logo
Advertisement

১৭ বছরের শাহেদের ‘ঘুষ.সাইট’, ময়মনসিংহে দুই কর্মকর্তাকে শোকজ

এশিয়া পোস্ট নিউজ,ময়মনসিংহ
১৭ বছরের শাহেদের ‘ঘুষ.সাইট’, ময়মনসিংহে দুই কর্মকর্তাকে শোকজ
বাঁয়ে ঘুষ.সাইটের লোগো ও আলোচনায় আসা শাহেদ শরীফ আহমেদ। ছবি : এশিয়া পোস্ট কোলাজ

মৃত মায়ের সরকারি পাওনা টাকা তুলতে গিয়ে বাবার ঘুষ দেওয়ার তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং নিজের পাসপোর্ট করাতে গিয়ে হয়রানির শিকার হয়ে অনলাইনে ঘুষের তথ্য জমা দেওয়ার ব্যতিক্রমী উদ্যোগ ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) তৈরি করেছিল ১৭ বছরের কিশোর শাহেদ শরীফ আহমেদ।

Advertisement

এ নিয়ে সম্প্রতি এশিয়া পোস্টসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে বিশেষ প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ার পর টনক নড়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। প্রাথমিক শিক্ষক পরিবারের পাওয়া টাকা আটকে রেখে অতিরিক্ত ঘুষ দাবির অভিযোগে দুই কর্মচারীকে শোকজ (কারণ দর্শানোর নোটিশ) করা হয়েছে।

শোকজ পাওয়া দুজন হলেন, ময়মনসিংহ সদর উপজেলা শিক্ষা কার্যালয়ের হিসাব সহকারী এ এইচ এম নাদিরুল হাসান সবুজ এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর মুহাম্মদ মজিবুর রহমান।

সোমবার (৩১ আগস্ট) তাদের শোকজ নোটিশ দেন ময়মনসিংহ সদর উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মনিকা পারভীন।

তিনি জানান, কেন এমন ঘুষ দাবি ও হয়রানির পরিস্থিতি তৈরি হলো, তার কারণ ব্যাখ্যা করে আগামী ৩ কার্যদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব দিতে বলা হয়েছে।

শাহেদের বাবা ও সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা শরীফুল ইসলাম শামীম জানান, ময়মনসিংহের আজমতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক ও তার স্ত্রী আমিনা খাতুন ২০২২ সালের ডিসেম্বরে মারা যান। মৃত্যুর সময় তার ১৩ বছরের চাকরিজীবন বাকি ছিল। স্ত্রীর জমাকৃত প্রভিডেন্ট ফান্ডের প্রায় ৭ লাখ টাকা তুলতে গিয়ে তাদের ট্রেজারি অফিসে ১০ হাজার, জেলা শিক্ষা অফিসে ২০ হাজার এবং উপজেলা শিক্ষা অফিসে ৮ হাজার টাকা—মোট ৩৮ হাজার টাকা বাধ্য হয়ে ঘুষ দিতে হয়।

পরবর্তীতে কল্যাণ তহবিলের ২ লাখ এবং চাকরিরত অবস্থায় মৃত্যুর সরকারি অনুদানের ৮ লাখ—মোট ১০ লাখ টাকা ছাড় করাতে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা দপ্তরের কর্মচারীরা নতুন করে আবারও ১ লাখ টাকা ঘুষ দাবি করেন। টাকা না দিলে ফাইল আটকানোর হুমকি দিলে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে ব্রিটিশ কাউন্সিলের অধীনে এ-লেভেলে পড়ুয়া শিক্ষার্থী শাহেদ।

নিজের কোডিং দক্ষতা কাজে লাগিয়ে বন্ধু সাইফ কবিরকে সঙ্গে নিয়ে গত ২১ আগস্ট শাহেদ ‘ঘুষ.সাইট’ (ghush.site) চালু করে। চালুর মাত্র ৯ দিনে ওয়েবসাইটটিতে ৯ হাজার ৬৬৫টি ঘুষের অভিযোগ জমা পড়ে, যার মাধ্যমে চাওয়া ঘুষের আনুমানিক পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩২১ থেকে ৩৩২ কোটি টাকা। চার সদস্যের এক টিম অভিযোগগুলো স্ক্রিনিং করলেও আইনি সুরক্ষার স্বার্থে কোনো ব্যক্তির নাম সরাসরি প্রকাশ করা হচ্ছে না।

শাহেদ জানায়, ‘আমাদের লক্ষ্য কোনো নির্দিষ্ট মানুষকে আক্রমণ করা নয়; বরং কোন দপ্তরে কী পরিমাণ অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে, তার সার্বিক চিত্র সরকারের সামনে তোলা। আশা করি একদিন এই সাইটে অভিযোগের সংখ্যা শূন্যে নেমে আসবে।’

সচেতন নাগরিক কমিটি (সনাক) ময়মনসিংহ জেলা শাখার সহসভাপতি শরীফুজ্জামান টিটু বলেন, ঘুষ শুধু একজন নাগরিকের আর্থিক ক্ষতি করে না, এটি সরকারি সেবার স্বাভাবিক প্রবাহও ব্যাহত করে। প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘুষের অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ ও প্রকাশের উদ্যোগকে তিনি ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। সরকার চাইলে এ ধরনের তথ্য কাজে লাগিয়ে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে।

ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (প্রশাসন) আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, তরুণদের এই উদ্যোগ পুলিশের নজরে এসেছে। কোনো অনিয়ম বা ঘুষের তথ্য পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। উদ্যোক্তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো আশঙ্কা তৈরি হলে পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেবে।

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) ময়মনসিংহের সহকারী পরিচালক রাজু মো. সারওয়ার হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, ঘুষ দাবির বিষয়ে ভুক্তভোগী দুদকে অভিযোগ দিতে পারেন। এ ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনুমতি নিয়ে অনুসন্ধান শুরু করা হবে। এ ছাড়া আকস্মিক অভিযানও হতে পারে।