পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে গেছে ১০০ হেক্টর জমি, দিশেহারা দুই শতাধিক কৃষক

আগাম সবজি বাজারে তুলে ভালো দাম পাওয়ার আশায় এনজিও থেকে দুই লাখ টাকা ঋণ নিয়েছিলেন চট্টগ্রামের ফটিকছড়ির কাঞ্চননগর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের পাল্লানপাড়া চরের কৃষক মো. রফিক। ধুরুং খালের দুপাড়ের চরে ১২০ শতাংশ জমিতে চাষ করেছিলেন শীতকালীন আগাম সবজি। স্বপ্ন ছিল ফসল বিক্রি করে ঋণ পরিশোধ করবেন, ফিরবে পরিবারের স্বচ্ছলতা। কিন্তু হঠাৎ পাহাড়ি ঢলের তীব্র স্রোতে ভেঙে ও তলিয়ে গেছে পুরো আবাদ।
রফিকের মতো একই পরিণতি হয়েছে ওই চরের কৃষক মখবুল আহমেদেরও। ধুরুং খালের চরে প্রায় ১০০ শতাংশ জমিতে শীতকালীন আগাম সবজি চাষ করেছিলেন তিনি। পাহাড়ি ঢলের পানিতে তার আবাদি জমিও ভেঙে ও তলিয়ে গেছে। এতে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন তিনি।
শুধু রফিক বা মখবুল নন, গত মঙ্গলবার ও বুধবারের আকস্মিক পাহাড়ি ঢলে ধুরুং খালের দুপাড়ের চরে আগাম সবজি চাষ করা দুই শতাধিক কৃষকের একই অবস্থা। শীতকালীন সবজি চাষ করে মৌসুমের শুরুতেই ভালো দামের আশায় ছিল তাদের। কেউ নিজের জমানো টাকা, আবার কেউ এনজিও কিংবা বিভিন্ন উৎস থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদে বিনিয়োগ করেছিলেন।
স্থানীয় কৃষক ও উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দুদিনের পাহাড়ি ঢলে ফটিকছড়ির কাঞ্চননগরের মানিকপুর থেকে পাইন্দংয়ের বেড়াজালী পর্যন্ত ধুরুং খালের দুই পাড়ের চরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে আগাম রবি ও শীতকালীন সবজি চাষ করা হয়েছিল। ঢলের পানিতে এসব জমির বড় অংশের ফসল নষ্ট হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন দুই শতাধিক কৃষক।
উপজেলার কাঞ্চননগর ইউনিয়নের মানিকপুর, পাল্লানপাড়া চর, ফরেস্ট অফিস ও চরপাড়া এবং পাইন্দং ইউনিয়নের বেড়াজালী মুজরির চর, শ্বেতকুয়াসহ কয়েকটি চরাঞ্চল ঘুরে দেখা যায় পাহাড়ি ঢলের ক্ষতচিহ্ন। কোথাও পুরো সবজিখেত পানির নিচে, কোথাও আবার ঢলের স্রোতে ভেঙে গেছে আবাদি জমি। অনেক জমিতে রোপণ করা চারাগাছের ওপর পুরু করে জমেছে পলি। কোনো কোনো খেতে কয়েক ফুট পর্যন্ত পলি জমে চাপা পড়েছে পুরো আবাদ। বাজারজাত করার আগেই নষ্ট হয়ে গেছে কৃষকদের মাসের পর মাসের শ্রম ও বিনিয়োগে গড়ে তোলা আগাম শীতকালীন সবজি। কোথাও শুধু জমির আইল দেখা যাচ্ছে, আবার কোথাও ঢলের স্রোতে মাটি সরে গিয়ে বদলে গেছে জমির আকৃতি। ফসল হারিয়ে এসব খেতে এখন কেবল ক্ষতির চিহ্ন।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক। এ সময় তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সঙ্গে কথা বলেন এবং বিভিন্ন জমির ক্ষয়ক্ষতি সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকাও তৈরি করা হচ্ছে। তিনি ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রণোদনার আওতায় আনার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি পাহাড়ি ঢলে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের প্রয়োজনীয় কৃষি পরামর্শ দেন।
পাল্লানপাড়া ও বুলবুলিপাড়ার ক্ষতিগ্রস্ত কৃষক আশিষ দাস, আবু তাহের ও মো. হাসেম বলেন, আগাম সবজি চাষে তারা বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করেছিলেন। এমনকি ভালো লাভের আশায় বাড়তি খাজনা দিয়ে জমিগুলো লিজ নিয়েছিলেন। ফসল ঘরে তোলার আগেই সব নষ্ট হয়ে যাওয়ায় এখন ঋণের কিস্তি ও জমির মালিককে খাজনা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন তারা। দ্রুত সরকারি সহায়তা ও প্রণোদনা পেলে ক্ষতি কাটিয়ে আবারও চাষাবাদে ফিরতে পারবেন বলে আশা তাদের।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আবু সালেক বলেন, ফটিকছড়ির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৃষি অঞ্চল কাঞ্চননগর। এ অঞ্চলের কৃষকদের কষ্টে উৎপাদিত ফসল দেশের বিভিন্ন স্থানে সুপরিচিত। গত দুই দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কাঞ্চননগরের মানিকপুর থেকে পাইন্দংয়ের বেড়াজালী পর্যন্ত প্রায় ১০০ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কোথাও কোথাও আগাম সবজি ও বিক্রয় উপযোগী ফসল পুরোপুরি বালির নিচে চাপা পড়ে গেছে। অনেক জমিতে ২ থেকে ৩ ফুট পর্যন্ত বালি জমে ফসল নষ্ট হয়েছে। এতে কৃষকেরা ব্যাপক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। প্রাথমিক হিসাবে এ অঞ্চলে কয়েক কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। কৃষি অফিস ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছে এবং তাদের পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা ও প্রণোদনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাঈদ মুহাম্মদ ইব্রাহীম বলেন, ফটিকছড়ির কৃষকেরা একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুখোমুখি হয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। গত দুই দিনের পাহাড়ি ঢলে কাঞ্চননগর এলাকার কয়েক শ কৃষকের আগাম সবজি চাষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পাশে দাঁড়াতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বিকভাবে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।