দখলদারদের কবলে গঙ্গা-কপোতাক্ষ সেচ প্রকল্পের খাল, হুমকিতে কৃষি

ঝিনাইদহের কৃষিনির্ভর জনপদের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডের খনন করা ড্রেনেজ খালগুলো একসময় ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। বর্ষায় অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশন এবং শুষ্ক মৌসুমে সেচ সুবিধা নিশ্চিত করে এসব খাল দীর্ঘদিন কৃষি উৎপাদন সচল রেখেছে। তেমনই একটি খাল এন৭/ডি৩এন, যা গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে) সেচ প্রকল্পের আওতায় খনন করা হয়েছিল।
খালটি শৈলকুপার শাপখোলা এলাকা থেকে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার বাকড়ী হয়ে নবগঙ্গা নদীতে গিয়ে মিলিত হতো। একটি বিস্তৃত জলপ্রবাহ ব্যবস্থার অংশ হিসেবে খালটি একসময় বেশ কার্যকর ছিল। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় কিছু প্রভাবশালীর দখলে পড়ে এর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়েছে।
প্রথমে খালের পাড় ভেঙে পাশের জমির সঙ্গে একীভূত করা হয়। পরে ধীরে ধীরে খালের ওপর বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কোথাও খাল খনন করে পুকুরে রূপান্তর করা হয়েছে, আবার কোথাও ভরাট করে চাষাবাদ চলছে। এমনকি খালের ওপর নির্মিত কালভার্ট ভেঙে ফেলার ঘটনাও ঘটেছে। ফলে পানির স্বাভাবিক চলাচল পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে।
শাপখোলা-পোড়া বাকড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে খালের একটি বড় অংশ এখন পুকুরে পরিণত হয়েছে। এতে খালের ধারাবাহিকতা ভেঙে গেছে এবং পরবর্তী অংশে এর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, একসময় এই খাল দিয়ে স্বাভাবিকভাবে পানি প্রবাহিত হতো এবং বর্ষা মৌসুমে অতিরিক্ত পানি সহজেই নেমে যেত। বর্তমানে খাল দখল হয়ে যাওয়ায় উজানের এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এতে ফসলের ক্ষতি হচ্ছে এবং চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কথা বলতে ভয় পান অনেকেই। প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকায় দখলদারেরা নির্বিঘ্নে খাল দখল করে রেখেছে।
গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জি-কে) সেচ প্রকল্পটি ১৯৫৪ সালে শুরু হয়ে ১৯৬২ সালে আংশিকভাবে চালু হয় এবং ১৯৮১ সালে সম্পূর্ণ বাস্তবায়ন শেষ হয়। এই প্রকল্পে মোট ব্যয় হয় ৮২৮ মিলিয়ন টাকা (বিরাশি কোটি আশি লক্ষ টাকা)। কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও মাগুরা জেলার মোট ১৯৭.৪৮৬ হেক্টর জমিতে এই প্রকল্প বিস্তৃত, যার মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৮৪.৯৮৬ হেক্টর এবং দ্বিতীয় পর্যায়ে ১১২.৫০০ হেক্টর জমি অন্তর্ভুক্ত। ভেড়ামারায় অবস্থিত পাম্প স্টেশনের মাধ্যমে গঙ্গা নদী থেকে পানি উত্তোলন করা হয়, যেখানে তিনটি প্রধান পাম্পের মোট ক্ষমতা ১১০.৪ কিউসেক এবং ১২টি সহায়ক পাম্পের ক্ষমতা ৪২ কিউসেক। এই প্রকল্পের আওতায় ১৯৩ কিলোমিটার দীর্ঘ প্রধান খাল, ৪৬৭ কিলোমিটার দ্বিতীয় পর্যায়ের খাল এবং ৬৩১ কিলোমিটার শাখা নালার মাধ্যমে প্রায় ১,৪২,০০০ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা পৌঁছে দেওয়া হয়। এছাড়া ৩,৫০০টি নির্গমন দ্বার রয়েছে, যা পানি প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ঝিনাইদহ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী রঞ্জন কুমার দাস বলেন, বিষয়টি আগে তার জানা ছিল না। তবে দ্রুত খালটি দখলমুক্ত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে খাল খননের কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে এবং বর্তমানে মোবিলাইজেশন কার্যক্রম চলছে।