
মুমূর্ষু রোগী কিংবা আহত কাউকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়ার প্রয়োজন হলে সহজে পৌঁছানো যেত না। সময়মতো চিকিৎসা না পেয়ে বাড়িতেই অনেকের মৃত্যু হয়েছে। নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার তিন গ্রামের মানুষ বছরের পর বছর ধরে এভাবেই একমাত্র সরু সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করে আসছিলেন। অবশেষে প্রায় ৫০ বছরের পুরোনো সেই সাঁকোর জায়গায় কাঠের সেতু পেয়েছেন তারা।
উপজেলা হাতিয়ার তমরদ্দি ইউনিয়নের দক্ষিণে রয়েছে কোরালিয়া, পশ্চিম জোড়খালী ও মাইজচরা গ্রাম। এসব গ্রামে প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার পরিবারের বসবাস। গ্রামগুলোর বাসিন্দাদের তমরদ্দি বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে যেতে কাটাখালী খাল পার হতে হয়। স্বাধীনতার আগে থেকেই খালটির ওপর নির্মিত সাঁকো দিয়ে চলাচল করে আসছেন তারা।
সম্প্রতি সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, নতুন সেতুটি দেখতে গ্রামের বিভিন্ন বয়সী মানুষ ভিড় করেছেন। শিশু থেকে বৃদ্ধ, সবার মধ্যে বিরাজ করছে আনন্দ-উচ্ছ্বাস। শুধু স্থানীয় বাসিন্দারাই নন, আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকেও মানুষ সেতুটি দেখতে আসছেন।
সম্পূর্ণ কাঠ দিয়ে নির্মিত সেতুটির নিচে রয়েছে সিমেন্টের খুঁটি। এর ওপর কাঠের পাটাতন বসিয়ে দুই পাশে দেওয়া হয়েছে হাতল। পুরো সেতুটি রং করে দৃষ্টিনন্দন করে তোলা হয়েছে। এখন গ্রামের মানুষ সাইকেল ও মোটরসাইকেল নিয়ে সেতুটি পার হতে পারছেন। দীর্ঘদিনের ভোগান্তি কমে যাওয়ায় তাদের মধ্যে স্বস্তি ফিরে এসেছে। তবে তাদের প্রত্যাশা, একসময় এই কাঠের সেতুর জায়গায় নির্মিত হবে টেকসই পাকা সেতু।
প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরের সোনাদিয়া থেকে সেতুটি দেখতে এসেছেন আরিয়ান ফরিদ। পেশায় কনটেন্ট ক্রিয়েটর ফরিদ বলেন, লম্বা সেতুটি রং করে দৃষ্টিনন্দনভাবে সাজানো হয়েছে। দূর থেকে দেখতে অনেকটা বিশাল সেতুর মতো মনে হয়। ছোট কোনো নদীর ওপর নির্মিত সেতুর দৃশ্যও মনে করিয়ে দেয় এটি। সেতুটি এখন দর্শনীয় স্থানে পরিণত হয়েছে। তাই ড্রোন ক্যামেরা নিয়ে এসেছেন তিনি। সেতুটির ভিডিও ধারণ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করবেন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, প্রায় ২০০ ফুট দীর্ঘ এই সাঁকো পার হতে গিয়ে বছরের পর বছর নানা দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন মানুষ। মুমূর্ষু রোগী, বয়স্ক ব্যক্তি থেকে শুরু করে কোমলমতি শিক্ষার্থী—সবাইকে ঝুঁকি নিয়ে সাঁকো পার হতে হতো। দোকানের মালামালও মাথায় বহন করে খালের একপাড় থেকে অন্যপাড়ে নিতে হতো। দীর্ঘ সময়ে সাঁকো থেকে পড়ে অঙ্গহানির পাশাপাশি শিক্ষার্থী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। মালামাল বহন করতে গিয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন কয়েকজন শ্রমিক।
কোরালিয়া গ্রামের খালের পাড়ে বেড়িবাঁধের ওপর দোকান করেন নুরউদ্দিন শের আলী (৬০)। তিনি বলেন, তার দোকানের মালামাল আনতে হয় তমরদ্দি বাজার থেকে। নির্দিষ্ট একজন ভ্যানচালক গাড়িতে করে মালামাল এনে খালের ওপারে রেখে যান। এরপর মাথায় করে সাঁকো পার হয়ে সেগুলো দোকানে পৌঁছাতে হয়। গত বছর এভাবে মালামাল আনতে গিয়ে চিনির বস্তাসহ সাঁকো ভেঙে খালে পড়ে যান নুর ইসলাম নামের এক ভ্যানচালক। এতে তার এক হাত ও এক পা ভেঙে যায়। ঢাকা ও অন্যান্য স্থানে চিকিৎসা করিয়েও সুস্থ হতে পারেননি তিনি। এখন পঙ্গুত্ব নিয়ে বাড়িতে বসবাস করছেন।
শের আলী আরও বলেন, এই সাঁকো পার হয়েই গ্রামের শিক্ষার্থীদের তমরদ্দি উচ্চবিদ্যালয়ে যেতে হয়। ২০২৫ সালের শেষের দিকে এক ছাত্রী হঠাৎ খালে পড়ে ভেসে যেতে থাকে। সঙ্গে থাকা সহপাঠীদের চিৎকার শুনে দোকান থেকে লোকজন ছুটে গিয়ে তাকে উদ্ধার করেন।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা সিরাজ মিয়া (৮৫) বলেন, যোগাযোগব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় অন্য গ্রামের মানুষ এই গ্রামে মেয়েদের বিয়ে দিতেও অনীহা প্রকাশ করতেন। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে তিনি এই সাঁকো দিয়ে তমরদ্দি বাজারে যাতায়াত করছেন। দিনের বেলায় কোনো প্রয়োজনে যাতায়াত করা গেলেও রাতে তা প্রায় অসম্ভব ছিল।
নিজের পরিবারের একটি দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে সিরাজ মিয়া বলেন, একবার তার ছেলের স্ত্রীর প্রথম সন্তান প্রসবের সময় জটিলতা দেখা দেয়। গ্রামের চিকিৎসকেরা দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। কিন্তু যোগাযোগের অসুবিধার কারণে সারারাত অপেক্ষা করে সকালে নৌকায় খাল পার হয়ে তাকে হাসপাতালে নিতে হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচন এলে বিভিন্ন সময়ে জনপ্রতিনিধিরা সেতু নির্মাণের আশ্বাস দিলেও পরে তা আর বাস্তবায়িত হয়নি। সম্প্রতি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল একটি কাজে ওই গ্রামে যাওয়ার পথে সাঁকোটি দেখে থমকে দাঁড়ান। পরে গ্রামবাসীর কাছে সাঁকোটির দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের ইতিহাস শুনে বিস্মিত হন। এরপর তিনি নিজ উদ্যোগে সেখানে কাঠের সেতু নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। জীবনের শেষ সময়ে এসে গ্রামবাসীর দীর্ঘদিনের কষ্ট কিছুটা লাঘব হতে দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বৃদ্ধ সিরাজ মিয়া।
এ বিষয়ে হাতিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রাসেল ইকবাল বলেন, যোগাযোগব্যবস্থার অভাবে এলাকাটি অনেকটা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল। ফলে মানুষের স্বাভাবিক চাহিদা পূরণ করাও কঠিন হয়ে উঠেছিল। একটি সাঁকোকে সেতুতে রূপান্তরের মাধ্যমে এ অঞ্চলের মানুষের আর্থসামাজিক উন্নয়নের চেষ্টা করা হয়েছে মাত্র। এখানে পাকা সেতু নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে জানানো হয়েছে।
