‘নকড আউট টু নাম্বার ওয়ান’/চিত্রাঙ্কনে জারিনের দেশসেরা হয়ে ওঠা সহজ ছিল না

দুই নারী ঢেঁকিতে ছাঁটা করে চাল গুঁড়া করছেন। ঢেঁকির পাড়ের পাশে দুজন তা চালনি দিয়ে চেলে মিহি আটা আলাদা করে নিচ্ছেন। কিছুটা দূরে গাভির দুধ দোহন করছেন একজন পুরুষ। আরও দূরে হাল চাষের দুটি গরু সামনে এগিয়ে চলছে। পাশ দিয়ে কেউ কলস ভরে পানি নিয়ে যাচ্ছেন, কেউ দৈনন্দিন কাজে ব্যস্ত। চারপাশে সবুজ-শ্যামল গাছপালা। আছে ছোট-ছোট টিনশেড ও খড়ের চালের ঘর। পাশ দিয়ে বইয়ে গেছে বিশাল জলরাশি।
এটি এক সময়ের বাংলার গ্রাম বাংলার চিত্র। তেমন জনপদ এখন খুব একটা চোখে পড়ে না। রংতুলির আঁচড়ে সেটাই ফুটিয়ে তুলেছে জারিন সুবহ্। তার এমন চিত্রকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে সে হয়েছে দেশের সেরা। জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার চিত্রাঙ্কন বিভাগে দেশ সেরা হওয়ার গৌরব অর্জন করেছে এই খুদে ‘আর্টিস্ট’। জাতীয় পর্যায়ে প্রথম স্থান অর্জন করে পুরস্কৃত হয়েছে জারিন।
তবে দেশসেরা হওয়ার পথটি মোটেও সহজ ছিল না। স্কুল-উপজেলা পর্যায় পেরিয়ে জেলাতে গিয়ে দুবার ‘নকড আউট’ (বাদ পড়া) হয় সে। ২০২৪ ও ২০২৫ সালের প্রতিযোগিতায় জেলা পর্যায় থেকে ছিটকে পড়েও সে ছিল অদম্য। ব্যর্থতাকে শিক্ষা হিসেবে নিয়ে আরও বেশি অনুশীলন, মনোযোগ ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমে নিজেকে প্রস্তুত করতে থাকে।
জারিন সুবহ্ বলে, ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকতে ভালোবাসি। প্রথম দিকে কয়েকবার ব্যর্থ হয়েছিলাম। মা-বাবা ও শিক্ষকরা আমাকে সব সময় উৎসাহ দিয়েছেন।
সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা পদক প্রতিযোগিতার চিত্রাঙ্কন বিভাগে জাতীয় পর্যায়ে অংশ নেয় জারিনসহ তিনজন প্রতিযোগী। সেখানে সবার সেরা হয়ে প্রথম স্থান অর্জন করে সাতক্ষীরার এই শিক্ষার্থী।
জারিন সুবহ্ বলে, সবার সহযোগিতা ও নিজের চেষ্টায় দেশের সেরা হতে পেরেছি। ভবিষ্যতে দেশের জন্য ভালো কিছু করতে চাই।

জারিন সুবহ্ সাতক্ষীরা সদর উপজেলার সিলভার জুবিলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী। বাবা নাজমুল আলমের চাকরির সুবাদে কয়েক বছর আগে পরিবারের সঙ্গে সাতক্ষীরায় আসে সে। ছোটবেলা থেকেই ছবি আঁকার প্রতি ছিল তার প্রবল আগ্রহ। সেই আগ্রহই ধীরে ধীরে পরিণত হয় স্বপ্নে।
জারিনের বাবা নাজমুল আলম বলেন, আমাদের বাড়ি চুয়াডাঙ্গার আলমডাঙ্গা থানার খাসকরো গ্রামে। চাকরির সুবাদে সাতক্ষীরায় থাকা। দুই মেয়ের মধ্যে জারিন বড়। মেয়ের এই অর্জনে আমরা অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। তার নিজের প্রচেষ্টাই সবচেয়ে বড় বিষয়। আমরা শুধু তাকে সহযোগিতা করেছি। সে চিত্রাঙ্কনের পাশাপাশি পড়াশোনাতেও ভালো। আমরা চাই, সে একজন ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক।
সিলভার জুবিলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক চায়না ব্যানার্জী বলেন, আমাদের বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জাতীয় প্রতিযোগিতায় নিয়মিত সাফল্য অর্জন করে। জারিন অত্যন্ত মেধাবী ও পরিশ্রমী। শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফলেই এ অর্জন সম্ভব হয়েছে।
সদর উপজেলা প্রাইমারি এডুকেশন ট্রেনিং সেন্টারের ইন্সট্রাক্টর কৃপা চায় মণ্ডল বলেন, সিলভার জুবিলী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা পাঠদানের পাশাপাশি সহশিক্ষা কার্যক্রমেও গুরুত্ব দেন। ফলে প্রতিবছরই এ বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় সাফল্য অর্জন করছে। গান, নাচ, কবিতা আবৃত্তি ও চিত্রাঙ্কনে তারা নিয়মিত পুরস্কার পাচ্ছে। এবার জাতীয় পর্যায়ে চিত্রাঙ্কনে জারিন সুবহ্ প্রথম স্থান অর্জন করেছে। এ সাফল্য শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ফল।
.png)


