logo
Advertisement

এক লাখ ইয়াবা আত্মসাতের সত্যতা মিললেও বহাল তবিয়তে সেই ওসি

এশিয়া পোস্ট নিউজ, চট্টগ্রাম
এক লাখ ইয়াবা আত্মসাতের সত্যতা মিললেও বহাল তবিয়তে সেই ওসি
অভিযুক্ত আফতাব উদ্দিন। ছবি: সংগৃহীত

কক্সবাজার থেকে চট্টগ্রাম নগরে আসার পথে এক পুলিশ সদস্যের কাছ থেকে উদ্ধার করা এক লাখ পিস ইয়াবা আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা মিললেও এই ঘটনায় দায়ী ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কোন ব্যবস্থা নেয়নি পুলিশ।

Advertisement

গত বছরের ৮ ডিসেম্বর শাহ আমানত সেতু সংলগ্ন পুলিশ বক্সে এই ইয়াবা আত্মসাতের ঘটনা ঘটে। অভিযোগ রয়েছে, ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে মামলার পরিবর্তে ইয়াবা বহনকারীকে ছেড়ে দেওয়ার নির্দেশ দেন থানার তৎকালীন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিন।

বিষয়টি দীর্ঘদিন গোপন থাকার পর, ইয়াবা বহনকারী পুলিশ সদস্যের সঙ্গে অন্য এক ব্যক্তির কথোপকথনের একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফাঁস হলে বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। এরপর চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার (ট্রাফিক) মো. ওয়াহিদুল হক চৌধুরীকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযুক্ত ওসি আফতাব উদ্দিন ও তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে গত ২৯ এপ্রিল পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হলেও রহস্যজনকভাবে ওসির বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। উল্টো তিনি বর্তমানে চট্টগ্রামের ব্যস্ততম কোতোয়ালি থানার ওসির দায়িত্ব পালন করছেন।

তবে তদন্ত কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে এ পর্যন্ত ৯ পুলিশ সদস্যকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। সবশেষ গত ৯ জুন বাকলিয়া থানার তৎকালীন পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদকে বরখাস্ত করা হয়। এর আগে বরখাস্ত করা হয় এসআই মো. আল-আমিন সরকার, এসআই মো. আমির হোসেন, এএসআই সাইফুল আলম, এএসআই জিয়াউর রহমান, এএসআই সাদ্দাম হোসেন, এএসআই এনামুল হক, কনস্টেবল রাশেদুল হাসান, কনস্টেবল উম্মে হাবিবা স্বপ্না।

এছাড়া ইয়াবাসহ আটক হওয়া কক্সবাজার জেলা আদালতের বিচারকের গানম্যান (কনস্টেবল) ইমতিয়াজ হোসেনকেও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তবে ঘটনার ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও আত্মসাৎকৃত ইয়াবা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি এবং প্রধান অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কোনো নিয়মিত ফৌজদারি মামলা দায়ের করা হয়নি।

যেভাবে আত্মসাৎ করা হয় ইয়াবা

ছয় পৃষ্ঠার তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, কনস্টেবল ইমতিয়াজ কক্সবাজারের মোশাররফ নামের এক ব্যক্তির কাছ থেকে এক লাখ ইয়াবাভর্তি একটি লাগেজ নিয়ে ঢাকাগামী ‘দেশ ট্রাভেলস’-এর একটি বাসে ওঠেন। বাসটি কর্ণফুলী নদীর শাহ আমানত সেতু পার হওয়ার পর বাকলিয়া থানার এএসআই সাদ্দাম হোসেন ও পুলিশের এক সোর্স বাসটিতে তল্লাশি চালান। ইমতিয়াজ নিজেকে পুলিশ পরিচয় দিলেও তাকে বাস থেকে নামিয়ে পুলিশ বক্সে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বাসের সুপারভাইজারকে তাগিদ দিয়ে বাসটি ছেড়ে দেওয়া হয়।

জিজ্ঞাসাবাদে ইমতিয়াজ জানান, পুলিশ বক্সের ভেতর বাকলিয়া থানার পরিদর্শক (তদন্ত) তানভীর আহমেদ এবং এসআই আল–আমিন সরকার উপস্থিত ছিলেন। সেখানে লাগেজ খুলে ১০টি প্যাকেটে থাকা মোট ১ লাখ ইয়াবা নিশ্চিত হওয়ার পর পুলিশ সদস্যরা তা নিজেদের হেফাজতে নেন। এরপর ইয়াবা রেখে খালি লাগেজসহ ইমতিয়াজকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে, বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিনের সরাসরি নির্দেশেই এই ইয়াবা গায়েব ও আসামি ছেড়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটে।

পুলিশের তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১৮-এর ৪৬ ধারা অনুযায়ী মাদকসংক্রান্ত অপরাধগুলো আমলযোগ্য। কিন্তু ওসি আফতাব উদ্দিন মামলা না করে পিআরবি (বাংলাদেশ পুলিশ প্রবিধান) ২৪৪ বিধি এবং পুলিশ আইনের ২৯ ধারা লঙ্ঘন করেছেন। এছাড়া তিনি ঘটনাস্থলের সিসিটিভি ফুটেজও ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে ধ্বংস করেন বা সংরক্ষণ করেননি।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন ওসি আফতাব উদ্দিন দাবি করেন, ইয়াবার বিষয়ে আমি কিছু জানি না। আমি তা আত্মসাৎ করিনি এবং ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম।

পুলিশের নিয়ম অনুযায়ী, কনস্টেবল থেকে এসআই পর্যন্ত কর্মকর্তাদের সিএমপি কমিশনার বরখাস্ত করতে পারলেও, পরিদর্শক (ইনস্পেক্টর) পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের বরখাস্তের এখতিয়ার পুলিশ মহাপরিদর্শকের (আইজিপি)। সেই কারণে ওসির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পুলিশ সদর দপ্তরের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করা হচ্ছে।

তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া সিএমপির অতিরিক্ত উপকমিশনার (পশ্চিম) আবদুল্লাহ মোহাম্মদ শেখ সাদী জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় আটজনকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করা হয়েছিল। পরে তাদের সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা ও ফৌজদারি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা এবং নিয়মিত মামলার সুপারিশও করা হয় তদন্ত প্রতিবেদনে। এ ছাড়া বাকলিয়া থানার তৎকালীন ওসি ও পরিদর্শক তদন্তকে সাময়িক বরখাস্তের সুপারিশ করা হয় পুলিশ সদর দপ্তরে। এরপর ৯ জুন বাকলিয়া থানার পরিদর্শক তদন্ত তানভীর আহমেদকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। বরখাস্ত হওয়া আট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলার তদন্ত এখনও চলছে।

সার্বিক বিষয়ে চট্টগ্রাম নগরের নবনিযুক্ত পুলিশ কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী বলেন, ইয়াবা গায়েবের ঘটনায় এত দিন কেন নিয়মিত মামলা হয়নি, তা গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মাদকের বিরুদ্ধে আমাদের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। জড়িত কাউকেই ছাড় দেওয়া হবে না।