logo

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনিশ্চিত এলপিজি কর্মসূচি, পরিবেশে চাপ বাড়ার শঙ্কা

রোহিঙ্গা ক্যাম্পে অনিশ্চিত এলপিজি কর্মসূচি, পরিবেশে চাপ বাড়ার শঙ্কা

কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের রান্নার জ্বালানি হিসেবে এলপিজি (তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস) সরবরাহ তহবিল সংকটে পড়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে। ইতোমধ্যে ভাসানচরে এলপিজি সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে রোহিঙ্গারা আবারও জ্বালানির জন্য বননির্ভর হয়ে পড়তে পারেন। এতে বন ও পরিবেশের ওপর নতুন করে চাপ বাড়ার আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

ক্যাম্পে নিয়োজিত আন্তর্জাতিক দাতা সংস্থাগুলোর কর্মকর্তারা বলছেন, এলপিজি সরবরাহ বন্ধ হলে উখিয়া-টেকনাফের বনভূমি আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তাই কর্মসূচিটি চালু রাখতে আন্তর্জাতিক সহায়তা অব্যাহত রাখা জরুরি।

২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের ঢল নামার পর রাতারাতি বদলে যায় উখিয়া-টেকনাফের পাহাড়ি জনপদ। সেখানে গড়ে ওঠে বিশ্বের বৃহত্তম শরণার্থী আশ্রয়শিবির। শুরুতে রোহিঙ্গাদের রান্নার জ্বালানির জন্য একমাত্র ভরসা ছিল বনের কাঠ। প্রতিদিন হাজারো রোহিঙ্গা জ্বালানি সংগ্রহের জন্য আশপাশের জঙ্গলে যেতেন। এতে দ্রুত উজাড় হতে থাকে বনভূমি।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সে সময় শুধু রান্নার জ্বালানির জন্যই প্রতিদিন প্রায় ৯০০ টন কাঠের প্রয়োজন হতো। ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই পাহাড় ও বনভূমিতে ব্যাপক ক্ষতি দেখা দেয়।

কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০১৮ সালের মধ্যে প্রায় ৭ হাজার একর বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এরমধ্যে ২ হাজার ২৭ একর সৃজিত বন এবং ৪ হাজার ১৩৬ একর প্রাকৃতিক বন ধ্বংস হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জীববৈচিত্র্য এবং সংকুচিত হয়েছে এশীয় হাতির আবাসস্থল। পাশাপাশি পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বেড়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, পরিবেশ সুরক্ষা ও নিরাপদ জ্বালানি নিশ্চিত করতে ২০১৮ সালে জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের ‘সেইফ প্লাস’ কর্মসূচির আওতায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এলপিজি বিতরণ শুরু হয়। বর্তমানে এই কর্মসূচি ‘সেইফ প্লাস–২’ নামে পরিচালিত হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় ৩৩টি ক্যাম্পে আড়াই লাখ পরিবার নিয়মিত এলপিজি পাচ্ছে। প্রতিটি পরিবারকে ১২ কেজি ওজনের একটি এলপিজি সিলিন্ডার দেওয়া হয়। এলপিজি ব্যবহারের আগে এক ঘণ্টার বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং প্রতি দুই বছর পরপর সেই প্রশিক্ষণ নবায়ন করা হয়।

ছবি: এশিয়া পোস্ট

উখিয়ার ৪ নম্বর ক্যাম্পের বাসিন্দা মোহাম্মদ জোবায়ের ও সেতেরা দম্পতির পরিবারে এলপিজি দেওয়ার আগে প্রতিদিন রান্নার জন্য প্রায় ৫ কেজি কাঠ ব্যবহার করতে হতো। এখন গ্যাস পাওয়ায় জঙ্গলে গিয়ে ঝুঁকি নিয়ে কাঠ সংগ্রহ করতে হয় না।

সেতেরা বেগম (২৫) বলেন, ‘বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার প্রথম দিকে ক্যাম্পে কোনো গ্যাস সরবরাহ ছিল না। রান্নার জন্য বনে গিয়ে গাছ কেটে কাঠ আনতে হতো। এতে স্থানীয় গ্রামবাসীর সঙ্গে প্রায়ই সমস্যার সৃষ্টি হতো। গ্যাস সরবরাহ শুরু হওয়ার পর সেই ভোগান্তি অনেক কমেছে।’

মোহাম্মদ জোবায়ের (৩০) বলেন, ‘লাকড়ি দিয়ে রান্না করলে পুরো ঘর ধোঁয়ায় ভরে যেত। এতে শিশুদের অসুস্থতা বাড়ত। এখন গ্যাস পাওয়ায় ধোঁয়ার ঝামেলা নেই। বাচ্চাদের অসুস্থতাও কমেছে। কিন্তু গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে আবার আগের মতো কষ্টে পড়তে হবে।’

ক্যাম্প-৪-এর ডি-৫ ব্লকের বাসিন্দা আব্দুল কুদ্দুস (৫৫) বলেন, ‘বাংলাদেশে আসার পর রান্নার জ্বালানি নিয়ে খুব কষ্টে ছিলাম। বনে গাছ কাটতে গেলে অনেক সময় মারধরের শিকার হতে হয়েছে, এমনকি টাকা দিতে হয়েছে। কখনো কখনো খাদ্য সহায়তায় পাওয়া চাল-ডাল দিয়েও লাকড়ি সংগ্রহ করতে হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘যে পরিমাণ গ্যাস দেওয়া হয়, তা অনেক সময় যথেষ্ট হয় না। পরিবারের সদস্য বেশি হওয়ায় মাস শেষ হওয়ার ৭–১০ দিন আগেই সিলিন্ডার শেষ হয়ে যায়।’

একই ক্যাম্পের এ-৬ ব্লকের বাসিন্দা রশিদা বেগম (৪০) বলেন, ‘গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলে এত মানুষের জন্য রান্না করা খুব কঠিন হয়ে যাবে। তখন কীভাবে খাবার জোগাড় হবে, তা নিয়ে বড় দুশ্চিন্তা রয়েছে।’

ক্যাম্প–৪-এর এফ ব্লকের বাসিন্দা খালেদ হোসেন (২০) বলেন, ‘ক্যাম্পে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হলে আবার বনে যেতে হবে। তখন বন্য হাতির আক্রমণসহ নানা ঝুঁকির মুখে পড়তে হতে পারে।’

জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর ও আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম যৌথভাবে এই এলপিজি সরবরাহ কর্মসূচি পরিচালনা করছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, এলপিজি সরবরাহ বন্ধ হলে উখিয়া-টেকনাফের বন ও পরিবেশের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

bigStoryContent
ছবি: এশিয়া পোস্ট

ইউএনএইচসিআরের অ্যাসিস্ট্যান্ট ফিল্ড অফিসার সারাহ জাবিন বলেন, ‘তহবিল সংকটের কারণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে এলপিজি সরবরাহ কার্যক্রম কয়েকবারই ঝুঁকির মুখে পড়েছে। এই সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে পরিণাম ভয়াবহ হতে পারে। কারণ, কক্সবাজারের ক্যাম্পগুলোতে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বসবাস করছেন।’

তিনি বলেন, ‘জ্বালানি সরবরাহ বন্ধ হলে শুধু রান্নার সমস্যা নয়, অগ্নিনির্বাপণসহ নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়বে।’

সারাহ জাবিন আরও বলেন, ‘এলপিজি সরবরাহ বন্ধ হলে রোহিঙ্গারা আবার জ্বালানি হিসেবে গাছ কাটার দিকে ঝুঁকবে। এতে বনভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপরও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একই সঙ্গে পাহাড়ধসের ঝুঁকিও বাড়তে পারে।’

তিনি জানান, এলপিজি ব্যবহারের ফলে বন উজাড় ও অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি কমেছে। ক্যাম্পের অধিকাংশ ঘর বাঁশ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণ দিয়ে তৈরি হওয়ায় আগুন লাগলে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। তাই এলপিজি শুধু রান্নার জ্বালানি নয়, নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ।

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে এলপিজি সংকট দেখা দিয়েছে। ফলে যেসব রোহিঙ্গা কিছুটা সামর্থ্যবান তারা বাজার থেকে লাকড়ি কিনছেন, আর যাদের সেই সামর্থ্য নেই তারা বাধ্য হয়ে আশপাশের বন থেকে গাছ কাটছেন।’

তিনি বলেন, ‘মূল সমস্যা এখন অর্থের ঘাটতি। যদি পর্যাপ্ত তহবিলের অভাবে এলপিজি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা না যায়, তাহলে গত সাত-আট বছরে ক্যাম্পে যে গাছ লাগিয়ে একটি সবুজ পরিবেশ গড়ে তোলা হয়েছে, তা দ্রুত নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।’

ইউএনএইচসিআরের যোগাযোগ কর্মকর্তা শারি নিজমান বলেন, “জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ে ‘সেইফ প্লাস–২’ উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এই উদ্যোগের প্রথম অংশে শিবিরের প্রতিটি রোহিঙ্গা পরিবারকে এলপিজি দেওয়া হচ্ছে, যাতে রান্নার জ্বালানি হিসেবে কাঠের ওপর নির্ভরতা কমে এবং পরিবেশ সুরক্ষিত থাকে।”

তিনি বলেন, কাঠ পোড়ানোর ধোঁয়া থেকে সৃষ্ট শ্বাসযন্ত্রের রোগের ঝুঁকিও এতে কমছে। পাশাপাশি জ্বালানি কাঠ সংগ্রহে দীর্ঘ সময় ব্যয় করতে না হওয়ায় শরণার্থীদের সময় ও শ্রমও সাশ্রয় হচ্ছে। এই উদ্যোগের দ্বিতীয় অংশে ক্যাম্পের ভেতরে ও আশপাশে ব্যাপক বৃক্ষরোপণ ও সবুজায়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা হচ্ছে। গ্রীষ্মকালে গাছপালা তাপ থেকে আশ্রয় দেয় এবং বর্ষাকালে গাছের শিকড় মাটিকে শক্তভাবে ধরে রেখে ভূমিধসের ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করে।

শারি নিজমান বলেন, ক্যাম্পে পরিচালিত অন্যান্য মানবিক কার্যক্রমের মতোই এলপিজি কর্মসূচিও দাতাদের সহায়তার ওপর নির্ভরশীল। বর্তমানে বৈশ্বিক মানবিক তহবিল কমে যাওয়ার চ্যালেঞ্জ থাকলেও এই কর্মসূচি অব্যাহত রাখা অত্যন্ত জরুরি। তিনি আশা প্রকাশ করেন, প্রয়োজনীয় সময় পর্যন্ত এলপিজি কর্মসূচি চালু রাখতে দাতারা তাদের সহায়তা অব্যাহত রাখবেন।