logo

ঠাকুরগাঁও-১ উপনির্বাচন/বিএনপি-জামায়াতের চোখ সংখ্যালঘুর দিকে, ভোটের লড়াইয়ে ৫ প্রার্থী

বিএনপি-জামায়াতের চোখ সংখ্যালঘুর দিকে, ভোটের লড়াইয়ে ৫ প্রার্থী
ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন প্রার্থীর পোস্টার ও ব্যানারে ছেয়ে গেছে নির্বাচনি এলাকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও চত্বর। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে আনুষ্ঠানিক প্রচার শেষ হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। আসনটিতে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীর মধ্যে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে নির্বাচনের ফল নির্ধারণে সংখ্যালঘু ভোটারদের সমর্থন কতটা প্রভাব ফেলবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক মহলে চলছে নানা আলোচনা।

‘২৯ তারিখ সকালে যাইয়া হামরা সবাই ভোট দিয়া আসিম। অনেকজন কহেছে হামরা বলে ভোট দিবা যামনি। কেনে দিবা যামনি, হামরা কি এ দেশের নাগরিক নাহায়? হামাক দেখে রাখিবা চাহিছে ২ জন এমপি প্রার্থী। ২ জনই ভালো লোক। শুধু এই ২ জন ভোট চাহিবা আসিছে আর কাহু আসেনি। হামার সমস্যার কথালা শুনিছে আর সমস্যালা সমাধান করিবা চাহিছে। হামরা সকালে যাইয়া পছন্দের প্রার্থীক ভোট দিয়া আসিম। হামরা যাক ভোট দিম তাহে জিতিবে। কারণ জেলাডাত হামার সংখ্যা কম নাহায়।’

ঠাকুরগাঁও-১ আসনের উপনির্বাচনে নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন সদর আকচা ইউনিয়নের পালপাড়া গ্রামের ভোটার সীতা রানী পাল।

ঠাকুরগাঁও-১ আসনে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটার সংখ্যা উল্লেখ করার মতো। অতীতে এ আসনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের বেশ আধিপত্য ছিল। গত ১১টি সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সাতবার, বিএনপি চারবার ও জাতীয় পার্টি একবার জয়লাভ করে। তবে আওয়ামী লীগের অনুপস্থিতিতে আসন্ন ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও বর্তমান উপনির্বাচনে আসনটিতে তৈরি হয়েছে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ।

এই আসনে মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে সংখ্যালঘু ভোটারের সংখ্যা ১ লাখ ৩৪ হাজারের বেশি। রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ বলছে, সংখ্যালঘু ভোট যে প্রার্থীর দিকে যাবে, তার জয়ের সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এ ভোট ব্যাংককেই প্রার্থীর জয়-পরাজয়ের প্রধান নিয়ামক হিসেবে দেখা হচ্ছে। ফলে তাদের অবস্থান নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে বাড়তি আগ্রহ ও কৌতূহল তৈরি হয়েছে।

আকচা বাড়াবাড়ি বাজারের বাসিন্দা হাবিবুর রহমান বলেন, কয়েক মাস আগে ভোট দিলাম। যাকে ভোট দিলাম, সে মন্ত্রী হয়ে শেষমেশ রাষ্ট্রপতি হয়ে গেলেন। আমাদের ঠাকুরগাঁও জেলাকে এখন সবাই চেনে। আমরা বাংলাদেশের ২৩তম রাষ্ট্রপতির এলাকার লোক, এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। কিন্তু সাধারণ জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ভোটের আগে যেসব ওয়াদা করে ভোট নেওয়া হয়েছিল, তা পূরণ হয়নি। কাকে ভোট দেব, তা আমার একান্ত ব্যক্তিগত ব্যাপার। তবে বুঝে-শুনে ভোট দেব। জেলার মানুষ ভালো নেই।

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির শপথ নেওয়ার পর আসনটি শূন্য ঘোষণা করা হয়। ২৯ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই উপনির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন রাষ্ট্রপতির ছোট ভাই ও জেলা বিএনপির সভাপতি মির্জা ফয়সল আমীন (ধানের শীষ), জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিশে শুরার সদস্য দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা), ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের খাদেমুল ইসলাম (হাতপাখা), বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের আবদুল আলীম নিজামী (বটগাছ) এবং বাংলাদেশ কংগ্রেসের হুসাইন মুহাম্মদ ওমর ফারুক (ডাব)।

ভূল্লি এলাকার ভোটার মহসিন আলী বলেন, ৮ মাসে ২ বার ভোট, যেন উৎসবের আমেজ। তবে সবার ভোটের আগ্রহ সমান নয়। প্রথমবার সরকার ঠিক করে দেওয়া ভোটে আগ্রহ কম ছিল। বর্তমানে নিত্যপণ্যের দাম অনেক বেড়েছে। সংসার চালাতেই হিমশিম খেতে হয়, তাই ভোটের কথা মাথায় থাকে না। তারপরও ভোট দেওয়া আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। যিনি পণ্যের দাম কমাতে পারবেন এবং এলাকার উন্নয়ন করবেন, তাকেই ভোট দিয়ে জয়যুক্ত করব।

রুহিয়া উপজেলার বিকাশ চন্দ্র রায় নিজের আশঙ্কার কথা জানিয়ে বলেন, এবারের ভোটে আমাদের নিয়ে টানাটানি চলছে। অনেকেই বলছেন, আমরা যাকে ভোট দেব সেই জিতবে। এই ভেবেই ভয়ে আছি। আমাদের গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই আমাদের সম্প্রদায়ের। আমরা কাকে ভোট দিচ্ছি তা সহজেই বোঝা যাবে। ভোটে যে দল হারবে, তারা যদি এসে আমাদের ওপর চড়াও হয়? তবুও ভয় না পেয়ে ২৯ তারিখ সকালে গিয়ে ভোট দেব।

সদর উপজেলার কালীতলা এলাকার ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মিনতি ঋষি বলেন, দশজনে যাকে ভালো বলবে, তাকেই ভোট দেব। নির্বাচন আসলে আমাদের খাতির বাড়ে, কিন্তু নির্বাচন পার হলে আর কারও দেখা মেলে না। বড় বড় ভাষণ দিয়ে যায়, এটা করবে-ওটা করবে; কিন্তু জয়ী হওয়ার পর কোনো খোঁজ থাকে না। আমরা এমন মানুষকে ভোট দিতে চাই, যাকে বিপদে-আপদে পাশে পাওয়া যাবে।

প্রচারণায় বিএনপির প্রার্থী মির্জা ফয়সল আমীন বলেন, তার ভাই এমপি থাকাকালীন সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, দুটি নতুন উপজেলা গঠন এবং চারটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান সরকারি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এ ছাড়া মেডিক্যাল কলেজ, ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ, নার্সিং ইনস্টিটিউট স্থাপন, ২৫০ শয্যার হাসপাতালকে ৬০০ শয্যায় উন্নীত করা, বন্ধ বিমানবন্দর চালু, ইপিজেড স্থাপন এবং গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও সেতু নির্মাণের পরিকল্পনা ছিল। এসব উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে ধানের শীষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দেন, নির্বাচিত হলে এক মাসের মধ্যে এলাকার নর্দমা ও রাস্তাঘাট পাকা করা হবে এবং সার সংকট দূর করতে খোলাবাজারে সার বিক্রির ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

অপরদিকে জামায়াতের প্রার্থী দেলাওয়ার হোসেন (দাঁড়িপাল্লা) অভিযোগ করে বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে মানুষের আস্থা ছিল না। ৫ আগস্টের পর পরিস্থিতির পরিবর্তনের আশা জাগলেও দুটি উপনির্বাচনে আগের ধারাবাহিকতাই দেখা গেছে। সরকারি দলের লোকজন আচরণবিধি মানছেন না এবং দাঁড়িপাল্লার কর্মী-সমর্থকদের প্রচারে বাধা ও পোলিং এজেন্টদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

ভোটারদের উদ্দেশে তিনি বলেন, কেউ যেন ভোট নিয়ে ষড়যন্ত্র করতে না পারে সে বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি নির্বাচিত হলে সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত ঠাকুরগাঁও গড়ে তোলার পাশাপাশি সরকারি বরাদ্দ সুষ্ঠুভাবে বন্টনের অঙ্গীকার করেন।

জেলা নির্বাচন কর্মকর্তা ও রিটার্নিং কর্মকর্তা কামরুল ইসলাম জানান, ঠাকুরগাঁও-১ আসনে ১৮৫টি কেন্দ্রে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। এর মধ্যে ১১৫টি কেন্দ্রকে ‘অতি গুরুত্বপূর্ণ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কেন্দ্রে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন থাকবে।

জেলা পুলিশ সুপার বেলাল হোসেন আশ্বাস দিয়ে বলেন, নির্বাচনে কোনো পক্ষকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া হবে না। ভোটাররা যাতে নির্বিঘ্নে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রস্তুত রয়েছে। ভোটের ফলাফল যাই হোক, তা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন সম্পন্ন করার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।

বিজিবির সেক্টর কমান্ডার সুরুজ মিয়া জানান, ভোটকেন্দ্রে ভোটারদের নিরাপদ উপস্থিতি নিশ্চিত করতে এবং যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা এড়াতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। পুরো নির্বাচনি এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়েছে।

ঠাকুরগাঁও সদর, ভূল্লি ও রুহিয়া এলাকা নিয়ে গঠিত এই আসনে ২২টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা রয়েছে। মোট ভোটার সংখ্যা ৫ লাখ ১৬ হাজার ১৩৮ জন। এর মধ্যে পুরুষ ভোটার ২ লাখ ৫৭ হাজার ৪৭৫ জন, নারী ভোটার ২ লাখ ৫৮ হাজার ৬৫৯ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ভোটার রয়েছেন ৪ জন। ২৯ অক্টোবর সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত বিরতিহীনভাবে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।