Advertisement

ময়মনসিংহ বোর্ডে ৫ বছরে ফল বিপর্যয়: পাসের হার ৯৭ থেকে নেমে ৫৭ শতাংশে

এশিয়া পোস্ট নিউজ, ময়মনসিংহ
ময়মনসিংহ বোর্ডে ৫ বছরে ফল বিপর্যয়: পাসের হার ৯৭ থেকে নেমে ৫৭ শতাংশে
ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড। ছবি : এশিয়া পোস্ট

ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষার ফল যেন এক দীর্ঘ পতনের গল্প। করোনা মহামারির পর ২০২১ সালে যেখানে এই বোর্ডে পাসের হার ছিল ৯৭.৫২ শতাংশ, পাঁচ বছরের ব্যবধানে ২০২৬ সালে তা নেমে এসেছে ৫৭.৩৯ শতাংশে। শুধু পাসের হারই কমেনি, দেশের সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর মধ্যেও এবার সর্বনিম্ন স্থানে অবস্থান করছে ময়মনসিংহ।

Advertisement

তবে এই সার্বিক বিপর্যয়ের মধ্যেও পাসের হার ও জিপিএ-৫—দুই সূচকেই ছেলেদের স্পষ্ট ব্যবধানে পেছনে ফেলেছে মেয়েরা।

এবার ময়মনসিংহ বোর্ডের অধীন চার জেলার ১ হাজার ৩৪৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ১ লাখ ৫ হাজার ২৮ জন শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। এর মধ্যে পাস করেছে ৬০ হাজার ২৭৪ জন। পাসের হার ৫৭.৩৯ শতাংশ এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে ৫ হাজার ৭০০ জন।

ফলাফলের সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যটি দেখা গেছে ছেলে ও মেয়েদের মধ্যে। পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৫৩ হাজার ৮৭৭ জন ছাত্রের মধ্যে পাস করেছে ২৮ হাজার ৩৭২ জন; পাসের হার ৫২.৬৬ শতাংশ। অন্যদিকে ৫১ হাজার ১৫১ জন ছাত্রীর মধ্যে ৩১ হাজার ৯০২ জন পাস করেছে, যাদের পাসের হার ৬২.৩৭ শতাংশ। অর্থাৎ পাসের হারে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে ৯.৭১ শতাংশীয় পয়েন্ট এগিয়ে রয়েছে।

জিপিএ-৫ পাওয়ার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। মোট ৫ হাজার ৭০০ জন জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর মধ্যে ছাত্র ২ হাজার ৬২১ জন এবং ছাত্রী ৩ হাজার ৭৯ জন। অর্থাৎ জিপিএ-৫ প্রাপ্তিতেও মেয়েরা ছেলেদের তুলনায় ৪৫৮ জন বেশি।

কিন্তু মেয়েদের এই অগ্রগতির বিপরীতে পুরো বোর্ডের ফলাফল কেন ধারাবাহিকভাবে তলানিতে গিয়ে ঠেকছে—সেই প্রশ্নই এখন মুখ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিসংখ্যান বলছে, ময়মনসিংহ বোর্ডের ফলাফলে ধস শুরু হয়েছে কয়েক বছর ধরে। ২০২১ সালে পাসের হার ছিল ৯৭.৫২ শতাংশ। ২০২২ সালে তা কমে হয় ৮৯.০২ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮৫.৪৯ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে দাঁড়ায় ৮৫ শতাংশে। এরপর ২০২৫ সালে এক ধাক্কায় পাসের হার নেমে আসে ৫৮.২২ শতাংশে। এবার (২০২৬ সালে) আরও ০.৮৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে তা দাঁড়িয়েছে ৫৭.৩৯ শতাংশে। অর্থাৎ মাত্র দুই বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে প্রায় ২৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।

ফলাফলের এই ধারাবাহিক পতনকে কেবল একটি সাধারণ পরীক্ষার ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর সঙ্গে শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিতি, পাঠদানের নিম্নমান, শিক্ষকসংকট, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা এবং কিছু প্রতিষ্ঠানের বাস্তবে অস্তিত্বহীন শিক্ষার্থীসংখ্যার মতো গুরুতর প্রশ্ন জড়িত।

বিভাগভিত্তিক ফলাফলও সেই দুর্বলতার চিত্র স্পষ্ট করছে। বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থীদের পাসের হার ৭১.৮৭ শতাংশ হলেও মানবিক বিভাগে তা নেমে এসেছে ৪৬.১২ শতাংশে এবং ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে ৪৮.৯৯ শতাংশে। অর্থাৎ বিজ্ঞান বিভাগের সঙ্গে মানবিক ও ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের ব্যবধান প্রায় ২৩ থেকে ২৬ শতাংশীয় পয়েন্ট।

বোর্ড কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বিশেষ করে গণিত ও ইংরেজিতে শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে খারাপ ফল করেছে। ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. শাহাদত মোল্লার দাবি, এ দুটি বিষয়ের প্রশ্নপত্র কঠিন হওয়ায় পাসের হার কমেছে।

তবে শুধু প্রশ্ন কঠিন হওয়ার অজুহাত পুরো চিত্রকে ব্যাখ্যা করতে পারে না। কারণ একটি বোর্ডের ফলাফল বছরের পর বছর ধারাবাহিকভাবে নিম্নমুখী হতে থাকলে প্রশ্নের কাঠিন্যের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের প্রস্তুতি ও বিদ্যালয়গুলোর পাঠদানের সক্ষমতা খতিয়ে দেখা জরুরি।

জেলাওয়ারি ফলাফলেও বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। চার জেলার মধ্যে নেত্রকোনা এগিয়ে—পাসের হার ৬০.৪৯ শতাংশ। ময়মনসিংহে ৫৭.৮০, জামালপুরে ৫৫.৬০ এবং শেরপুরে ৫৫.৪১ শতাংশ।

আরও উদ্বেগজনক তথ্য এসেছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক ফলাফলে। এবার ১০টি প্রতিষ্ঠানের সব শিক্ষার্থী পাস করলেও চারটি প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষার্থীই পাস করতে পারেনি (শতভাগ ফেল)। শতভাগ ফেল করা চার প্রতিষ্ঠানের অন্তত দুটির ক্ষেত্রে অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে গুরুতর সব অনিয়ম।

ফুলবাড়িয়া উপজেলার শহীদ স্মৃতি গার্লস হাইস্কুলে এবার এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলেন মাত্র পাঁচজন, যাদের কেউই পাস করতে পারেননি। অথচ বিদ্যালয়টিতে শিক্ষকের সংখ্যা সাতজন এবং ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত মোট শিক্ষার্থী প্রায় ৯৮ জন। ১৯৯৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিদ্যালয়টি এখনো এমপিওভুক্ত হয়নি। তদুপরি, বিদ্যালয়ের গণিত শিক্ষক প্রবাসে চলে যাওয়ায় পদটিও খালি রয়েছে।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সাবিনা ইয়াসমিনের দাবি, শিক্ষার্থীদের নিয়মিত উপস্থিতি ছিল না। অভিভাবকদের নিয়ে সভা করেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তার মতে, মোবাইল ফোনে অতিরিক্ত আসক্তিও ফল বিপর্যয়ের বড় কারণ। তবে তিনি শিক্ষকদের দায়ও এড়িয়ে যাননি; বেতন দিতে না পারায় শিক্ষকদের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি সম্ভব হয়নি বলেও জানান।

এ বিষয়ে ফুলবাড়িয়া উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান ভুঞার মন্তব্য বেশ গুরুতর। তিনি জানান, শতভাগ অকৃতকার্য প্রতিষ্ঠানগুলোর অধিকাংশেরই বাস্তবে কার্যকর কার্যক্রম নেই। কাগজে-কলমে কাল্পনিক শিক্ষার্থী দেখিয়ে পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।

অন্যদিকে মুক্তাগাছা মহাবিদ্যালয়ের নামে এবার এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া চারজন শিক্ষার্থীর কেউই পাস করেননি। অথচ অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমিক শাখায় ২০২২ সাল থেকেই কার্যক্রম ও শিক্ষার্থী ভর্তি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ রয়েছে।

আরও জানা গেছে, ‘এমএন ইন্টারন্যাশনাল স্কুল অ্যান্ড কলেজ’ নামের একটি অনুমোদনহীন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের মুক্তাগাছা মহাবিদ্যালয়ের নামে গোপনে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হয়েছিল। যে প্রতিষ্ঠানে মাধ্যমিক শাখায় ভর্তিই বন্ধ, তাদের নামে কীভাবে অস্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা দিল—তা নিয়ে তীব্র বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

মুক্তাগাছা মহাবিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ বজরং আগারওয়ালা দাবি করেন, মানবিক দিক বিবেচনা করে পূর্ববর্তী অধ্যক্ষ ওই শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ দিয়েছিলেন।

ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অধ্যাপক মো. শাহাদত মোল্লা এ ঘটনার দায় সরাসরি প্রতিষ্ঠানটির ওপর চাপিয়ে বলেন, বোর্ডের আইডি ও পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে ফরম পূরণ করা স্পষ্ট অনিয়ম ও তথ্য গোপনের শামিল। নিজস্ব শিক্ষার্থী না থাকা সত্ত্বেও অন্য একটি অস্বীকৃত প্রতিষ্ঠানের পরীক্ষার্থীদের সুযোগ দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনে ওই প্রতিষ্ঠানের স্বীকৃতি বাতিলের সুপারিশ করা হবে।

শিক্ষাবিদ অধ্যক্ষ লে. কর্নেল (অব.) ড. শাহাব উদ্দিন বলেন, ময়মনসিংহ বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফল শুধু ৫৭.৩৯ শতাংশ পাসের হারের হিসাব নয়। এর পেছনে রয়েছে মেয়েদের সাফল্য ও ছেলেদের পিছিয়ে পড়া, বিজ্ঞান ও মানবিক বিভাগের বিশাল ব্যবধান এবং বছরের পর বছর ফল অবনতির ধারা। একই সঙ্গে ভুয়া শিক্ষার্থী, প্রাতিষ্ঠানিক অনিয়ম ও পাঠদানের অচলাবস্থাও উন্মোচিত হয়েছে।

সার্বিক বিষয়ে ময়মনসিংহ শিক্ষা বোর্ড সচিব অধ্যাপক মো. এনামুল হক জানিয়েছেন, শিক্ষার্থীদের পুনরায় শ্রেণিকক্ষমুখী করা, শিক্ষার মান বাড়ানো এবং গণিত ও ইংরেজির মতো বিষয়ে বিশেষ জোর দিয়ে সার্বিক পড়াশোনার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

বিষয় :