গরু পাচার চক্রের ফাঁদে শ্রমজীবী মানুষ, ধরাছোঁয়ার বাইরে মূল হোতারা

দিনটি ছিল বুধবার (২০২৬ সালের ২১ জানুয়ারি)। গভীর রাত, মানুষ তখন ঘুমে আচ্ছন্ন। সীমান্তে জড়ো হয়েছেন ৫০ জনের একটি দল। উদ্দেশ্য সীমান্ত পার হয়ে ভারতে প্রবেশ করা। দুই দেশের সীমান্তরক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে তারা সীমান্ত পার হয়েছেন। কিন্তু ওপারে গিয়ে রক্ষা হলো না। ধাওয়া দেয় পুলিশ। আটক হন তিনজন। অন্যরা পালিয়ে বাংলাদেশে আসতে সক্ষম হন।
এ ঘটনা চাঁপাইনবাবগঞ্জের সদর উপজেলার জহুরপুরটে এলাকায় বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের। সেদিন এই সীমান্ত দিয়ে ওপারে যাওয়া সবাই গরু পাচারে জড়িত। তবে তাদের মধ্যে কেউই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণকারী নয়। ওপারে গিয়ে এপারে গরু নিয়ে আসাই কাজ তাদের। বিনিময়ে সিন্ডিকেট থেকে দেওয়া হয় নির্দিষ্ট পরিমাণ পারিশ্রমিক।
বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্য বলছে, ওই দিন এই ৫০ জনকে ওপারে পাঠান সীমান্তে গরু পাচার চক্রের সক্রিয় কারবারি বাংলাদেশি মো. সাদেক ও মো. কুতুবুল। তাদের পাঠানো তিনজনকে ভারতের রঘুনাথগঞ্জের মহালদারপাড়া-রামপুর মহল্লা থেকে আটক করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার জঙ্গিপুর থানা পুলিশ। এই তিনজনের মতো গরু পাচার চক্রের ফাঁদে পড়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কাছে ধরা পড়ছেন সীমান্তের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষ। কিন্তু ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে চক্রের মূল হোতারা।
সীমান্ত দিয়ে পাচার-সংক্রান্ত কেস স্টাডি অনুযায়ী, এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। প্রতিনিয়ত সিন্ডিকেটের ফাঁদ ও অধিক টাকা আয়ের লোভে এই মানুষগুলো অবৈধভাবে সীমান্ত পার হচ্ছেন। তারাই বাংলাদেশ ও ভারতের প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে ধরা পড়ছেন। অনেকে শিকার হচ্ছেন নির্মম শারীরিক ও অমানুষিক নির্যাতনের। আবার প্রাণও হারাচ্ছেন অনেকে। এগুলোর সঠিক পরিসংখ্যাণও পাওয়া যায় না।
কারা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে সীমান্ত চক্র
গরু পাচার চক্র নিয়ে দীর্ঘ অনুসন্ধান চালিয়েছে এশিয়া পোস্ট। কথা হয়েছে সীমান্তে নিয়ন্ত্রণ করা চক্রের প্রভাবশালীদের সঙ্গে। তবে তাদের কেউই নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৫৩ বিজিবি) আওতাধীন সীমান্তের প্রায় ৩৭ কিলোমিটার এলাকায় নেই কাঁটাতার। কিছু এলাকায় আছে দুর্গম নদীপথ। কাঁটাতারবিহীন ও নদীপথ দিয়েই গরু পাচার করা হয়।
রাত গভীর হলে সিন্ডিকেট পাচারে নামায় বাহকদের। কারণ গভীর রাত তাদের জন্য সুবিধাজনক। তারা নদীপথে গরু নিয়ে আসে কলাগাছের ভেলা বা নৌকায় করে। গরুগুলো প্রথমে সীমান্ত-সংলগ্ন আমবাগান বা ফসলি জমিতে লুকিয়ে রাখা হয়। আশপাশে ঘোরাঘুরিতে থাকে সিন্ডিকেটের লাইনম্যান। যখন ধরা পড়ার আশঙ্কা থাকে না, লাইনম্যানরা এমন সংকেত দিলেই রাতের অন্ধকারে ট্রাকযোগে গরু পাঠিয়ে দেওয়া হয় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৫৩ বিজিবি) আওতাধীন জহুরপুর ও জহুরপুরটেক বিওপি এলাকা নিয়ন্ত্রণের নেপথ্যে আছেন আটজন। জহুরপুর বিওপি এলাকার সাদেক, আবু, ইকবাল ও মামুন এবং জহুরপুরটেক সীমান্তের ডলার, মুকুল, কুতুবুল ও তৌহিদ সিন্ডিকেটের হোতা হিসেবে পরিচিত। এই আটজন বিভিন্ন দপ্তর ম্যানেজ করেন। এ জন্য এপারে আসা একটি গরুর জন্য ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা নেন তারা।
বাংলাদেশ সীমান্তে নজরারি কেমন
গরু পাচারের সঙ্গে যে পরিমাণ সিন্ডিকেট সক্রিয়, সে তুলনায় ধরা পড়ার সংখ্যা অনেক কম। তবে প্রতি মাসেই জব্দ হচ্ছে ভারতীয় গরু। চলতি বছরের ২ মার্চ ১০টি গরু জব্দ করেছে বিজিবি। এর মধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার সুন্দরপুর ইউনিয়নের কালিনগর গ্রাম থেকে ৮টি এবং চরবাগডাঙ্গা ইউনিয়নের বাখেরআলী বিওপির আওতাধীন চাচ্চুরচর গ্রাম থেকে ২টি করা হয়। ১০টি গরুর বাজারমূল্য অন্তত ২২ লাখ টাকা। তবে পাচারের সঙ্গে জড়িত কেউই ধরা পড়েনি।
জব্দ করা গরুগুলো চাঁপাইনবাবগঞ্জ শুল্ক কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এর আগে গত ফেব্রুয়ারিতে সীমান্ত এলাকা থেকে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা মূল্যের ৩৩টি গরু ও ২টি মহিষ জব্দ করেছে বিজিবি। এ ছাড়া গত বছরের শুরু থেকে চলতি বছরের ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত ৭৯টি গরু ও ২৫টি মহিষ জব্দ করা হয়। এ সময়ের মধ্যে চারজন বাংলাদেশি ও দুই ভারতীয় কারবারিকে আটক করে বিজিবি।
প্রান্তিক খামারিদের উদ্বেগ, আছে গরুর স্বাস্থ্যঝুঁকি
ভারত থেকে পাচার করে আনা গরুগুলো কোয়ারেন্টাইনে রাখা হয় না। ফলে দেশি জাতের গরুর মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। অনেক সময় ভারতীয় গরু থেকে দেশি গবাদিপশুর মধ্যে খুরারোগসহ লাম্পিস্কিন ডিজিজের মতো ভাইরাস ছড়িয়ে পড়তে দেখা যায়।
এ বিষয়ে খামারি মতিউর রহমান জানান, ভারত থেকে যেসব গরু আসে, এগুলো সস্তা দামে বাজারে বিক্রি হয়। ফলে দেশের খামারিরা গরু পালন করেও ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
আরেক খামারি রহমত আলী জানান, অনেক খামারি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেনে। অনেকে ব্যবসা গুটিয়ে নেওয়ার কথা ভাবছেন। ভারত থেকে অবৈধভাবে গবাদিপশু আসায় দেশের প্রাণিসম্পদ খাত মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে।
যা বলছে সীমান্তরক্ষী বাহিনী
অবৈধভাবে ভারত থেকে আনা গরু পাচার বন্ধে দুর্গম চরাঞ্চল ও নদীপথকে প্রতিকূল পরিবেশ হিসেবে দেখছে বিজিবি। তাদের দাবি, প্রতিকূল পরিবেশের সুযোগ নেয় চোরাকারবারিরা। তবে বিজিবির কঠোর নজরদারি অব্যাহত থাকবে।
জানতে চাইলে চাঁপাইনবাবগঞ্জ ব্যাটালিয়নের (৫৩ বিজিবি) অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল কাজী মুস্তাফিজুর রহমান এশিয়া পোস্টকে বলেন, সীমান্ত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিজিবি সব সময় সজাগ রয়েছে। সীমান্তে আগের চেয়ে লোকবল বাড়ানো হয়েছে। এমনকি শীতের ঘন কুয়াশার মধ্যেও নাইট ভিশন গগলস ব্যবহার করে টহল চালানো হয়।