ব্রুনাইয়ের কারাগারে বাবা, সাত বছর ধরে অপেক্ষায় ছোট্ট আনাস

জন্মের সাত বছরেরও বাবাকে জড়িয়ে ধরার অনুভূতিটাও পায়নি ছোট্ট আনাস। শুধু আনাস নয়, তার বাবাও আজ পর্যন্ত নিজ সন্তানকে বাস্তবে দেখেনি। বাবার বিদেশযাত্রার কিছুদিন পর পৃথিবীতে আসে আনাস। ভুক্তভোগী পরিবার এখন সংশয়ে সায়েব আলী দেশে ফিরতে পারবেন কি না। ছোট্ট আনাস তার বাবাকে জড়িয়ে ধরে ‘বাবা’ বলতে পারবেন কি না, সেটাই এখন অনিশ্চিত।
জামালপুরের মেলান্দহ উপজেলার ১১ নম্বর শ্যামপুর ইউনিয়নের পূর্ব শ্যামপুর গ্রামের বাসিন্দা মৃত বাহাদুর শেখের ছেলে মো. সায়েব আলী। ২০১৯ সালে পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা ও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে পাড়ি জমান দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ ব্রুনাইয়ে। শুরুতে সবকিছু ঠিকভাবে চললেও ২০২১ সালের ২২ জুলাই তার জীবনে নেমে আসে এক অন্ধকার।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, সেখানে একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত অবস্থায় সায়েব আলি দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা পাচ্ছিলেন না। এরই প্রেক্ষিতে সাহেব আলী ন্যায্য বেতন ও শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে প্রতিবাদ জানালে মালিক তার ওপর ক্ষুব্ধ হন। পরবর্তীতে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে চীনের এক প্রতিবন্ধী নারীকে কেন্দ্র করে তার বিরুদ্ধে মিথ্যা ও ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করা হয়। পরে ব্রুনাই পুলিশ তাকে আটক করে। প্রায় পাঁচ মাস বিচারিক কার্যক্রম শেষে ২০২১ সালের ডিসেম্বরে আদালত তাকে ২৫ বছরের কারাদণ্ড দেন। এরপর থেকেই তিনি ব্রুনাইয়ের কারাগারে রয়েছেন। সায়েব আলী যখন বিদেশে যান, তখন তার স্ত্রী রিক্তা বেগম দুই মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। কয়েকমাস পর জন্ম নেয় তাদের ছোট ছেলে আনাস। কিন্তু জন্মের পর থেকে বাবাকে কখনো বাস্তবে দেখেনি সে।
বর্তমানে সায়েব আলীর তিন সন্তান। বড় মেয়ে শারমিন, মেজ ছেলে হাফেজ মো. ইসমাইল এবং ছোট ছেলে আনাস। বড় মেয়ে আলিম পর্যায়ে পড়াশোনা করছে, মেজ ছেলে মাদ্রাসায় অধ্যয়নরত।

বাবাকে নিয়ে আক্ষেপ করে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বড় মেয়ে শারমিন বলেন, আমি প্রায় সাত বছর ধরে বাবাকে দেখি না। সবাই ‘বাবা’ বলে ডাকে, কিন্তু আমি ডাকতে পারি না। কেউ বাবার কথা বললে বুকটা ফেটে যায়। সবাই বাবার কাছে আবদার জানায়, আমি জানাতে পারি না। কেউ যখন বাবার কথা বলে, তখন আমার বুকটা ফেটে যায়। আজকে আমার বাবা বেঁচে থেকেও মৃত মানুষের মতো কারাগারে আছে। আমি সরকারের কাছে অনুরোধ জানাই, আমার বাবাকে যেন মুক্ত করে দেয়। আমার বাবাকে দেখার অনেক ইচ্ছে আমার।
মেজ ছেলে হাফেজ মো. ইসমাইল বলে, মাদ্রাসায় অনেক সহপাঠীর বাবা দেখা করতে আসেন, খাবার নিয়ে আসেন। তখন আমার খুব কষ্ট হয়। আমার বাবাও যদি আমার কাছে আসতে পারত।
এদিকে স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারের পুরো দায়িত্ব এসে পড়েছে স্ত্রী রিক্তা বেগমের কাঁধে। পরিবারের বৃদ্ধ মা ও তিন সন্তানকে নিয়ে চরম কষ্টে দিন কাটছে তাদের। নির্দিষ্ট কোনো আয়ের উৎস না থাকায় স্থানীয় মানুষের সহযোগিতায় চলছে সংসার। কান্নাজড়িত কণ্ঠে রিক্তা বেগম বলেন, স্বামীর কোনো সম্পদ নেই, ঋণের বোঝাও রয়েছে। সন্তানদের পড়াশোনা ও ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি খুব দুশ্চিন্তায় আছি। সরকারের কাছে আমার বিনীত আবেদন, আমার স্বামীকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হোক, যাতে আমার সন্তানরা তাদের বাবাকে ফিরে পায়।
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিন্নাতুল আরা এশিয়া পোস্টকে বলেন, শ্যামপুর ইউনিয়নের একজন প্রবাসী ব্রুনাইয়ে আটক রয়েছেন বিষয়টি আমি আপনাদের মাধ্যমেই জানতে পেরেছি। পরিবারের সদস্যরা যদি প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করেন, তাহলে আমরা প্রশাসনিক সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত আছি। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট দূতাবাসে যোগাযোগ বা চিঠিপত্র পাঠানোর বিষয়েও আমরা সহযোগিতা করব।
তিনি আরও বলেন, পরিবারটি যদি আর্থিক সংকট বা সন্তানদের লেখাপড়াসহ অন্য কোনো সামাজিক সমস্যার মধ্যে থাকে, তাহলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের চেষ্টা করা হবে।