logo
Advertisement

জামালপুর/প্রিপেইড মিটারে বিদ্যুৎ, তবু এনালগ হিসাবে বকেয়া

প্রিপেইড মিটারে বিদ্যুৎ, তবু এনালগ হিসাবে বকেয়া
সরিষাবাড়ী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। ছবি : এশিয়া পোস্ট

আলো জ্বালানোর আগেই পকেট থেকে টাকা কেটে নেয় আধুনিক প্রযুক্তির প্রিপেইড মিটার। অগ্রিম টাকা রিচার্জ না করলে এ মিটারে বিদ্যুৎ ব্যবহারের সুযোগ নেই। কিন্তু জামালপুরের সরিষাবাড়ীতে প্রিপেইড বা কার্ড মিটার ব্যবহার করা গ্রাহকদের নামেও পুরোনো এনালগ সংযোগের বিপরীতে বকেয়া দেখানোর অভিযোগ উঠেছে। এমনকি মৃত ব্যক্তি ও অন্য গ্রাহকের নামেও বকেয়া দেখানোর অভিযোগ পাওয়া গেছে।

উপজেলার বিভিন্ন এলাকার অন্তত ১০টি বিদ্যুৎ বিলের কপি বিশ্লেষণ করা হয়েছে। সরেজমিন অনুসন্ধানেও এসব বিল নিয়ে নানা অসংগতির তথ্য পাওয়া গেছে। ভুক্তভোগীদের বেশির ভাগ বর্তমানে প্রিপেইড বা ডিজিটাল মিটার ব্যবহার করছেন। এরপরও তাদের নামে পুরোনো এনালগ সংযোগের বিপরীতে বকেয়া দেখাচ্ছে সরিষাবাড়ী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)।

সরেজমিনে সরিষাবাড়ী উপজেলার আদ্রা এলাকায় অবস্থিত গফুর জয়নাল আবেদীন আলিম মাদ্রাসায় দেখা গেছে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনায় এমনই এক চিত্র। মাদ্রাসার প্রশাসনিক নথিপত্র অনুযায়ী, বিদ্যুৎ সংযোগ নেওয়ার পর থেকেই তারা নিয়মিত প্রিপেইড বা কার্ড মিটার ব্যবহার করে আসছে। অর্থাৎ অগ্রিম টাকা রিচার্জ করা ছাড়া প্রতিষ্ঠানটিতে এক ইউনিট বিদ্যুৎও ব্যবহারের সুযোগ নেই। অথচ চলতি বছরের জুন মাস পর্যন্ত ওই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানটির নামে ৪৪ হাজার ৯২৮ টাকা বকেয়া বিল দেখিয়েছে সরিষাবাড়ী পিডিবি। এই বকেয়া বিলের কথা মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষকে কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়নি পিডিবি।

মাদ্রাসার অধ্যক্ষ ইদ্রিস আলী বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের কোনো বকেয়া বিল নেই। আমরা কার্ড মিটারে বিল চালাই। কারেন্ট চালাই আরকি। যদি কারেন্ট বিল বকেয়া থাকত, তাহলে নিশ্চয়ই আমাদের অবগত করা হতো বা কারেন্ট বিল আমাদের দেওয়া হতো। কিন্তু আমার জানা মতে, ১৫ বছর ধরে কোনো কারেন্ট বিল আমাদের কাছে আসে না। আমরা শুধু কার্ড মিটারের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ব্যবহার করি।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, শুধু এই ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানই নয়, সরিষাবাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় প্রিপেইড মিটার চালুর পরও পুরোনো এনালগ সংযোগের দোহাই দিয়ে একের পর এক ভুয়া ও বিভ্রান্তিকর বকেয়া বিল তৈরি করা হচ্ছে—এমন অভিযোগ রয়েছে।

উপজেলার সাদিনাবাড়ী এলাকায় আব্দুস সামাদ নামে এক ব্যক্তির নামে ২ লাখ ১২ হাজার টাকার সেচ মিটারের বকেয়া বিল দেখানো হয়েছে। অথচ যে সেচ মিটারের বিল তার নামে দেখানো হয়েছে, সেটির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই।

আব্দুস সামাদ বলেন, আমার নামে শুধু বাড়ির একটি সাধারণ মিটার আছে। যে সেচ মিটারের বিল দেখানো হয়েছে, সেটার সঙ্গে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। পিডিবির লোকজন কয়েকবার খোঁজও করেছে। কিন্তু প্রকৃত গ্রাহককে খুঁজে পায়নি। তারপরও বিল আমার নামেই দেখানো হচ্ছে।

সরিষাবাড়ী উপজেলার চর বড়বাড়িয়া গ্রামে গিয়ে মেলে আরেকটি অবিশ্বাস্য নথির তথ্য। সেখানকার বাসিন্দা আলা উদ্দিন মারা গেছেন প্রায় ২০ বছর আগে। মৃত্যুর আগেই তার ব্যবহৃত সেচ মেশিনটি বিক্রি করে দেওয়া হয় এবং তৎকালীন সব হিসাব মিটিয়ে নতুন ব্যবস্থায় সংযোগ নেওয়া হয়েছিল। এরপরও আলা উদ্দিনের নামে ১ লাখ ১২ হাজার টাকা বকেয়া দেখানো হচ্ছে। কীভাবে এত টাকা বিল হলো, তা জানে না তার পরিবার।

মৃত আলা উদ্দিনের ছোট ভাই আলম বলেন, মনে করেন, মারা যাওয়ার পরও পাঁচ বছর চালান গেছে। না চালানোর পরে মারা গেছে। তাও তো ধরেন, ১৮-১৯ বছর মারা গেছে। এখন ডিসেম্বর দেখাইতেছে। ডিসেম্বরে। ওরা তো যা ইচ্ছা তাই করতে পারে। দেনদরবারে মনে করেন, তারা তো সমাধান করে বলল না—তাহলে তো এটা তার হইতেছে না। অফদা (অফিস) থেকে তারাই এই কাগজ-সই করে নিয়ে তার দিকে গেছে। তারপরেও এখন বিল আসতেছে? এই যে এবার আইছে। পাঁচ-সাত বছর দেওয়া হয় নাই।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরিষাবাড়ীতে দীর্ঘদিন ধরেই ‘ভূতুড়ে বিল’, দ্বৈত বিল, মৃত ব্যক্তির নামে বিল এবং ভুল গ্রাহকের নামে বকেয়া দেখানোর ঘটনা ঘটছে। এতে সাধারণ মানুষ আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

সরিষাবাড়ীর বাসিন্দা অ্যাডভোকেট ইউসুফ আলী বলেন, এই সমস্যা নতুন নয়। বহু মানুষ বছরের পর বছর ভুয়া ও প্রশ্নবিদ্ধ বিলের শিকার হচ্ছেন। অনেকে ঝামেলা এড়াতে বাধ্য হয়ে টাকা পরিশোধও করেন। ফলে সাধারণ গ্রাহক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।

বিষয়টি নিয়ে বক্তব্য জানতে সরিষাবাড়ী বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী ওয়াদুদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। গোপন ক্যামেরায় ধারণ করা বক্তব্যে তিনি বলেন, এসব বিষয়ে ঢাকা অফিস কথা বলেন।