logo

ভুয়া বিলে করেন টাকা উত্তোলন, কর্মকর্তা বললেন ‘সমন্বয় করার জন্য’

ভুয়া বিলে করেন টাকা উত্তোলন, কর্মকর্তা বললেন ‘সমন্বয় করার জন্য’

বাগেরহাটে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আসাদুর রহমানের বিরুদ্ধে ভুয়া বিল-ভাউচার তৈরি করে ১৯ মাসে প্রায় ৩ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে অফিসের ভেতরে আলাদা কক্ষে রান্না-বান্না ও থাকার ব্যবস্থা করার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। বিভিন্ন খাতে ভুয়া বিল দেখিয়ে সরকারি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগের বিষয়টি নিয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ভেতরেই শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাগেরহাট পরিবেশ অধিদপ্তরের অফিসে ঝাড়ুদার (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) হিসেবে কর্মরত নীলিমা সরকার নামে এক কর্মচারীর মাসিক ৫ হাজার টাকার বেতন দেখানো হলেও তাকে বাস্তবে দেওয়া হচ্ছে মাত্র ২ হাজার টাকা। বাকি অর্থ ভাউচারের মাধ্যমে উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ। 

এ ছাড়া প্রায় ১০ বছর আগে বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘মাসুদ ইন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের পুরোনো ভাউচার ব্যবহার করে ৪ হাজার ২০০ টাকা উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে অফিসের জন্য টেবিলের গ্লাস ক্রয় না করেই ৩ হাজার টাকার ভাউচার দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ।

জানা গেছে, এক বছরে গাড়ির টায়ার পরিবর্তনের নামে একটি দোকান থেকে ৯ হাজার ৪০০ টাকার বিল দেখিয়ে অর্থ উত্তোলন করা হলেও বাস্তবে ওই খাতে কোনো ক্রয় হয়নি।

অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান থেকে ভাউচার সংগ্রহ করে নিজের ইচ্ছামতো বিল তৈরি করে সরকারি অর্থ উত্তোলন করা হচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন অভিযানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তাদের আপ্যায়নের খরচ দেখিয়েও অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ রয়েছে ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। 

সরেজমিনে বাগেরহাট শহরের ভিআইপি মোড়ে অবস্থিত পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, অফিসের একটি কক্ষ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। সেখানে রান্না-খাওয়াসহ থাকার ব্যবস্থা করেছেন উপপরিচালক আসাদুর রহমান। 

এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর সাইদুর রহমান বলেন, তিনি নিজে কোনো বিল-ভাউচার সংগ্রহ করেন না। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ বিল-ভাউচার সংগ্রহ করে তাকে লিখতে দেন এবং তিনি সেভাবেই তা প্রস্তুত করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছে জমা দেন।

পরিবেশ অধিদপ্তরের গাড়িচালক আরিফুর রহমান বলেন, তিনি এখানে যোগদানের পর শুধুমাত্র একটি গাড়ির টায়ার পরিবর্তন করা হয়েছে। এর বাইরে অন্য কোনো গাড়ির টায়ার পরিবর্তন করা হয়নি।

পরিচ্ছন্নতাকর্মী নীলিমা সরকার বলেন, আমি এখানে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজ করি। আমাকে মাসে দুই হাজার টাকা দেওয়া হয়। খাতা-কলমে পাঁচ হাজার টাকা দেখানো হলেও এ বিষয়ে আমি কিছু জানি না। তিনি জানান, তাকে মৌখিকভাবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং তিনি নিয়মিত দুই হাজার টাকাই পান।

অভিযোগের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আসাদুর রহমান বলেন, অফিসে কোনো জিনিসপত্র কেনার জন্য তাৎক্ষণিক বরাদ্দ থাকে না। এ জন্য ভাউচার করে কিছু টাকা আগে উত্তোলন করে রাখা হয়, পরে তা সমন্বয় করা হয়। 

তিনি দাবি করেন, অভিযানে গেলে পুলিশ সদস্যদের খাওয়া-দাওয়া, ফায়ার সার্ভিসকে সঙ্গে নিলে তাদের জ্বালানি খরচ এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আসলে আপ্যায়নসহ কিছু ‘হিডেন কস্ট’ থাকে, যা বিল করা যায় না। এসব খরচ মেটাতেই বিভিন্ন খাত থেকে সমন্বয় করে অর্থ উত্তোলন করা হয়। 

আসাদুর রহমান বলেন, ‘আমি তো আমার পকেট থেকে এই টাকা দেব না। এভাবেই আমাদের সমন্বয় করে চলতে হয়।’

এ বিষয়ে বাগেরহাট ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা মামুনুর রশিদ বলেন, অগ্নিকাণ্ড বা যে কোনো দুর্ঘটনার খবর পেলে তারা ২৪ ঘণ্টা সেবা দিয়ে থাকেন এবং এর বিনিময়ে কোনো ধরনের আর্থিক সহায়তা নেন না। সব খরচ সরকার বহন করে।

বাগেরহাটের পুলিশ সুপার মো. হাসান চৌধুরী বলেন, কোনো সরকারি দপ্তরের অভিযানে পুলিশের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে অর্থ নেওয়ার কোনো বিধান নেই। অর্থ নেওয়ার প্রশ্নই আসে না।

এ বিষয়ে খুলনা বিভাগীয় পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক খোন্দকার মো. ফজলুল হক বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ পাওয়া গেলে তা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।