মূর্তি চুরির তদন্তে স্বর্ণ ব্যবসায়ী গ্রেপ্তার, রিমান্ডের ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ
-8192fd-720x405.webp)
ফরিদপুর শহরের ঐতিহ্যবাহী পুরাতন কালীবাড়ি মন্দিরে কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি ও স্বর্ণালংকার চুরির মামলার তদন্তে এবার পুলিশের বিরুদ্ধে উৎকোচ গ্রহণের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। গ্রেপ্তার এক স্বর্ণ ব্যবসায়ীকে রিমান্ডে নেওয়া ও অন্যান্য মামলায় জড়ানোর ভয় দেখিয়ে দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হিরামন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার উপপরিদর্শক (এসআই) হিরামন বিশ্বাস থানায় তার অফিসকক্ষে ওই টাকা নেন। পরে বিষয়টি জানাজানি হলে টাকা ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়। তবে কী কারণে টাকা নেওয়া হয়েছিল এবং কোন প্রক্রিয়ায় তা নেওয়া হয়েছিল—এ বিষয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে এসআই হিরামন বিশ্বাসের বক্তব্য জানতে তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। পরে হোয়াটসঅ্যাপে লিখিত বার্তা পাঠিয়ে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাওয়া হয়। প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যেভাবে চুরির ঘটনা
গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে ফরিদপুর শহরের পুরাতন কালী বাড়িতে চুরির ঘটনা ঘটে। চুরি যাওয়া সামগ্রীর মধ্যে ছিল কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি, মূর্তিতে থাকা আনুমানিক ৭ থেকে ৮ ভরি স্বর্ণালংকার, পিতলের ছোট বিষ্ণু, রাধাকৃষ্ণ ও মনসামূর্তি এবং শিবলিঙ্গের সঙ্গে প্যাঁচানো আনুমানিক ৮ থেকে ১০ ভরি রুপার সাপ। এ ঘটনায় মন্দিরের সেবায়েত ও কমিটির সভাপতি কুশল চক্রবর্তী ফরিদপুর কোতোয়ালি থানায় সাধারণ ডায়েরি করেন।
পরে তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ চুরি যাওয়া মূর্তি ও অলংকার উদ্ধারের কথা জানায়। গত ২৭ সেপ্টেম্বর ফরিদপুর পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে পুলিশ সুপার শাহরিয়ার মোহাম্মদ মিয়াজী জানান, মামলার তদন্তে আলফাডাঙ্গা উপজেলার বুরাইচ ইউনিয়নের বুরাইচ গ্রাম থেকে আসাদুজ্জামান সাদ্দাম, তার মা সাজেদা বেগম এবং বোয়ালমারী উপজেলার ময়না ইউনিয়নের কান্দাকূল গ্রামের আমিন মোল্লাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কষ্টিপাথরের কালীমূর্তি, পাঁচ ভরি স্বর্ণালংকার, ৩০ ভরি রুপার অলংকার ও ছয়টি পিতলের প্রতিমা উদ্ধার করা হয়। তদন্তের একপর্যায়ে পুলিশ জানতে পারে, চুরি যাওয়া স্বর্ণালংকারের একটি অংশ বোয়ালমারী স্বর্ণবাজারের জুয়েলারি ব্যবসায়ী আতিয়ার রহমানের কাছে বিক্রি করা হয়েছিল।
পুলিশের দাবি, আতিয়ার রহমানের কাছ থেকে গলানো অবস্থায় কালীমূর্তির কানের দুল ও টিকলিসসহ আট আনা স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। পরে তাকে আটক করা হয়। তবে চুরি যাওয়া স্বর্ণ কেনার অভিযোগ অস্বীকার করেছে আতিয়ার রহমানের পরিবার।
তার স্ত্রী নাসিমা পারভীনের দাবি, অন্য এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে আতিয়ার ৮০ হাজার টাকা দিয়ে আট আনা স্বর্ণ কিনেছিলেন। পরে স্বর্ণটি গলানোর জন্য দেওয়া হয়। ওই স্বর্ণ চুরি যাওয়া অলংকারের অংশ—এমন কোনো তথ্য তার স্বামীর জানা ছিল না বলেও দাবি করেন তিনি। পুলিশ দোকানে যাওয়ার পর স্বর্ণটি তাৎক্ষণিকভাবে ফেরত দেওয়া হয় বলেও জানান নাসিমা।
তবে উদ্ধার হওয়া স্বর্ণ চুরি যাওয়া অলংকারের অংশ কি না, সেটি কোথা থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল, কেনাবেচার কোনো রেকর্ড ছিল কি না এবং আতিয়ার রহমান স্বর্ণটি চুরি করা হয়েছে বলে জানতেন কি না—এসব বিষয়ে তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি বর্তমানে কারাগারে রয়েছেন।
রিমান্ডের ভয় দেখিয়ে টাকা নেওয়ার অভিযোগ
নাসিমা পারভীনের অভিযোগ, স্বামী গ্রেপ্তার হওয়ার খবর পেয়ে তিনি ফরিদপুর সদর কোতোয়ালি থানায় যান। সেখানে এসআই হিরামন বিশ্বাস তার স্বামীকে রিমান্ডে নেওয়া এবং বিভিন্ন চুরির মামলায় জড়ানোর ভয় দেখান।
নাসিমার ভাষ্য, স্বামীকে রিমান্ডে নেওয়া ও নতুন মামলায় জড়ানো থেকে রক্ষা করতে ধারদেনা করে দেড় লাখ টাকা দেন তিনি। তার দাবি, কোতোয়ালি থানায় এসআই হিরামন বিশ্বাসের অফিসকক্ষে ওই টাকা গুনে দেওয়া হয়। সে সময় মিজান নামে পুলিশের একজন কর্মকর্তা সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং বিষয়টি জানতেন বলেও দাবি করেন নাসিমা। বর্তমানে তারা আর্থিক সংকটে রয়েছেন। তাই নেওয়া ওই টাকা ফেরত চান।
এদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক মিনিট ৪১ সেকেন্ডের একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে নাসিমা পারভীনকে এসআই হিরামন বিশ্বাসের কাছে টাকা নেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন করতে শোনা যায়। ভিডিওতে নাসিমাকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি যেহেতু টাকা নিচ্ছেন, সেহেতু কাজ কেন করলেন না? তাহলে টাকা নিলেন কী জন্য?’
এ সময় পাশ থেকে এক ব্যক্তিকে বলতে শোনা যায়, ‘কাজ করতে পারবেন না তাহলে টাকা নিলেন কিসের জন্য?’ জবাবে এসআই হিরামন বিশ্বাসকে বলতে শোনা যায়, ‘According to law, সেটাই তার সঙ্গে করা হয়েছে।’ এরপর পাশ থেকে ওই ব্যক্তি টাকা নেওয়ার বিষয়ে আবার প্রশ্ন করেন। একপর্যায়ে হিরামন বিশ্বাসকে সেখান থেকে মোটরসাইকেলে উঠে চলে যেতে দেখা যায়।
অভিযোগের বিষয়ে ফরিদপুর কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুল হাসান জানান, পুরাতন কালী বাড়ি থেকে চুরি হওয়া মূর্তি ও স্বর্ণালংকার উদ্ধারের বিষয়টি তিনি জানেন। তবে আতিয়ার রহমানের কাছ থেকে কোনো টাকা-পয়সা লেনদেন হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলতে পারবেন না।
তিনি আরও বলেন, যে ব্যক্তি চুরি করে, সে চুরির দায় থেকে বাঁচার জন্য যে কারও বিরুদ্ধে অপবাদ দিতে পারে—এটাই স্বাভাবিক। এসআই হিরামন বিশ্বাসের বিরুদ্ধে দেড় লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছুই জানি না।
