‘মনটা খুব ভারী’, পূর্ণ সেবা শেষে সাধুদের বিদায়

দীর্ঘ এক বছরের অপেক্ষার পর কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ার লালন আখড়াবাড়িতে সমবেত হয়েছিলেন দেশ-বিদেশের হাজারো সাধু-গুরু ও লালন অনুসারী। পূর্ণ সেবা শেষে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে আখড়াবাড়ি ছাড়তে শুরু করেছেন সাধুরা।
অধিবাস, বাল্যসেবা ও পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে রোববার (১৮ অক্টোবর) শেষ হয়েছে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা। তবে মূল মঞ্চের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ মেলা চলবে সোমবার পর্যন্ত।
বাউল সাধক ফকির লালন সাঁইয়ের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনের উৎসবের দ্বিতীয় দিনেই ভাঙতে শুরু করেছে সাধুদের মিলনমেলা। লালনের মানবতাবাদী দর্শন, আত্মশুদ্ধি ও মরমি সাধনার চর্চায় একত্র হওয়া সাধুরা আনুষ্ঠানিকতা শেষে ফিরছেন নিজ নিজ গন্তব্যে। রেখে যাচ্ছেন আগামী বছর আবারও ফিরে আসার প্রত্যাশা।
রোববার সকালে বাল্যসেবা ও দুপুরে পূর্ণ সেবা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে। বিকেল থেকেই অনেক সাধু আখড়াবাড়ি ছেড়ে চলে যান। কেউ কেউ গুরুকার্য সম্পন্ন করে সোমবার সকালে বিদায় নেবেন বলে জানা গেছে।
গাইবান্ধা থেকে আসা নিজাম ফকির বলেন, ‘আমরা প্রতিবছর সাঁইজির ধামে আসি। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধু-গুরুরা একত্রিত হয়ে সাধুসঙ্গ করি। অধিবাস, রাখাল সেবা, বাল্যসেবা ও পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে আমাদের সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়েছে। আজ অশ্রুসিক্ত নয়নে সাঁইজির আখড়াবাড়ি ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আবারও আগামী বছর আসব। এই মিলনমেলায় সবার সঙ্গে দেখা হবে, এটাই আমাদের প্রত্যাশা।’
মামুন সাধু বলেন, ‘সাঁইজির ধামে এলে আমরা সবাই এক পরিবারের মতো মিলিত হই। সাধুসঙ্গের মধ্য দিয়ে গুরু-সান্নিধ্য লাভ করি এবং লালন সাঁইয়ের মানবতাবাদী দর্শন ও মরমি ভাবধারার চর্চা করি। পূর্ণ সেবার মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হওয়ায় এখন বিদায়ের পালা। মনটা খুব ভারী হয়ে আছে। আবারও আগামী বছর সাঁইজির ধামে ফিরে আসার অপেক্ষায় থাকব।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আসা এক নারী শিক্ষার্থী জানান, লালন সাঁইয়ের দার্শনিক ভাবনা সম্পর্কে জানা ও তা উপলব্ধি করতেই তিনি এখানে এসেছেন। বিশেষ করে সমাজের বৈষম্যবিরোধী বার্তা তাকে আকৃষ্ট করে। তার ভাষ্য, লালনের দর্শন ও চিন্তাধারা কাছ থেকে অনুভব করার সুযোগ গুরুত্বপূর্ণ। তার গানের কথাও মনের গভীরে দাগ কাটে। এ আয়োজন থেকে মানবতা, সাম্য ও ইতিবাচক চিন্তার বার্তা নিয়ে ফিরতে চান তিনি।
সাধুদের বিদায়ে আখড়াবাড়িতে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলেও উৎসবের আমেজ এখনও কাটেনি। মূল মঞ্চে লালন একাডেমির শিল্পী ও দেশের বিভিন্ন প্রান্তের লালনশিল্পীদের পরিবেশনায় চলছে মরমি সংগীত। পাশাপাশি আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণে বসা তিন দিনের গ্রামীণ মেলাও চলবে সোমবার পর্যন্ত। ফলে সাধুদের বড় একটি অংশ ফিরে গেলেও লালনভক্ত ও দর্শনার্থীদের আনাগোনা অব্যাহত রয়েছে।
দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীদের কেউ লালনের দর্শন জানতে, কেউ তার মানবতাবাদী চিন্তায় জীবনের অর্থ খুঁজতে, আবার কেউ আত্মিক প্রশান্তির আশায় ছুটে এসেছেন এই ধামে। লালনের প্রেম, মানবিকতা ও আত্মশুদ্ধির বাণীকে ধারণ করে প্রতিবছর এখানে মিলিত হন তার ভক্ত-অনুসারীরা।
ঐতিহাসিক এ উৎসব নির্বিঘ্ন করতে জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে কয়েক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা।
কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসান এশিয়া পোস্টকে বলেন, লালন সাঁইয়ের তিরোধান দিবস শুধু স্মরণোৎসব নয়; এটি তার মানবতাবাদী দর্শন, অসাম্প্রদায়িক চেতনা ও সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ আয়োজন। এ উৎসবে দেশ-বিদেশের লালনভক্ত, সাধু-গুরু ও দর্শনার্থীরা একত্র হন।
তিনি আরও বলেন, উৎসব শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও নির্বিঘ্ন করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং উৎসবের পরিবেশ বজায় রাখতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
১২৯৭ বঙ্গাব্দের পহেলা কার্তিক ফকির লালন সাঁইয়ের মৃত্যুর পর থেকে তার স্মরণে ভক্ত-অনুসারীরা বিভিন্ন আয়োজন করে আসছেন। পরবর্তী সময়ে লালন একাডেমি ও জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এ আয়োজন বিস্তৃত রূপ পায়। প্রতিবছর তিরোধান দিবসে লালনের দর্শন, মানবতাবাদী ভাবধারা ও মরমি সংগীতের টানে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে সমবেত হন দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত, সাধু ও দর্শনার্থী।

