দুর্গম পাহাড়ে সৌরবিদ্যুতের আলো, মিলছে বিশুদ্ধ পানি

রাঙামাটির বিলাইছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী দুর্গম এলাকা ফারুয়া ইউনিয়ন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা এ জনপদের বাসিন্দাদের একমাত্র ভরসা ছিল পাহাড়ি ঝিরি-ঝরনা কিংবা বৃষ্টির পানি। বর্ষায় ঘরের চালে ড্রাম বসিয়ে পানি ধরে রাখা সম্ভব হলেও শুষ্ক মৌসুমে দেখা দিত তীব্র হাহাকার। বছরের প্রায় ৯ মাসই সুপেয় ও নিত্যব্যবহার্য পানির কষ্টে ভুগতে হতো ফারুয়ার তক্তানালা ও গোয়ানছড়ি গ্রামের বাসিন্দাদের।
তবে সৌরবিদ্যুতের বদৌলতে সেই কষ্টের দিন এখন অতীত। পাহাড়ের বুকে সৌরশক্তি ব্যবহার করে এখন ঘরের আঙিনাতেই মিলছে ভূগর্ভস্থ বিশুদ্ধ পানি।
গ্রামের পাশেই বসানো হয়েছে বড় আকারের সোলার প্যানেল। সূর্যের আলো থেকে উৎপন্ন বিদ্যুৎ দিয়ে চালানো হচ্ছে শত শত ফুট গভীরের সাবমার্সিবল পাম্প। পাম্প থেকে উত্তোলিত পানি জমা হচ্ছে বিশাল ট্যাংকে, যা পরবর্তীতে পাইপলাইনের মাধ্যমে পৌঁছে যাচ্ছে বাসিন্দাদের বাড়ির আঙিনায়।
এখন কেবল ট্যাপ ঘোরালেই মিলছে পানি। পাহাড়ি এ দুটি গ্রামের বাসিন্দারা স্বাচ্ছন্দ্যে মেটাতে পারছেন খাবার পানি ও দৈনন্দিন কাজের চাহিদা। বিদ্যুৎ আর বিশুদ্ধ পানির এই সুবিধা দুর্গম পাহাড়ের জনজীবনে এনে দিয়েছে এক নতুন স্বস্তি।
ফারুয়া ইউনিয়নের তক্তানালা এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা সাধু সিন্দু চাকমা বলেন, বহু বছর ধরে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ আর দুর্গম ঝিরি-ঝরনার পানি ব্যবহার করে আসছেন গ্রামের বাসিন্দারা। বর্ষায় বৃষ্টির পানি জমিয়ে ব্যবহার করা গেলেও শুষ্ক মৌসুমে সংকট আরও তীব্র হয়। নারীদের পানি সংগ্রহ করতেই দিনের অনেকটা সময় ব্যয় করতে হতো।
তক্তানালা এলাকার ব্যবসায়ী রিপন চাকমা বলেন, দূষিত পানির কারণে এ গ্রামের মানুষ প্রায়ই ডায়রিয়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হতো। নিরুপায় হয়ে পানি ফুটিয়ে পান করলেও রোগব্যাধি লেগেই থাকত। এখন সৌরবিদ্যুতের সাহায্যে পানির এই ব্যবস্থা হওয়ায় গ্রামের প্রতিটি পরিবার খুব উপকৃত হয়েছে। আশা করছি মানুষ এখন রোগব্যাধি থেকে মুক্তি পাবে।
ফারুয়া ইউনিয়নের অপর গ্রাম গোয়ানছড়ির বাসিন্দা নমিতা তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, শুষ্ক মৌসুমে এক কলসি পানির জন্য কয়েক পাহাড়ি পথ পাড়ি দিতে হতো। পানি সংগ্রহ করতেই দিন পার হয়ে যেত। এখন ঘরের কাছেই পরিষ্কার পানি পাওয়া যাচ্ছে, এতে আমরা সবাই খুব খুশি। এখন আর কষ্ট করে ঝিরি-ঝরনা থেকে পানি আনতে হবে না।
ফারুয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বিদ্যা লাল তঞ্চঙ্গ্যা বলেন, আমার ইউনিয়নে বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। বিদ্যুৎ না থাকায় মোটরের সাহায্যে পানির ব্যবস্থাও করা সম্ভব হচ্ছিল না। 'আশিকা' সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে সুপেয় পানির যে ব্যবস্থা করেছে, তাতে দুই গ্রামের প্রায় এক হাজার মানুষ সুবিধার আওতায় এসেছে।
আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাহী পরিচালক বিপ্লব চাকমা বলেন, স্টার্ট ফান্ড বাংলাদেশের সহযোগিতায় আশিকা ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন তক্তানালা ও গোয়ানছড়ি—এ দুই গ্রামে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে। বন্যায় ঝিরি-ঝরনা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় সুপেয় পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছিল। আমরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী পানির কষ্ট লাঘব করার চেষ্টা করেছি।
তিনি আরও বলেন, যে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করা হয়েছে, তা দিয়ে দিনের বেলায় পানি দুটি বিশাল ট্যাংকে জমা রাখা হবে। সারাদিন প্রয়োজন অনুযায়ী গ্রামবাসী সেই পানি ব্যবহার করতে পারবেন। পাশাপাশি দিনের বেলায় সৌরশক্তি থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ কমিউনিটি পর্যায়ে ব্যবহারেরও সুযোগ থাকবে।



