ভোলা ফায়ার সার্ভিস/নেই নিজস্ব ডুবুরি দল ও স্পিডবোট

চারদিকে নদী ও সাগরবেষ্টিত দ্বীপ জেলা ভোলায় প্রতিনিয়তই ঘটছে নদী দুর্ঘটনা ও পানিতে ডুবে নিখোঁজের ঘটনা। তবে এসব দুর্ঘটনায় দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা চালানোর জন্য ভোলা ফায়ার সার্ভিস ইউনিটে নেই কোনো নিজস্ব ডুবুরি দল বা স্পিডবোট। ফলে যে কোনো দুর্ঘটনার পর উদ্ধারকাজে বরিশাল থেকে ডুবুরি দল আসার দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হয়।
প্রশিক্ষিত ডুবুরি ও আধুনিক উদ্ধার সরঞ্জামের সংকটে প্রায়শই উদ্ধার অভিযান বিলম্বিত হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন স্বজনদের আহাজারি দীর্ঘ হচ্ছে, অন্যদিকে বাড়ছে প্রাণহানির ঝুঁকি ও উদ্ধারকর্মীদের ভোগান্তি। দুর্যোগপ্রবণ এই জেলায় দ্রুত ও কার্যকর উদ্ধার অভিযান নিশ্চিত করতে ভোলা ফায়ার সার্ভিসকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীতকরণ, নিজস্ব ডুবুরি দল গঠন ও প্রয়োজনীয় আধুনিক সরঞ্জাম সরবরাহের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
সম্প্রতি ভোলার শিবপুরে মেঘনা নদীর পাড়ে ঘুরতে গিয়ে জিও ব্যাগ ধসে নদীতে পড়ে যান ৫ জন। তাদের মধ্যে ৩ জন সাঁতরে তীরে উঠতে সক্ষম হলেও রাকিব ও আমজাদ নামের দুইজন নিখোঁজ হন। পরে সলিল সমাধি ঘটে তাদের। জেলায় ফায়ার সার্ভিসের ৭টি ইউনিট থাকলেও নিজস্ব কোনো ডুবুরি দল না থাকায় সময়মতো উদ্ধারকাজ শুরু করা সম্ভব হয়নি।
এলাকাবাসী জানান, নদ-নদীতে দুর্ঘটনা ঘটলে বরিশাল থেকে ডুবুরি দল আনতে হয়। ফলে সময়মতো কাজ শুরু করা যায় না। এ ছাড়া জেলায় দুটি রিভার ফায়ার স্টেশন নির্মাণের কথা থাকলেও তা দীর্ঘদিন ধরে ফাইলবন্দি হয়ে রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, অর্ধশতাধিক চরাঞ্চলে নৌদুর্ঘটনা বা অগ্নিকাণ্ড ঘটলে তাৎক্ষণিক নেভানোর মতো আধুনিক কোনো স্পিডবোটও নেই। ফলে নিখোঁজের তালিকা যেমন দীর্ঘ হচ্ছে, তেমনি আগুনে ক্ষয়ক্ষতিও বাড়ছে।
শিবপুরের মেঘনা পাড়ে নিখোঁজ হয়ে মারা যাওয়া আমজাদের ভাই মিরাজ আক্ষেপ করে বলেন, আমরা ভোলাবাসী কতটা অসহায়! ফায়ার সার্ভিস আছে কিন্তু ডুবুরি দল নেই। আজ ডুবুরি দল থাকলে হয়তো আমার ভাইকে এভাবে প্রাণ দিতে হতো না। ভোলা-বরিশাল সেতু বা রাস্তা করার আগে সরকারের কাছে আকুল আবেদন-ভোলা ফায়ার সার্ভিসে ডুবুরি দল ও স্পিডবোট যুক্ত করুন, যেন আর কাউকে এভাবে স্বজন হারাতে না হয়।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী শিমুল চৌধুরী বলেন, ভোলা নদীমাতৃক এলাকা। এখানে নিয়মিতই সাঁতার কাটতে গিয়ে বা নৌদুর্ঘটনায় মানুষ নিখোঁজ হয়। বরিশাল থেকে ডুবুরি দল আসতে আসতে অনেকেই মারা যান। দ্বীপ জেলা হওয়া সত্ত্বেও ফায়ার সার্ভিস স্টেশনটি আধুনিকায়ন করা হয়নি। দ্রুত এখানে ডুবুরি দল ও স্পিডবোট পদায়ন করা জরুরি।
ভোলা ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন অফিসার খন্দকার মিরাজুল ইসলাম বলেন, ডুবুরি দল না থাকায় নদী বা পুকুরে কেউ নিখোঁজ হলে উদ্ধারকাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। এই জেলার জন্য ফায়ার সার্ভিস ইউনিটে ডুবুরি দল স্থাপন এখন সময়ের দাবি।
সংকটের কথা স্বীকার করে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স ভোলার উপপরিচালক লিটন আহমেদ বলেন, ফায়ার ফাইটাররা সব সময় প্রথম সারির যোদ্ধা। কিন্তু ভোলার স্টেশনগুলো দীর্ঘদিন ধরে নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ভোলা ফায়ার সার্ভিসকে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত করা, দুটি রিভার ফায়ার স্টেশন নির্মাণ, নিজস্ব ডুবুরি ইউনিট গঠন এবং জনবল সংকট নিরসনের বিষয়গুলো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পাশাপাশি সাত উপজেলার অবকাঠামো ও আধুনিক সরঞ্জাম বাড়াতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
১৯৮৫ সালে ভোলায় প্রথম ফায়ার সার্ভিস ইউনিট প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে দীর্ঘ চার দশকেও এটি দ্বিতীয় শ্রেণির স্টেশন হিসেবেই রয়ে গেছে। সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে জেলায় নদী দুর্ঘটনায় দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি এবং শতাধিক নৌকাডুবির ঘটনা ঘটেছে।
