logo

ভয়াল ৪ আগস্ট/ফেনীতে ১৪০০ আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে, উদ্ধার হয়নি একটি অস্ত্রও

ফেনীতে ১৪০০ আসামি ধরাছোঁয়ার বাইরে, উদ্ধার হয়নি একটি অস্ত্রও
ফেনীর মহিপালে ক্ষমতাসীন দলের অস্ত্রধারীরা হামলার দৃশ্য। ছবি: সংগৃহীত

ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট এক দফার আন্দোলন চলাকালে ফেনীর মহিপালে তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের অস্ত্রধারীরা নারকীয় ও নৃশংস হামলা চালায়। হামলায় সাতজন ছাত্র-জনতা শহীদ হন এবং আহত হন চার শতাধিক মানুষ। ঘটনার দু’বছর অতিক্রান্ত হলেও অধিকাংশ মূল হামলাকারী ও নির্দেশদাতা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছেন। এসব ঘটনায় করা মামলায় এখনও এক হাজার ৪০০-এর বেশি আসামি পলাতক। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত একটি আগ্নেয়াস্ত্রও উদ্ধার করা যায়নি।

​

প্রত্যক্ষদর্শী ও আন্দোলনে অংশগ্রহণকারীদের বিবরণ অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ওই দিন বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফেনী শহরের মহিপাল ফ্লাইওভারের নিচে জড়ো হতে থাকেন আন্দোলনকারী ছাত্র-জনতা। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক অবরুদ্ধ করে তারা সেখানে অবস্থান নেন। বেলা ১টার দিকে তারা সড়কেই জোহরের নামাজ আদায় করেন। নামাজ শেষ হওয়ার পরপরই ট্রাঙ্ক রোডের দিক থেকে মোড় নিয়ে সশস্ত্র মহড়া দিয়ে মহিপালের দিকে এগোতে থাকে তৎকালীন সরকারি দলের ক্যাডাররা।

একপর্যায়ে হামলাকারীরা মহিপাল চৌধুরী মার্কেটের সামনে পৌঁছে চারদিক থেকে আন্দোলনকারীদের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণ শুরু করে। গুলিতে ইশতিয়াক আহমেদ শ্রাবণ, ছাইদুল ইসলাম শাহী, মো. সরওয়ার জাহান মাসুদ, ওয়াকিল আহমেদ শিহাব, মাহবুবুল আলম মাসুম, জাকির হোসেন শাকিব ও মো. সবুজ শাহাদাত বরণ করেন। হামলায় অন্তত চার শতাধিক আন্দোলনকারী গুলিবিদ্ধ ও আহত হন। পরবর্তীতে বিকেল ৩টার দিকে ছাত্র-জনতার তীব্র প্রতিরোধের মুখে সন্ত্রাসীরা পিছু হটলে বিক্ষুব্ধ জনতা স্থানীয় পুলিশ বক্সে আগুন ধরিয়ে দেয়।

এর আগে দুপুর ১২টার দিকে রামপুরে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের ক্যাডাররা ঢুকে বিএনপি নেতাদের খোঁজে গুলি বর্ষণ করে। এছাড়া বিকেল ৪টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত শহীদ মিনার, জেল রোড ও ট্রাঙ্ক রোড এলাকায় দফায় দফায় রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ চলে। পরে শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে এসব হত্যা ও হামলার ঘটনায় ফেনী মডেল থানায় মোট ২২টি মামলা দায়ের করা হয়—যার মধ্যে ৭টি হত্যা এবং ১৫টি হত্যাচেষ্টা মামলা। এসব মামলায় এজাহারভুক্ত ও অজ্ঞাত মিলিয়ে মোট দুই হাজার ৫০৫ জনকে আসামি করা হয়েছে। পরবর্তীতে পুলিশের অভিযানে এজাহারনামীয় ২২৩ জন ও সন্দেহভাজন ৯৭০ জনসহ মোট এক হাজার ১৯২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে মূল অভিযুক্তসহ এখনও এক হাজার ৪০০ জনের বেশি আসামি অধরা রয়ে গেছেন।

এসব মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, ফেনী-১ আসনের সাবেক এমপি আলাউদ্দিন নাসিম, ফেনী-২ আসনের সাবেক এমপি নিজাম হাজারী ও ফেনী-৩ আসনের সাবেক এমপি মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীসহ বিপুল সংখ্যক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর নিজাম হাজারীসহ শীর্ষ অনেক আসামি বিদেশে পালিয়ে গেছেন বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে।

শহীদ ইশতিয়াক আহমদ শ্রাবণের বাবা নেছার আহমদ বলেন, মামলার অনেক মূল অভিযুক্ত আসামি এখনো বাইরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। দুই বছর পার হয়ে গেলেও তাদের গ্রেপ্তার কিংবা হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্র উদ্ধার করা যায়নি। সরকারের কাছে আমার দাবি, জীবিত থাকতেই যেন ছেলে হত্যার বিচার দেখে যেতে পারি।

ফেনীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মো. সাইফুল ইসলাম জানান, ২২টি মামলার মধ্যে ৬টি হত্যা মামলার চার্জশিটসহ মোট ১৪টি মামলার চার্জশিট আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে জেলা জজ আদালতে ‘সবুজ হত্যা’ মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। জাকির হোসেন শাকিব হত্যা মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। তিনি আরও বলেন, শীর্ষ আসামি, প্রভাবশালী ও বাদ পড়া চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের বিষয়ে পুলিশ সতর্ক রয়েছে এবং তাদের আইনের আওতায় আনতে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

মামলাগুলোর বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মেজবাহ উদ্দিন ভূঁইয়া জানান, যেসব মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করে আসামিদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিতে আমরা আইনি লড়াই চালিয়ে যাচ্ছি। তবে যারা প্রকাশ্যে অস্ত্র উঁচিয়ে সেদিন হামলা চালিয়েছিল, সেই চিহ্নিত অস্ত্রধারীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে পূর্ণাঙ্গ ন্যায়বিচার ব্যাহত হবে।

অস্ত্র উদ্ধারের বিষয়ে ফেনীর পুলিশ সুপার প্রত্যুষ কুমার মজুমদার এশিয়া পোস্টকে জানান, আসলে ফেনীতে ছাত্র জনতার উপর হামলার ঘটনায় যে অস্ত্রগুলো ব্যবহৃত হয়েছে সে সব অস্ত্রধারীর এখন দেশের বাইরে পলাতক। তাদের দু-একজনকে ধরতে পারলে তাদের তথ্য অনুসারে মরণঘাতি ওইসব অস্ত্র উদ্বার সহজ হতো। এরপরেও পুলিশ বসে নাই আমরা আমাদের সাধ্যমত চেষ্টা করছি ওইসব অবৈধ অস্ত্রগুলো উদ্ধারের জন্য।