উত্থান থেকে মৃত্যুদণ্ড, কুষ্টিয়ার একচ্ছত্র ক্ষমতার কেন্দ্রে ছিলেন হানিফ

আওয়ামী লীগের দেড় দশকের শাসনামলে কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে একচ্ছত্র ক্ষমতার প্রভাব বিস্তারকারী হয়ে উঠেছিলেন দলটির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এবং কুষ্টিয়া-৩ (সদর) আসনের টানা তিনবারের সাবেক সংসদ সদস্য মাহবুব উল আলম হানিফ। ক্ষমতার অপব্যবহার, বলয় তৈরি, বিপুল অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের অসংখ্য অভিযোগে দীর্ঘদিন আলোচনার কেন্দ্রে থাকা এই নেতার রাজনৈতিক জীবনের করুণ পতন ঘটেছে। ২০২৪ সালের জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় কুষ্টিয়ায় ছয়জনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করেছেন।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ হানিফকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন।
একই মামলায় কুষ্টিয়া জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সদর উদ্দিন খান, সাধারণ সম্পাদক আজগর আলী এবং শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আতাউর রহমান আতা পেয়েছেন আমৃত্যু কারাদণ্ড। চার আসামি পলাতক থাকায় তাদের অনুপস্থিতিতে বিচার হয়েছে। ট্রাইব্যুনাল তাদের স্থাবর সম্পত্তির অর্ধেক বাজেয়াপ্ত করে নিহতদের পরিবার ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার নির্দেশও দিয়েছেন।
রায় ঘোষণার পর কুষ্টিয়ার রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা ও প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। স্থানীয়দের একাংশ রায়কে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ও বিচার প্রত্যাশার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, ক্ষমতার অপব্যবহার ও রাজনৈতিক দমন-পীড়নের অভিযোগের বিচার হওয়া জরুরি ছিল।
জানা যায়, ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে কুষ্টিয়া-২ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হয়ে পরাজিত হওয়ার পর ২০০৯ সালে কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পান তিনি। ২০১৩ সালে কুষ্টিয়া-৩ আসনে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর সদর এলাকার রাজনীতিতে তার প্রভাব আরও বিস্তৃত হয়। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে একই আসন থেকে সংসদ সদস্য হন হানিফ। তার রাজনৈতিক উত্থানের সঙ্গে আলোচনায় আসে চাচাতো ভাই আতাউর রহমান আতার নাম, যিনি একসময় ভেড়ামারায় থাকলেও পরে কুষ্টিয়া শহরের রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং সদর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হন।
স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, হানিফের নাম ও কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করে আতা কুষ্টিয়ায় একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন। হামলা, মামলা, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে হয়রানি এবং দমন-পীড়নের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
কুষ্টিয়া শহরের পিটিআই রোডে হানিফের বাড়িটি দীর্ঘদিন স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে পরিচিত ছিল। এলাকাটিকে কুষ্টিয়ার মানুষ পিটিআই রোড হিসেবেই চিনতেন। স্থানীয়দের দাবি, হানিফের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পর এলাকাটি ‘হানিফ নগর’ নামে পরিচিতি পেতে শুরু করে। যদিও এলাকাটির আনুষ্ঠানিক নাম পরিবর্তনের সরকারি নথি পাওয়া যায়নি, স্থানীয় পরিচিতি হিসেবে নামটি আলোচনায় এসেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রফিকুল ইসলাম বলেন, আমরা দীর্ঘদিন এই এলাকায় বসবাস করছি। আগে এলাকাটি পিটিআই রোড নামেই পরিচিত ছিল। পরে হানিফের প্রভাব বাড়ার সঙ্গে হানিফ নগর নামটি প্রচলিত হয়। তার রাজনৈতিক ক্ষমতার কারণে সাধারণ মানুষ অনেক সময় এ বিষয়ে কথা বলতে সাহস পেত না।
এদিকে হানিফের রাজনৈতিক অবস্থান শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে তার কথিত চাচাতো ভাই আতাউর রহমান আতারও দ্রুত উত্থান ঘটে। স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের অভিযোগ, হানিফের নাম ভাঙিয়ে আতা সদর উপজেলা ও শহরের রাজনীতিতে একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেন। আওয়ামী লীগের ভেতরে বিরোধী মতের নেতাকর্মী থেকে শুরু করে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদেরও রাজনৈতিকভাবে চাপে রাখা, হামলা-মামলা এবং হয়রানির অভিযোগ রয়েছে তাদের বিরুদ্ধে।
মাহবুব উল আলম হানিফের চাচাতো ভাই হিসেবে পরিচিত আতাউর রহমান আতা কুষ্টিয়া সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। হানিফের রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের সময় আতারও কুষ্টিয়া শহর ও সদর উপজেলা রাজনীতিতে অবস্থান শক্ত হয়। তার বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে সম্পদ অর্জনের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে আলোচনায় ছিল।
২০২২ সালে দুদকের অনুসন্ধানে আতার বিরুদ্ধে নিয়োগ-বাণিজ্য, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, বালুমহাল ও হাটবাজার ইজারার মাধ্যমে এক হাজার কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ সামনে আসে।
পরবর্তী ২০২৪ সালের ১১ মার্চ আতা ও তার স্ত্রী সাম্মিয়ারা পারভীনের বিরুদ্ধে ৬৩ লাখ ৬৬ হাজার ৫৭৪ টাকার অসংগতিপূর্ণ সম্পদ অর্জনের অভিযোগে দুদক মামলা করে। ওই মামলায় স্ত্রীর সম্পদ অর্জনে আতার সহায়তার অভিযোগও আনা হয়। এরপর ২০২৬ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি আতার বিরুদ্ধে নতুন করে মামলা করে দুদক। মামলার এজাহারে বলা হয়, তিনি ১০ কোটি ৯ লাখ ৬৮ হাজার ৯৪১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করে ভোগদখলে রেখেছেন। দুদকের সম্পদ বিবরণী দাখিলের নোটিশের পর নির্ধারিত সময়ে সম্পদের হিসাব জমা না দেওয়ার বিষয়টিও মামলায় উল্লেখ করা হয়। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
মাহবুব উল আলম হানিফের রাজনৈতিক প্রভাবের পাশাপাশি তার সম্পদ অর্জন ও আর্থিক লেনদেন নিয়েও তদন্ত করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ২০২৫ সালের ১৪ জুলাই তার বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও অর্থপাচারের অভিযোগে দুটি মামলা করে দুদক। সংস্থাটির অভিযোগ, হানিফ ২৭ কোটি ৩৯ লাখ ২৯ হাজার ৩১ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন করেছেন। তার ১৮টি ব্যাংক হিসাবে ৮৬ কোটি ৬৬ লাখ ৬৯ হাজার ৪৯৭ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্যও মামলায় উল্লেখ করা হয়।
একই সময়ে তার স্ত্রীকে ঘিরেও পৃথক অভিযোগ আনে দুদক। স্ত্রীর নামে ৪ কোটি ৬৯ লাখ ৬৮ হাজার ৪৯০ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ এবং ১৬টি ব্যাংক হিসাবে ৩৩ কোটি ১৩ লাখ ৫০ হাজার ৬০৯ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের অভিযোগ করা হয়। ২০২৫ সালের মে মাসে হানিফ ও তার স্ত্রীর ৪০টি ব্যাংক হিসাবের প্রায় ৪৪৮ কোটি টাকা জব্দের আদেশ হয়। তবে ব্যাংক হিসাবের জমা ও উত্তোলন মিলিয়ে যে বড় অঙ্কের লেনদেনের তথ্য এসেছে, তা সরাসরি আত্মসাৎ বা অবৈধ সম্পদের পরিমাণ নয়। এসব অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তি এখনও হয়নি।
দীর্ঘদিন কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে হানিফের প্রভাব নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ছিল বলে দাবি করেছেন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তাদের অভিযোগ, দলীয় সিদ্ধান্ত, নেতৃত্ব নির্বাচন এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে হানিফের প্রভাব ছিল ব্যাপক। আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ বিরোধী মতের নেতাকর্মীদেরও অনেক সময় কোণঠাসা হতে হয়েছে। অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীরা হামলা, মামলা এবং রাজনৈতিক হয়রানির করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের একাংশের ভাষ্য, ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবের কারণে সাধারণ মানুষও অনেক সময় প্রতিবাদ করতে সাহস পেতেন না। তবে এসব বক্তব্য রাজনৈতিক অভিযোগ হিসেবে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও নথি যাচাই করা প্রয়োজন।
কুষ্টিয়া জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের দপ্তর সম্পাদক শাহারিয়া ইমন রুবেল এশিয়া পোস্টকে বলেন, দীর্ঘদিন কুষ্টিয়ার রাজনীতিতে মাহবুব উল আলম হানিফ ও তার ঘনিষ্ঠদের একচ্ছত্র প্রভাব ছিল। তাদের রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে আওয়ামী লীগের অনেক ত্যাগী ও বিরোধী মতের নেতাকর্মী কোণঠাসা হয়ে পড়েছিলেন। বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা, মামলা ও হয়রানির অভিযোগও রয়েছে। সাধারণ মানুষও অনেকসময় ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারেননি। আমরা মনে করি, রাজনৈতিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে কেউ যেন মানুষের অধিকার ক্ষুণ্ন করতে না পারে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে হবে। রাজনীতিতে প্রতিহিংসা নয়, আইনের শাসন ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা হওয়া উচিত।
কুষ্টিয়া জেলা জামায়াতের সাবেক সেক্রেটারি সুজাউদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, মানুষ অতীত থেকে শিক্ষা নেয় না। ক্ষমতায় থেকে ক্ষমতার দাপটে তারা সাধারণ মানুষের ওপর জুলুম নির্যাতন চালিয়েছে। তারা ভেবেছিল তারা চিরকাল ক্ষমতায় থাকবে।
মাহবুব উল আলম হানিফের মৃত্যুদণ্ড রায়ে কুষ্টিয়া শহরের বাসিন্দা নাসিমা খাতুন বলেন, রাজনীতি মানুষের জন্য হওয়া উচিত। কিন্তু ক্ষমতার কারণে মানুষ যদি ভয় পায়, মামলা-হামলার আশঙ্কায় কথা বলতে না পারে, তাহলে সেটি কোনোভাবেই ভালো রাজনীতি নয়। হানিফ ও আতার সময়ে অনেক মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে আমরা শুনেছি এবং দেখেছি। আজকের রায়ে মানুষের মধ্যে স্বস্তি এসেছে। আমরা চাই, ভবিষ্যতে কেউ যেন ক্ষমতার অপব্যবহার করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করতে না পারে।
কুষ্টিয়া জেলা বিএনপির সদস্য সচিব প্রকৌশলী জাকির হোসেন সরকার এশিয়া পোস্টকে বলেন, মাহবুব উল আলম হানিফ ও তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে কুষ্টিয়ার মানুষ রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, হামলা-মামলা ও হয়রানির অভিযোগ করে আসছিলেন। আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জামায়াতসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক মতের মানুষ তার ক্ষমতার বলয়ের কাছে অসহায় হয়ে পড়েছিলেন। আজকের রায়ের মাধ্যমে মানুষের ন্যায়বিচারের প্রত্যাশা পূরণের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ সম্পন্ন হয়েছে। আমরা মনে করি, ফ্যাসিবাদী শাসন ও মানুষের ওপর অত্যাচার-নিপীড়নের বিচার প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপির জেলা শাখার সদস্য সচিব সুলতান মারুফ তালহা এশিয়া পোস্টকে বলেন, এই রায়ের বিষয়ে আমাদের প্রতিক্রিয়া স্পষ্ট। যারা আসামি, তারা বর্তমানে দেশের বাইরে পলাতক রয়েছেন। সরকার আন্তরিকতার সঙ্গে তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে এই রায় কার্যকর করলেই আমরা সন্তোষ প্রকাশ করব। এর আগে সন্তোষ প্রকাশ করার মতো কিছু আছে বলে আমরা মনে করি না।
চব্বিশের ৫ আগস্ট কুষ্টিয়ার শহীদ ইউসুফ শেখের মেয়ে মোছা সীমা এশিয়া পোস্টকে বলেন, সরকারের কাছে আবেদন, তারা যেন ভালোভাবে যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করেন। রায় হয়ে আমরা খুব খুশি। যারা দেশের বাইরে ও দেশের ভেতরে পলাতক রয়েছে, তাদেরকে যেন আইনের আওতায় এনে সঠিক শাস্তি দেওয়া হয়।


