নারায়ণগঞ্জে ৫৪৭ প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩৪৩টিতে নেই প্রধান শিক্ষক

নারায়ণগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় শিক্ষক ও প্রশাসনিক নেতৃত্ব—দুই ধরনের সংকটই রয়েছে। জেলার ৫৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৪৩টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৬২ দশমিক ৭ শতাংশ বিদ্যালয়েই নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। পাশাপাশি অনুমোদিত ৩ হাজার ৬২৩টি সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৩ হাজার ৩৯১ জন। শূন্য রয়েছে ২৩২টি পদ।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সর্বশেষ তথ্য বিশ্লেষণে এ চিত্র পাওয়া গেছে। হিসাব অনুযায়ী, প্রধান শিক্ষক পদ শূন্যের সংখ্যায় আড়াইহাজার সবার ওপরে—৯৬টি। এরপর সোনারগাঁয়ে ৬৯টি, সদর ও রূপগঞ্জে ৬৫টি করে এবং বন্দরে ৪৮টি পদ শূন্য রয়েছে।
সহকারী শিক্ষক পদ শূন্যের সংখ্যাতেও আড়াইহাজার এগিয়ে। সেখানে ৬৬টি পদ শূন্য। সোনারগাঁয়ে ৫৯টি, সদরে ৪৮টি, বন্দরে ৪৩টি এবং রূপগঞ্জে ১৬টি সহকারী শিক্ষক পদ শূন্য রয়েছে।
প্রধান শিক্ষক সংকটের দিক থেকে সবচেয়ে নাজুক অবস্থায় রয়েছে আড়াইহাজার। উপজেলার ১২৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯৬টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। অর্থাৎ প্রায় ৭৭ দশমিক ৪ শতাংশ বিদ্যালয় চলছে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক ছাড়াই।
সহকারী শিক্ষক পদেও সংকট রয়েছে। উপজেলার ৭৭০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন প্রয়োজনীয় সংখ্যার তুলনায় কম শিক্ষক; শূন্য রয়েছে ৬৬টি পদ। ফলে আড়াইহাজারের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে প্রশাসনিক নেতৃত্ব ও শ্রেণিকক্ষ—দুই জায়গাতেই জনবল সংকটের চাপ রয়েছে।
সোনারগাঁয়ের ১১৩টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৯টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। শূন্য পদের হার প্রায় ৬১ দশমিক ১ শতাংশ।
একই সঙ্গে উপজেলার ৭১৩টি অনুমোদিত সহকারী শিক্ষক পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৬৫৪ জন। শূন্য রয়েছে ৫৯টি পদ। অর্থাৎ সোনারগাঁয়ও প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষক—দুই স্তরেই জনবল ঘাটতি রয়েছে।
প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে কাউকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে। এতে একজন শিক্ষককে একই সঙ্গে প্রশাসনিক ও একাডেমিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের দাপ্তরিক কাজ, বিভিন্ন প্রতিবেদন তৈরি, শিক্ষক-কর্মচারীদের সমন্বয়, শিক্ষা অফিসের সঙ্গে যোগাযোগ এবং সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের পাশাপাশি তাকে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষেও পাঠদান করতে হচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ সদর উপজেলার নতুন গোগনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নন্দিতা রানী সাহা এশিয়া পোস্টকে বলেন, প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রমে এর প্রভাব পড়ছে। একটি বিদ্যালয়ের অভিভাবক ও প্রশাসনিক কর্তা হিসেবে প্রধান শিক্ষকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমানে সহকারী শিক্ষকদেরই প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে একদিকে নিয়মিত ক্লাস নিতে হচ্ছে, অন্যদিকে দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক বিভিন্ন কাজ সামলাতে হচ্ছে। এতে পাঠদানে পুরোপুরি মনোযোগ দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, মাথার ওপর একজন প্রধান শিক্ষক থাকলে প্রশাসনিক দায়িত্ব ভাগ করে নেওয়া সম্ভব হতো এবং শিক্ষকরা আরও স্বস্তির সঙ্গে পাঠদানে মনোযোগ দিতে পারতেন।
শীতলক্ষ্যা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিউলী দেবও একই ধরনের সমস্যার কথা বলেন। তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষক একটি বিদ্যালয়ের ‘হেড অব দ্য ডিপার্টমেন্ট’। এই পদ শূন্য থাকলে একজন সহকারী শিক্ষককে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করতে হয়। এতে নিয়মিত পাঠদান ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ, প্রতিবেদন তৈরি ও শিক্ষা অফিসের প্রশাসনিক কার্যক্রম সামলাতে নানা সমস্যায় পড়তে হয়।
শিউলী দেব বলেন, ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে পাঠদানে প্রত্যাশিত মনোযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তার বিদ্যালয়ে ৫০৬ জন শিক্ষার্থীর বিপরীতে সহকারী শিক্ষক রয়েছেন সাতজন। এই সংখ্যক শিক্ষক দিয়ে নিয়মিত পাঠদান ও প্রশাসনিক দায়িত্ব একসঙ্গে সামলানো কঠিন। তাই দ্রুত প্রতিটি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি দেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজন অনুযায়ী শিক্ষক পদ বাড়ানোর দাবি জানান তিনি।
প্রধান শিক্ষক সংকট মূলত বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক নেতৃত্বে প্রভাব ফেললেও সহকারী শিক্ষক সংকটের প্রভাব সরাসরি পড়ে শ্রেণিকক্ষে।
একজন সহকারী শিক্ষক বলেন, শিক্ষক কম থাকলে একজন শিক্ষককে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী বা একাধিক শ্রেণির দায়িত্ব নিতে হয়। এতে প্রতিটি শিক্ষার্থীকে প্রয়োজনীয় সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
বিশেষ করে কোনো শিক্ষক ছুটিতে থাকলে কিংবা প্রশিক্ষণ বা সরকারি কাজে বিদ্যালয়ের বাইরে থাকলে সংকট আরও প্রকট হয় বলে জানান তিনি।
বিদ্যালয়ে পর্যাপ্ত শিক্ষক না থাকলে সন্তানদের পড়াশোনার মান ও নিয়মিত তদারকি নিয়ে অভিভাবকদের মধ্যেও উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
অভিভাবক রিয়া আক্তার বলেন, আমাদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক শিক্ষার্থীদের জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করছেন। তবে শূন্য পদে একজন প্রধান শিক্ষক যোগ দিলে একজন শিক্ষক বাড়বে এবং দায়িত্ব ভাগ হয়ে যাবে। এতে প্রধান শিক্ষক দাপ্তরিক কাজগুলো ভালোভাবে দেখভাল করতে পারবেন, আর অন্য শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় আরও বেশি সময় দিতে পারবেন।
অভিভাবক রহিমা আক্তার রিমা বলেন, তার সন্তান তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ে। বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করতে হয়। একজন পূর্ণাঙ্গ প্রধান শিক্ষক যোগ দিলে তিনি দায়িত্ব ভালোভাবে পালন করতে পারবেন। এতে সহকারী শিক্ষকেরা ক্লাসে শিক্ষার্থীদের আরও বেশি সময় দিতে পারবেন এবং বিদ্যালয়ের পড়াশোনার পরিবেশও আরও ভালো হবে।
আরেক অভিভাবক জহির হোসেন বলেন, প্রধান শিক্ষক বিদ্যালয়ের সার্বিক কার্যক্রম পরিচালনা ও তদারকি করেন, আর সহকারী শিক্ষকেরা সরাসরি পাঠদান করেন। শূন্য পদটি দ্রুত পূরণ হলে প্রশাসনিক কাজ ও পাঠদান—দুই ক্ষেত্রেই গতি বাড়বে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার মান আরও ভালো হবে বলে তারা আশা করেন।
চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী অর্জুন দাস বলে, আমাদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ম্যাডাম অনেক ভালো। তবে একজন নতুন প্রধান শিক্ষক যোগ দিলে আমরা আরও একজন শিক্ষক পাব এবং শিক্ষকরা আমাদের পড়াশোনায় বেশি সময় দিতে পারবেন।
পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী রাবেয়া আক্তার বলে, আমাদের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক ম্যাডাম দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি আমাদের পড়ান। তিনি ও অন্য শিক্ষকেরা অনেক চেষ্টা করেন। তবে একজন পূর্ণাঙ্গ প্রধান শিক্ষক এলে স্কুল আরও সুন্দরভাবে পরিচালিত হবে।
পরিসংখ্যানের দিকে তাকালে প্রধান শিক্ষক সংকটটি সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে। জেলার ৫৪৭টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৪৩টিতে পদ শূন্য। অর্থাৎ প্রতি ১০টি বিদ্যালয়ের প্রায় ৬টিতেই নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক।
অন্যদিকে সহকারী শিক্ষক পদে ২৩২টি শূন্যতা সংখ্যায় তুলনামূলক কম মনে হলেও এর প্রভাব সরাসরি পড়ে শ্রেণিকক্ষে। কারণ এই শিক্ষক সংকট নির্দিষ্ট কিছু বিদ্যালয়ে বেশি কেন্দ্রীভূত হলে সেখানে শিক্ষার্থী-শিক্ষক অনুপাত আরও খারাপ হতে পারে।
তাই শুধু মোট শূন্য পদের সংখ্যা নয়, কোন বিদ্যালয়ে কতজন শিক্ষার্থী এবং তার বিপরীতে কতজন শিক্ষক রয়েছেন—সেই হিসাবও গুরুত্বপূর্ণ।
উপজেলাগুলোর মধ্যে রূপগঞ্জে একটি ব্যতিক্রমী চিত্র দেখা যায়। এখানে ১১৫টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৫টিতে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকলেও সহকারী শিক্ষক পদে শূন্যতা ১৬টি।
অন্যদিকে আড়াইহাজারে প্রধান শিক্ষক পদে ৯৬টি এবং সহকারী শিক্ষক পদে ৬৬টি শূন্যতা রয়েছে। ফলে দুই ধরনের সংকটই সেখানে তুলনামূলক বেশি। এই পার্থক্য দেখাচ্ছে, জেলার সব উপজেলার সমস্যা একই ধরনের নয়। কোথাও প্রধান শিক্ষক সংকট বেশি, কোথাও সহকারী শিক্ষক সংকটও বড় হয়ে উঠেছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা ফেরদৌসী বেগম এশিয়া পোস্টকে বলেন, নারায়ণগঞ্জ জেলার পাঁচটি উপজেলার ৫৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৩৪৩টিতেই প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মামলা-সংক্রান্ত জটিলতার কারণে পদোন্নতিযোগ্য এসব পদ পূরণ করা সম্ভব হয়নি। তবে বর্তমানে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী প্রধান শিক্ষকের পদে পদোন্নতির লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
তিনি আরও বলেন, পদোন্নতির জন্য শিগগিরই একটি খসড়া তালিকা প্রকাশ করা হবে। ওই তালিকা নিয়ে কোনো শিক্ষক অভিযোগ বা আপত্তি জানালে তা যাচাই-বাছাই করে নিষ্পত্তি করা হবে। এরপর পূর্ণাঙ্গ তথ্য আগামী এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। পরবর্তী নির্দেশনা অনুযায়ী পদোন্নতির প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। তবে ঠিক কবে নাগাদ শূন্য পদগুলো পূরণ হবে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়।
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, বর্তমানে অনেক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের অনুপস্থিতিতে জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকেরা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করছেন। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ও সহকারী শিক্ষকদের সমন্বয় করতে কিছুটা সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে। কারণ একজন প্রধান শিক্ষকের যে ধরনের নেতৃত্ব, ব্যবস্থাপনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায়িত্ব থাকে, ভারপ্রাপ্ত হিসেবে দায়িত্ব পালন করার ক্ষেত্রে তা সব সময় পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হয় না।
তিনি বলেন, প্রধান শিক্ষকের শূন্য পদগুলো পূরণ হলে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে এবং শিক্ষার পরিবেশও উন্নত হবে। একই সঙ্গে শিক্ষক সংকট নিরসনেও কাজ চলছে।
সহকারী শিক্ষকদের বিষয়ে জানতে চাইলে ফেরদৌসী বেগম বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সহকারী শিক্ষক শূন্য পদ পূরণের কাজও এগিয়ে চলছে। এ বিষয়ে নারায়ণগঞ্জে যে নির্দেশনা আসছে, সে অনুযায়ী আশা করা হচ্ছে, আগামী ১ অক্টোবরের মধ্যে নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকেরা বিদ্যালয়ে যোগদান করবেন।
ফেরদৌসী বেগম বলেন, সরকার প্রধান শিক্ষকের পদোন্নতি ও শিক্ষক নিয়োগের বিষয়ে যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক সংকট অনেকটাই কমে আসবে। এতে বিদ্যালয়ের শিক্ষা কার্যক্রম আরও সুষ্ঠু ও মানসম্মতভাবে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।




