১১৮ বছর ধরে ফ্রিতে পথিকদের থাকা-খাওয়া দিচ্ছে ‘মুসাফিরখানা’

সবকিছু যখন বাণিজ্যকেন্দ্রিক, ঠিক তখন নওগাঁর পোরশায় দীর্ঘ ১১৮ বছর ধরে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ক্লান্ত পথচারীদের আশ্রয় ও খাবারের ব্যবস্থা করে যাচ্ছে একটি ‘মুসাফিরখানা’। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে যে কোনো মানুষ এখানে সর্বোচ্চ তিন দিন বিনামূল্যে রাত যাপন ও খাবারের সুযোগ পাচ্ছেন। শতবর্ষী এই মানবিক উদ্যোগটি আজও বরেন্দ্র অঞ্চলে মানবসেবার এক বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯০৮ সালের দিকে নওগাঁ অঞ্চলের যোগাযোগ ব্যবস্থা অত্যন্ত অনুন্নত ছিল। দূর-দূরান্তে ব্যবসা বা তীর্থযাত্রায় মানুষকে হেঁটে কিংবা গরুর গাড়িতে যাতায়াত করতে হতো। মেঠোপথে সন্ধ্যা নামলেই ঘনিয়ে আসত ডাকাত ও বন্যপ্রাণীর আতঙ্ক। তৎকালীন ব্যবসায়ী খাদেম মোহাম্মদ শাহ ব্যবসার প্রয়োজনে কলকাতায় গিয়ে সেখানকার মুসাফিরখানা দেখে অনুপ্রাণিত হন। এরপর নিজ জন্মভূমিতেই পথিকদের জন্য একটি নিরাপদ আশ্রয়স্থল গড়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, পোরশায় নিজ বাসভবনের পাশে মাটির দেয়াল ও টিনের চালে চার কক্ষের একটি মুসাফিরখানা নির্মাণ করেন খাদেম মোহাম্মদ শাহ। তার মৃত্যুর পরও যেন এই মানবিক কাজ বন্ধ না হয়, সেজন্য তিনি ৮০ বিঘা জমি ওয়াকফ করে দেন। কালের পরিক্রমায় সেই ওয়াকফকৃত সম্পত্তির আয়ে ১৯৮৮ সালে পুরোনো মাটির ঘরের জায়গায় একটি আধুনিক দ্বিতল ভবন নির্মাণ করা হয়। বর্তমানে পোরশা সদরের মিনা বাজারে অবস্থিত এই মুসাফিরখানায় ১৬টি কক্ষ ও একটি হলরুম রয়েছে, যেখানে একসঙ্গে প্রায় ৬০ জন অতিথি অনায়াসে অবস্থান করতে পারেন।
প্রতিষ্ঠাতার প্রপৌত্র ষাটোর্ধ্ব ফারুকুজ্জামান শাহ এশিয়া পোস্টকে জানান, এই প্রতিষ্ঠানে যে কোনো ধর্ম ও বর্ণের মানুষের প্রবেশাধিকার রয়েছে। একসময় এখানে প্রতিদিন তিন বেলা বিনামূল্যে খাবার দেওয়া হতো। তবে বর্তমানে নিজস্ব সম্পত্তির আয়ে প্রতি বুধবার দুপুরে অতিথিদের বিনামূল্যে খাবার পরিবেশন করা হয়। অন্য দিনগুলোতে দুপুর ও রাতের খাবার খেতে চাইলে অতিথিদের যথাক্রমে সকাল ৯টা এবং বিকেল ৪টার মধ্যে কর্তৃপক্ষকে আগাম জানাতে হয়। প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য বর্তমানে একজন ম্যানেজার ও দুজন কর্মচারী নিয়োজিত রয়েছেন।
দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে এখানে আগত অতিথিদের সেবা দিয়ে আসছেন খাদেম মোসলেম উদ্দিন। তিনি এশিয়া পোস্টকে জানান, প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৭ জন মানুষ এখানে রাত্রিযাপন করেন। এখানে বেশ শৃঙ্খলা মেনে চলতে হয়, অতিথিদের নিজেদের বিছানা নিজেদেরই প্রস্তুত করতে হয় এবং পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও সচেতন থাকতে হয়।
বর্তমানে পোরশা উপজেলা সদর বা এর আশপাশে কোনো বাণিজ্যিক আবাসিক হোটেল গড়ে ওঠেনি। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ী, পর্যটক ও পথচারীদের একমাত্র ভরসাস্থল এই মুসাফিরখানা। স্থানীয় প্রবীণদের মতে, একসময় গরুর গাড়িতে চলাচলকারী মানুষেরা রাতের আতঙ্ক থেকে বাঁচতে এখানে আশ্রয় নিতেন। যুগের পরিবর্তন হলেও এই মুসাফিরখানার আতিথেয়তায় কোনো ঘাটতি পড়েনি। এখানে থাকা অতিথিরা জানান, প্রত্যন্ত অঞ্চলে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে থাকা ও খাওয়ার এমন চমৎকার ব্যবস্থা সত্যিই বিরল, আর এখানকার মানুষের আন্তরিকতাও প্রশংসনীয়।
প্রতিষ্ঠাতা খাদেম মোহাম্মদ শাহ আজ বেঁচে নেই, কিন্তু তার দূরদর্শী চিন্তায় রোপণ করা মানবতার বীজটি আজও হাজারো মানুষের নিরাপদ আশ্রয়। শত বছর পেরিয়ে গেলেও তার নিজ সম্পত্তির উপার্জনে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে আশ্রয় ও খাবারের এই দৃষ্টান্ত আধুনিক সমাজের কাছে এক বড় বার্তা।
