২০ বছর ধরে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পুলিশ ফাঁড়ি, চিকিৎসার অভাবে ৩০ হাজার মানুষ

ভবন, স্বাস্থ্যকর্মীসহ আছেন চিকিৎসকও, কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিজস্ব ভবনে নেই কোনো স্বাস্থ্যসেবা। সরকারের ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ভবনটি গত দুই দশক ধরে ব্যবহৃত হচ্ছে পুলিশ ফাঁড়ি হিসেবে। সপ্তাহে মাত্র দুই দিন স্থানীয় একটি বাড়িতে বসে স্বাস্থ্যকর্মীরা কার্যক্রম চালান। জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগী নিয়ে ছুটতে হয় উপজেলা কিংবা জেলা শহরে। কখনো যমুনা নদী পেরিয়ে যেতে হয় মানিকগঞ্জ বা রাজবাড়ীর হাসপাতালে।
এ চিত্র পাবনার বেড়া উপজেলার দুর্গম ও যোগাযোগবিচ্ছিন্ন ঢালারচর ইউনিয়নের। প্রায় ৩০ হাজার মানুষের এই ইউনিয়নে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ২০০৩ সালে ২৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি। নির্মাণের তিন বছর পর, ২০০৬ সালের নভেম্বর মাসে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সাময়িকভাবে ওই ভবনে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। এরপর কেটে গেছে প্রায় দুই দশক। কিন্তু স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবনটি আর স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে ফেরত দেওয়া হয়নি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকা সত্ত্বেও তারা এর সুফল পাচ্ছেন না। বিশেষ করে প্রসূতি ও জরুরি রোগীদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি। দুর্গম চরাঞ্চল হওয়ায় দ্রুত রোগীকে অন্যত্র নেওয়াও অনেক সময় সম্ভব হয় না।
একজন স্থানীয় বাসিন্দা রোমেছা খাতুন বলেন, আমরা অনেক জায়গায় সেবা নিতে যাই। অনেক সময় প্রসূতি রোগী মারাও যায়। আমাদের এখানে হাসপাতাল থাকা সত্ত্বেও কেন পাবনা সদরে যেতে হবে, কেন রাজবাড়িতে যেতে হবে?
ঢালারচরের স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল করিম মুছা বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পুলিশ যেমন প্রয়োজন, তেমনি দুর্গম চরাঞ্চলের মানুষের জীবন বাঁচাতে স্বাস্থ্যসেবাও জরুরি। একটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র ২০ বছর ধরে অন্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে— এটা কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। পুলিশ ফাঁড়ির জন্য বিকল্প ভবনের ব্যবস্থা করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দ্রুত চালু করা হোক। আমরা চাই, সমন্বয়ের মাধ্যমে দুটো সেবাই চালু থাকুক।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা বিল্লাল হোসেন বলেন, মানুষের চিকিৎসার কথা চিন্তা করে এখানে হাসপাতাল নির্মাণ করা হয়েছিল। কিন্তু এত বছরেও আমরা সেই হাসপাতালের চিকিৎসাসেবা চোখে দেখলাম না। অসুস্থ হলে চিকিৎসার জন্য পাবনা জেনারেল হাসপাতালে যেতে হয়। অনেক সময় যমুনা নদী পার হয়ে মানিকগঞ্জ বা রাজবাড়ীর হাসপাতালে যেতে হয়। নদীপথে রোগী নিয়ে যাতায়াত করা অনেক ব্যয়বহুল ও কষ্টের। জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে এই ভোগান্তি আরও বেড়ে যায়। আমাদের দাবি, দ্রুত এই স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করে ঢালারচরের মানুষের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হোক।
ঢালারচর ইউনিয়নটি যমুনা নদীবেষ্টিত দুর্গম চরাঞ্চল। উপজেলা বা জেলা শহরের সঙ্গে এখানকার যোগাযোগব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত। এমন এলাকায় মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে ২০০৩ সালে ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রটি নির্মাণ করা হয়। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির কারণে ২০০৬ সালের নভেম্বরে সেখানে সাময়িকভাবে পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, তখন বলা হয়েছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রম আবার চালু হবে। তবে সেই ‘সাময়িক’ ব্যবস্থা প্রায় ২০ বছরেও শেষ হয়নি।
ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবনটি স্বাস্থ্যসেবার কাজে ব্যবহার না হয়ে পুলিশের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে স্থানীয় একটি বাড়িতে সপ্তাহে দুই দিন স্বাস্থ্যকর্মীরা বসেন। সেখানে সীমিত পরিসরে সেবা দেওয়া হলেও স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিজস্ব ভবন, প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও জরুরি চিকিৎসার সুবিধা না থাকায় মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় সমস্যা জরুরি চিকিৎসা নিয়ে। কোনো রোগীর অবস্থা গুরুতর হলে তাকে বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স কিংবা পাবনা সদর হাসপাতালে নিতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে নদী পেরিয়ে মানিকগঞ্জ বা রাজবাড়ীর হাসপাতালেও যেতে হয়। চরাঞ্চলের নৌপথ, দীর্ঘ দূরত্ব ও দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থার কারণে এই যাত্রা রোগীর স্বজনদের জন্য যেমন ব্যয়বহুল, তেমনি সংকটাপন্ন রোগীর জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। প্রসূতি রোগীদের ক্ষেত্রে সময়মতো চিকিৎসা না পাওয়ার আশঙ্কাও থাকে।
এর মধ্যে ঢালারচরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ভয়াবহতারও নজির রয়েছে। ২০১০ সালের ২০ জুলাই রাত সাড়ে আটটার দিকে বেড়া উপজেলার মালদার হাট বাঁধের কাছে ঢালারচর পুলিশ ফাঁড়ির দায়িত্বে থাকা উপপরিদর্শক (এসআই) কফিল উদ্দিন (৫০), নায়েক ওয়াহেদ আলী (৩৫) ও কনস্টেবল শফিকুল ইসলামকে (৩৫) গুলি করে হত্যা করে চরমপন্থিরা।
এ ঘটনায় পরদিন ২১ জুলাই বেড়া থানার পুলিশ কনস্টেবল রশিদুল ইসলাম বাদী হয়ে হত্যা মামলা করেন। মামলায় ১৬ জনকে আসামি করে ২০১১ সালের ৩১ অক্টোবর আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। পরে দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য ২০১৬ সালে মামলাটি রাজশাহী দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে স্থানান্তর করা হয়। দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া শেষে ২০১৯ সালের ২৪ এপ্রিল মামলার রায়ে আসামিদের ফাঁসির আদেশ দেওয়া হয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলছেন, অতীতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে পুলিশ ফাঁড়ির প্রয়োজনীয়তা থাকলেও এখন স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি অনির্দিষ্টকাল পুলিশ ফাঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হওয়া গ্রহণযোগ্য নয়। তাদের দাবি, পুলিশ ফাঁড়ির জন্য বিকল্প সরকারি ভবনের ব্যবস্থা করে স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিজস্ব ভবনে চিকিৎসাসেবা চালু করা হোক।
বেড়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, স্বাস্থ্যকেন্দ্রের ভবনটি পুলিশের ব্যবহারে থাকায় সেখানে স্বাস্থ্যসেবা চালু করা যাচ্ছে না। বিষয়টি সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার জানানো হয়েছে।
বেড়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা শাহজাহান সিরাজ এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঢালারচর ইউনিয়নের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কেন্দ্রের ভবনটি দীর্ঘদিন ধরে পুলিশ ফাঁড়ি হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিষয়টি আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে জেলা প্রশাসককে জানিয়েছি। তিনি সমস্যাটি সমাধানের আশ্বাসও দিয়েছিলেন। কিন্তু এখনো পর্যন্ত ভবনটি স্বাস্থ্য বিভাগের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া সম্ভব হয়নি। এতে দুর্গম এই এলাকার মানুষের কাছে নিয়মিত ও প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আমাদের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। বিশেষ করে জরুরি ও প্রসূতি রোগীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি বেশি গুরুত্বপূর্ণ। স্বাস্থ্যকেন্দ্রের নিজস্ব ভবনে কার্যক্রম চালু করা গেলে স্থানীয় মানুষ অনেক সহজে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পাবেন।
পাবনার পুলিশ সুপার আবু আশ্রাফ এশিয়া পোস্টকে বলেন, স্বাস্থ্য বিভাগ যদি এই ভবনে স্বাস্থ্যসেবা কার্যক্রম চালু করতে চায়, তাহলে বিষয়টি নিয়ে আমরা তাদের সঙ্গে সমন্বয় করতে প্রস্তুত আছি। স্বাস্থ্যসেবা চালু করার জন্য ভবনটি প্রয়োজন হলে আমরা সেটি স্বাস্থ্য বিভাগকে বুঝিয়ে দিতে পারি। সে ক্ষেত্রে পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিকল্প কোনো সরকারি ভবনের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। দুই বিভাগের মধ্যে সমন্বয়ের মাধ্যমে দ্রুত একটি সমাধানে পৌঁছানো সম্ভব। দুর্গম এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ, একই সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার জন্য পুলিশ ফাঁড়ির কার্যক্রমও চালু রাখা প্রয়োজন।
পাবনার সিভিল সার্জন শহিদুল্লাহ দেওয়ান এশিয়া পোস্টকে বলেন, ওই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি বেড়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অধীনে পরিচালিত হওয়ার কথা। দীর্ঘদিন ধরে সেটি বন্ধ রয়েছে কি না এবং বর্তমানে সেখানে কী ধরনের সমস্যা রয়েছে, বিষয়টি খোঁজখবর নিয়ে দেখা হবে। সংশ্লিষ্ট উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য নেওয়া হবে। এরপর প্রয়োজনীয় বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে আলোচনা করা হবে। দুর্গম এলাকার মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখে পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।




