২০ মিটার নদীতে হচ্ছে ১১৪ মিটার সেতু, নেই সংযোগ সড়ক

পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার শেখমাটিয়া ও বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার আন্দারমানিক এলাকার সীমান্তবর্তী মরা বলেশ্বর নদীর ওপর ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ১১৪ মিটার দীর্ঘ একটি আর্চ সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে। অথচ সেতুর এক প্রান্তে সংযোগ সড়ক নেই। ফলে সেতুটি নির্মাণ হলেও তা কতটা কাজে আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন স্থানীয়দের।
কচুয়া উপজেলা এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, মরা বলেশ্বর নদীর প্রস্থ যেখানে মাত্র ২০ মিটারের মতো, সেখানে নির্মাণ করা হচ্ছে ১১৪ মিটার দীর্ঘ সেতু। তবে নাজিরপুর প্রান্তে সেতুর সঙ্গে সংযোগ দেওয়ার মতো কোনো চলাচল উপযোগী পাকা বা প্রশস্ত সড়ক নেই। নদীর তীর পর্যন্ত কোনো রকমে একটি কাঁচা পথ থাকলেও সেটি দিয়ে সাধারণ মানুষ ও স্বাভাবিক যানবাহন চলাচল করা কঠিন। সেতুর নির্মাণকাজ এগিয়ে চললেও নাজিরপুর প্রান্তে এখন পর্যন্ত কার্যকর সংযোগ সড়কের দৃশ্যমান কোনো অবকাঠামো গড়ে ওঠেনি।
এলজিইডি বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলীর অধীনে সেতুটির নির্মাণকাজ করছে ‘এআরসি’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালাম জানিয়েছেন, সেতুর নির্মাণকাজ প্রায় ৪০ শতাংশ শেষ হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মরা বলেশ্বর নদীর প্রশস্ততা যেখানে মাত্র ২০ মিটার— সেখানে ১১৪ মিটার দীর্ঘ সেতু নির্মাণ করা হচ্ছে কেন? তাদের অভিযোগ, সেতু নির্মাণের আগে প্রয়োজনীয় সম্ভাব্যতা যাচাই ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা বিবেচনা করা হয়নি।
নদীর অপর প্রান্তে বাগেরহাটের কচুয়া অংশে প্রায় ১২ ফুট প্রশস্ত একটি পাকা সড়ক রয়েছে। কিন্তু নাজিরপুর প্রান্তে সেতুর মুখ পর্যন্ত যাওয়ার জন্য কোনো প্রশস্ত বা পাকা সড়ক নেই। বর্ষা মৌসুমে বিদ্যমান সরু পথটিও কাদাপানি ও জলাবদ্ধতার কারণে চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়ে। ফলে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হলেও নাজিরপুরের মানুষ এর সুফল কতটা পাবেন, তা নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
সেতুটির অবস্থান ও প্রশাসনিক সীমানা নিয়েও রয়েছে ভিন্ন বক্তব্য। বাগেরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী জানিয়েছেন, সরকারি ম্যাপ অনুযায়ী নদীর একটি অংশ বাগেরহাট জেলার মধ্যে পড়েছে। সেই অনুযায়ী বাগেরহাট এলজিইডি থেকে সেতুটির দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
অন্যদিকে নাজিরপুর প্রান্তের স্থানীয় বাসিন্দারা দাবি করছেন, নদীর ওই অংশ শেখমাটিয়া এলাকার জেএল ৫৪ ও মৌজা ৬৭-এর মধ্যে পড়েছে। নাজিরপুর উপজেলা প্রকৌশলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সেতুটি নির্মাণের বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
সেতু নির্মাণে পাথরের পরিবর্তে ইটের খোয়া ব্যবহার, সঠিক মানের রড ব্যবহার না করা এবং পাইলের নির্ধারিত দৈর্ঘ্য ঠিক রাখা হয়নি—এমন অভিযোগও করেছেন স্থানীয়রা।
এসব অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে সরেজমিনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘এআরসি’র ব্যবস্থাপনা পরিচালক আবুল কালামের কাছে প্রকল্পের সিডিউল দেখতে চাইলে তিনি দেখাতে অপারগতা প্রকাশ করেন। নির্মাণকাজে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়েও তিনি কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি।
কচুয়া উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী আসিফ এহসান বলেন, আমি এই স্টেশনে নতুন যোগ দিয়েছি। এই কাজের অনুমোদন প্রক্রিয়া সম্পর্কে আমার কোনো ধারণা নেই। তথ্যের প্রয়োজন হলে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলুন।
বাগেরহাট এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ মঞ্জুর রশিদ বলেন, কাজে অনিয়ম এবং সিডিউল গোপনের অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হবে।
সংযোগ সড়ক ছাড়া এমন প্রকল্পের অনুমোদন ও অর্থ ছাড় কীভাবে হলো—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, আমি এখানে নতুন এসেছি। অতীতে যারা ছিলেন, তারা দেখে-শুনে কাজ করেছেন।
২০ মিটার প্রশস্ত নদীতে ১১৪ মিটার দীর্ঘ আর্চ সেতু নির্মাণের যৌক্তিকতা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আপনারা বুঝবেন না। এত বড় প্রস্তাব আমরা দিইনি। একটি ব্রিজের প্রস্তাব দেওয়ার পর নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের প্রকল্প ক্যাটাগরিতে ব্রিজটি এভাবে হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এত লম্বা ব্রিজ ছিল না। অফিসে এলে বিষয়টি বুঝিয়ে দেব।
নাজিরপুর উপজেলা প্রশাসন ও এলজিইডি প্রকল্পটির বিষয়ে অবগত নয় কেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এটা অবশ্যই তারা জানবেন। কারণ তাদের সীমান্ত এলাকায় ব্রিজটি হচ্ছে।



