির্বাচন অফিসে খোঁজ নিয়ে নিশ্চিত হন, সরকারি নথিতে তাকেও মৃত দেখানো হয়েছে। নথি অনুযায়ী, ২০১৯ সালে তার মৃত্যু হয়েছে। নথিতে অবশ্য দিন-তারিখ উল্লেখ নেই।

আশরাফ উদ্দিন আসাদকে নিয়ে অনুসন্ধানে সামনে আসে আরও একটি অসঙ্গতি। তাকে মৃত হিসেবে শনাক্ত করেছেন যে ব্যক্তি, তিনিও তার অপরিচিত। এমনকি শনাক্তকারী হিসেবে দেখানো ওই ব্যক্তির বাড়ি আশরাফ উদ্দিনের বাড়ি থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে।

সরকারি নথিতে মৃত সবুজ মিয়া ও আশরাফ উদ্দিন। ছবি: এশিয়া পোস্ট
সরকারি নথিতে মৃত সবুজ মিয়া ও আশরাফ উদ্দিন। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বিষয়টি জানাজানি হলে হালনাগাদ কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত সহকারী শিক্ষক হালিমা খাতুন ভুল স্বীকার করে ক্ষমা চান। অথচ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো ভোটারকে মৃত দেখানোর ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্যদের আবেদনের ভিত্তিতেই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার কথা। কিন্তু নথিপত্র বলছে, আশরাফ উদ্দিনের ক্ষেত্রে ওই শিক্ষক নিজেই প্রতিবেশী হিসেবে পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। আবার ওই আবেদনে স্থানীয় কোনো জনপ্রতিনিধির নাম, সিল বা স্বাক্ষরও পাওয়া যায়নি।

আশরাফ উদ্দিন আসাদের অভিযোগ, তার বেশ কিছু জমি দীর্ঘদিন ধরে দখলের চেষ্টা করে আসছে একটি সংঘবদ্ধ চক্র। জমি কেনার প্রস্তাব দিয়েও ব্যর্থ হওয়ার পর তাকে জাতীয় পরিচয়পত্রে মৃত দেখানোর পথ বেছে নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এর উদ্দেশ্য ছিল, জীবিত থাকা অবস্থায় তিনি যেন নিজের জমি অন্যত্র বিক্রি বা হস্তান্তর করতে না পারেন। তার অভিযোগ, এখানে মোটা অঙ্কের লেনদেনের মাধ্যমে এই কাজটা করা হয়েছে।

এ বিষয়ে কথা বলতে নগুয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক হালিমা খাতুনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি। তার স্বামী নাজমুল হক জানান, আশরাফ উদ্দিন আসাদের বাড়ির পাশে তাদের একটি বাসা রয়েছে। তার দাবি সেটি ভাড়া দেওয়া। এই হিসেবে তার স্ত্রী নিজেকে আসাদের প্রতিবেশী দাবি করেছেন। তিনি আরও বলেন, ওই ব্যক্তি সম্পর্কে তার স্বজনরা মৃত বলে তথ্য দিয়েছেন। কিন্তুু তাদের কারও জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকায় তার স্ত্রী শনাক্তকারী হিসেবে স্বাক্ষর করেছেন।

তবে সবচেয়ে বড় ভোগান্তির শিকার হয়েছেন হোসেনপুর উপজেলার উত্তর মাথখলা গ্রামের সৌদি প্রবাসী মোহাম্মদ সবুজ মিয়া। প্রায় তিন বছর আগে জীবিকার তাগিদে ছয় লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরবে পাড়ি জমান সবুজ মিয়া। সেখানে আড়াই বছর কাজ করার পর সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন তিনি। পরে দেশে ফেরার প্রস্তুতি হিসেবে সৌদিতে পাসপোর্ট নবায়ন করতে গেলে জানতে পারেন, তার বাংলাদেশি জাতীয় পরিচয়পত্রটি সচল নেই।

স্বজনদের মাধ্যমে হোসেনপুর নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, সরকারি নথিতে তাকেও মৃত দেখানো হয়েছে। জাতীয় পরিচয়পত্র সচল করতে দেশে এসে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।

উপায়ন্তর না দেখে অতিরিক্ত চার লাখ টাকা খরচ করে দেশে ফেরেন সবুজ মিয়া। পরে ফিঙ্গারপ্রিন্ট দেওয়ার মাধ্যমে সচল হয় তার জাতীয় পরিচয়পত্র।

তবে কে বা কার আবেদনের ভিত্তিতে তাকে মৃত দেখানো হয়েছিল, সেই তথ্যই নেই নির্বাচন অফিসের সার্ভারে।

সবুজ মিয়ার অভিযোগ করে বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্রে ‘মৃত’ দেখানোর কারণে আমাকে যে পরিমাণ ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে, তা একমাত্র আল্লাহই জানেন। নির্বাচন অফিসে যোগাযোগ করলে আমাকে বলা হয়, ভুলবশত এমনটি হয়েছে। কিন্তু সেই ভুলের কারণে আমাকে প্রায় চার লাখ টাকা খরচ করে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরতে হয়েছে। তার প্রশ্ন এত বড় ভুলের দায় নেবে কে?

অন্যদিকে, উত্তর মাথখলা এলাকায় ভোটার হালনাগাদের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষক মোশাররফ হোসেন ভূঁইয়ার দাবি, তিনি যেসব মৃত ভোটারের তথ্য কর্তনের জন্য পাঠিয়েছেন, প্রতিটি ক্ষেত্রেই পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় ইউপি সদস্যের সিল-স্বাক্ষর নিয়ে যথাযথ প্রক্রিয়ায় আবেদন জমা দিয়েছেন।

তার দাবি, সবুজ মিয়ার ক্ষেত্রে যদি কোনো আবেদন সার্ভারে না থাকে, তাহলে এর দায় নির্বাচন অফিসের। আর আবেদন থেকে থাকলে সেটিতে কার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ভোটার কর্তন করা হয়েছে, তা স্পষ্ট থাকার কথা।

হোসেনপুর উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা আলীমুল রাজী জানান, কর্তন করা ভোটারের ক্ষেত্রে ১২ নম্বর ফরম সংযুক্ত থাকার কথা। কিন্তু সবুজ মিয়ার ক্ষেত্রে এমন কোনো আবেদন বা তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। অনলাইনেও খুঁজে পাওয়া যায়নি। অফিসেও কোনো কাগজপত্র নেই।

তবে তিনি জানান, সর্বশেষ হালনাগাদের সময় তিনি কর্মস্থলে ছিলেন না, সম্প্রতি যোগদান করেছেন।

সর্বশেষ হালনাগাদের সময় হোসেনপুর নির্বাচন অফিসে কর্মরত থাকা ওসমান গণির সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ভোটারের তথ্য নির্বাচন অফিসে না থাকলে সেই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।

কিশোরগঞ্জ জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মোহাম্মদ মোরশেদ আলম বলেন, মাঠপর্যায় থেকে কোনো ব্যক্তি ভুল তথ্য দিলে ভুক্তভোগীর পক্ষ থেকে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। আর নির্বাচন অফিসের কেউ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অসাধুপন্থা অনুসরণ করে থাকলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

কিশোরগঞ্জের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী অশোক সরকার বলেন, মিথ্যা তথ্য দিয়ে জীবিত ব্যক্তিকে মৃত দেখানো হয়ে থাকলে তা ফৌজদারি অপরাধ হতে পারে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যবহার করতে গিয়ে কিশোরগঞ্জে ২২২ জন জানতে পেরেছেন, সরকারি নথিতে তাদের মৃত দেখানো হয়। পরে আবেদনের মাধ্যমে তারা জীবিত হিসেবে পুনর্বহাল হয়েছেন। হালনাগাদ প্রক্রিয়ায় কীভাবে এসব ঘটনা ঘটল, তা তদন্ত করা প্রয়োজন বলে মনে করেন তিনি।

অশোক সরকার আরও বলেন, হালনাগাদের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের আরও সতর্ক থাকা প্রয়োজন। একই সঙ্গে বিষয়টি তদন্ত করে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা হলে ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা কমে আসতে পারে। এ জন্য জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়টি তদন্তের পরামর্শ দেন তিনি।