ক্রিকেটার নাঈমকে হেনস্তা: খুলশী থানার ওসিকে প্রত্যাহার

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের অফ-স্পিনার নাঈম হাসানকে সিএনজিচালিত অটোরিকশা থেকে নামিয়ে মারধর এবং থানায় নিয়ে গিয়ে ওসির কক্ষে দ্বিতীয় দফায় হেনস্তার অভিযোগে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) খুলশী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমানকে প্রত্যাহার (ক্লোজড) করা হয়েছে।
এর আগে একই ঘটনায় খুলশী থানার অভিযুক্ত উপপরিদর্শক (এসআই) শফিকুল ইসলামসহ তিন পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত ও প্রত্যাহার করা হয়।
শনিবার (১৩ জুন) সিএমপি পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে খুলশী থানার ওসি মো. আরিফুর রহমানকে পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করে তার জায়গায় বাকলিয়া থানার ওসি মোহাম্মদ সোলায়মানকে নতুন ওসির দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
শনিবার রাত ১২টার দিকে সিএমপির সহকারি কমিশনার (পিআর) আমিনুর রশিদ বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
পারিবারিক ও ভুক্তভোগী সূত্রে জানা গেছে, গত শুক্রবার (১২ জুন) রাতে ঢাকায় প্রিমিয়ার লীগের খেলা শেষ করে বিমানযোগে চট্টগ্রামে ফেরেন ক্রিকেটার নাঈম হাসান। রাত ১০টা ২০ মিনিটে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর পর তিনি একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা নিয়ে চান্দগাঁওয়ের নিজ বাসায় ফিরছিলেন। পথিমধ্যে লালখান বাজার এলাকায় পৌঁছালে খুলশী থানার এসআই শফিকুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি দল অটোরিকশাটির গতিরোধ করে।
নাঈম হাসান অভিযোগ করেন, গাড়ি থামানোর পর ডিবি পরিচয়ে তার ব্যাগ তল্লাশির কথা বলা হলে তিনি পুলিশকে পূর্ণ সহযোগিতা করেন। কিন্তু কোনো কারণ ছাড়াই তাকে কলার চেপে ধরে গলায় ধাক্কা দিয়ে পুলিশের গাড়িতে তোলার চেষ্টা করা হয়। এ সময় তিনি নিজেকে জাতীয় দলের ক্রিকেটার পরিচয় দিয়ে আইডি কার্ড দেখালেও পুলিশ সদস্যরা তা আমলে নেননি। উল্টো উপস্থিত পুলিশ সদস্য ও তাদের সোর্স সোহেল পাইপ ও লাঠি দিয়ে নাঈমের কোমরে আঘাত করতে থাকেন।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত শত শত মানুষ নাঈমকে ক্রিকেটার হিসেবে শনাক্ত করলেও পুলিশ মারধর থামায়নি। নাঈম বলেন, তারা আমাকে বলছিল— তুই আসামি, চুপ থাক, একটা কথাও বলবি না। আমার মোবাইল ফোনও কেড়ে নেওয়া হয়েছিল।
ওসির কক্ষে দ্বিতীয় দফা হেনস্তা: ‘চোখ নামিয়ে কথা বল’
শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার পর ক্রিকেটার নাঈমকে খুলশী থানায় নিয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আরিফুর রহমানের কক্ষে হাজির করা হয়। নাঈমের অভিযোগ, ওসির কক্ষেও তাকে চরম হেনস্তার শিকার হতে হয়। ওসির সামনেও পুলিশের কয়েকজন সদস্য তাঁকে কিল, ঘুসি ও লাথি মারেন। নাঈম হাসান যখন পুরো ঘটনার অন্যায় আচরণের বিবরণ ওসিকে দিচ্ছিলেন, তখন ওসি আরিফুর রহমান দুঃখ প্রকাশ বা সুরক্ষার ব্যবস্থা না করে উল্টো ধমকের সুরে বারবার বলতে থাকেন, চোখ নিচু করে/নামিয়ে কথা বল।
তামিম ইকবালের ফোন ও পুলিশের ভোলবদল
থানায় অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় একপর্যায়ে নাঈম নিজের মোবাইল ফোনটি ফেরত পেয়ে দ্রুত বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) সভাপতি তামিম ইকবালের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তামিম ইকবাল তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি জানতে পেরে বিসিবির সদস্য ইসরাফিল খসরুকে জানান এবং সিএমপির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও খুলশী থানার ওসির ফোনে সরাসরি কথা বলেন। বিসিবি সভাপতির ফোন আসার পরপরই ওসির আচরণে নাটকীয় পরিবর্তন আসে। তখন তিনি "ভুল হয়ে গেছে" বলে দুঃখপ্রকাশ করেন এবং সসম্মানে থানা থেকে চলে যাওয়ার অনুরোধ জানান। পরবর্তীতে নাঈমকে চট্টগ্রামের একটি হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসাও নিতে হয়।
বিসিবির উদ্বেগ ও পুলিশ প্রশাসনের বক্তব্য
জাতীয় দলের একজন ক্রিকেটারের সঙ্গে পুলিশের এমন ন্যাক্কারজনক ও অমানবিক আচরণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এবং ক্রীড়াঙ্গনে তীব্র ক্ষোভের ঝড় ওঠে। ঘটনার পর বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়।
বিষয়টি নিয়ে নগর পুলিশের উপকমিশনার (উত্তর) আমিরুল ইসলাম বলেন, মূলত একটি অটোরিকশায় চোরাচালানের মালপত্র রয়েছে— এমন গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে লালখান বাজারে অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে তথ্য যাচাইয়ে মারাত্মক ভুল ছিল এবং দায়িত্ব পালনে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের স্পষ্ট গাফিলতি ও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণ প্রমাণিত হয়েছে।
তিনি আরও জানান, প্রাথমিক তদন্তে ভুলত্রুটি ও অপরাধের সত্যতা মেলায় প্রথমে অভিযুক্ত এসআই শফিকুলসহ তিনজনকে প্রত্যাহার করা হয়। পরবর্তীতে ওসির কক্ষে হেনস্তার বিষয়টি আমলে নিয়ে এবং সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে খুলশী থানার ওসি মো. আরিফুর রহমানকেও প্রত্যাহার করে সিএমপি পুলিশ লাইন্সে সংযুক্ত (লাইনওয়ার) করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।