logo

গ্রাহকদের টাকা জুয়ায় উড়িয়ে দেন ৩ ব্যাংক কর্মচারী, ছিনতাইয়ের নাটক

গ্রাহকদের টাকা জুয়ায় উড়িয়ে দেন ৩ ব্যাংক কর্মচারী, ছিনতাইয়ের নাটক
ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের ঘটনায় নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসপি তারিকুল ইসলাম। ছবি: এশিয়া পোস্ট

নওগাঁর রানীনগরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের চাঞ্চল্যকর ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন করেছে জেলা পুলিশ। গ্রাহকদের টাকা জমা না দিয়ে অনলাইন জুয়ায় উড়িয়ে দেন ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের তিন কর্মচারী। জুয়ায় হেরে সেই ঘাটতি সামাল দিতে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মালিকের ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন তারা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, সহকর্মীকে মারধর করে টাকা ছিনতাইয়ের নাটক সাজানো হয়। এ ঘটনায় ব্যাংকের তিন কর্মচারীসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

শুক্রবার (৯ অক্টোবর) নওগাঁ পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান এসপি তারিকুল ইসলাম।

পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ৬ অক্টোবর দুপুরে ইসলামী ব্যাংকের এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের ক্যাশিয়ার মো. নাজমুল ইসলাম ও অফিস সহায়ক মো. রাসেল আদিমদিঘী রেলগেট থেকে এজেন্ট ব্যাংকিংয়ের মালিক ফিরোজ হোসেনের ৩৪ লাখ টাকা নিয়ে মোটরসাইকেলে করে আবাদপুকুর বাজারে অবস্থিত অফিসের উদ্দেশে রওনা হন। পথে রানীনগর থানার পারইল বাজার পার হয়ে বাংলালিংক টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে একটি মোটরসাইকেলে আসা দুর্বৃত্তরা তাদের পথরোধ করে। পরে লোহার স্টিক দিয়ে মারধর করে নগদ ৩৪ লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।

ঘটনার পর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে নিয়ে তাৎক্ষণিকভাবে রানীনগর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে (ওসি) প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। পাশাপাশি জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও রানীনগর থানা পুলিশের একটি চৌকস দলকে অভিযানে নামানো হয়।

তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তা এবং বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ঘটনার রাতেই জেলা গোয়েন্দা শাখা ও রানীনগর থানা পুলিশ অভিযান চালায়। এ সময় ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলটি জব্দ করা হয় এবং এর মালিক রাব্বি আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়।

পরবর্তী সময়ে ৭ অক্টোবর রাতে পুলিশ সুপারের তত্ত্বাবধানে ডিবির একটি বিশেষ দল জয়পুরহাটের আক্কেলপুর ও দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ থানা এলাকায় অভিযান চালায়। এ সময় ডাকাতির ঘটনায় জড়িত স্বপন (২৮) ও হাসান আলীকে (২৫) গ্রেপ্তার করা হয়। এ সময় ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত একটি নিবন্ধনবিহীন মোটরসাইকেল, একটি আইফোনসহ মোট সাতটি মোবাইল ফোন এবং লুট হওয়া ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা উদ্ধার করা হয়েছে।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ৮ অক্টোবর রানীনগর এলাকায় অভিযান চালিয়ে ব্যাংকের ভেতরের তিন কর্মচারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন—অফিস সহায়ক ও সাজানো ভিকটিম রাসেল বাবু (২২), লোন কর্মকর্তা সুজন (২৭) এবং লোন কর্মকর্তা আবু তালেব (২২)।

পুলিশের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, গ্রেপ্তার ব্যাংক কর্মচারী রাসেল, সুজন ও আবু তালেব বেশ কিছুদিন ধরে অনলাইনে জুয়া খেলে ৭ থেকে ৮ লাখ টাকা হারান। গ্রাহকদের টাকা জমা না দিয়ে তারা সেই টাকা জুয়ায় উড়িয়ে দেন। পরে ব্যাংকের মালিক ফিরোজ হোসেনের ৩৪ লাখ টাকা ছিনতাইয়ের পরিকল্পনা করেন তারা।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় এক মাস ধরে এ পরিকল্পনা করা হয়। ঘটনার দিন অফিস সহায়ক রাসেল বাবু ক্যাশিয়ার নাজমুলকে সঙ্গে নিয়ে টাকা আনতে যান। ফেরার পথে রাসেল ছিনতাইকারী স্বপন ও হাসানকে নিয়মিত নিজেদের অবস্থান জানাতে থাকেন। ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর স্বপন ও হাসান হামলা চালিয়ে টাকা ছিনিয়ে নেন। এ সময় প্রকৃত ভুক্তভোগী ক্যাশিয়ার নাজমুলকে লোহার পাইপ দিয়ে বেদম মারধর করা হয়। অন্যদিকে, টাকা বহনকারী রাসেল বাবু সাজেন ‘মিথ্যা ভিকটিম’।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, ছিনতাই হওয়া ৩৪ লাখ টাকার মধ্যে ব্যাংকের এই তিন কর্মচারীর ১০ লাখ টাকা পাওয়ার কথা ছিল। বাকি টাকা নেওয়ার কথা ছিল অন্য ছিনতাইকারীদের। প্রাথমিকভাবে স্বপন ও হাসানকে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিয়ে দ্রুত নওগাঁ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম জানান, এ ঘটনায় মোট ছয়জন আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। পলাতক অন্য আসামিদের গ্রেপ্তার এবং বাকি টাকা উদ্ধারে জেলা পুলিশের অভিযান ও তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।