logo
Advertisement

চাকরির কথা বলে ২০ হাজারে বিক্রি, থাইল্যান্ডের পর মালয়েশিয়ায় পাচার

এশিয়া পোস্ট নিউজ
এশিয়া পোস্ট নিউজ
নড়াইল, খুলনা
চাকরির কথা বলে ২০ হাজারে বিক্রি, থাইল্যান্ডের পর মালয়েশিয়ায় পাচার
দীর্ঘ সাত মাস পর দেশে ফিরে বাবার কাঁধে হাত দিয়ে হাঁটছেন জনি খান। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সংসারে চরম অভাব-অনটন। মাথা গোঁজার ঠাঁই বলতে কেবল দুই শতক জমির ওপর একটি জরাজীর্ণ টিনের ঘর। রিকশা চালিয়ে কোনোমতে সংসার চালাতেন ফোরকান খান। সেই সংসারের হাল ধরতে কাজের সন্ধানে ঢাকায় পাড়ি দিয়েছিলেন তার বড় ছেলে জনি খান। স্বপ্ন ছিল—কাজ করে পরিবারের অভাব দূর করবেন, স্বজনদের মুখে হাসি ফোটাবেন। কিন্তু সেই স্বপ্নই শেষ পর্যন্ত তাকে ঠেলে দেয় এক ভয়াবহ দুঃস্বপ্নের দিকে।

ভালো কাজের আশ্বাস দিয়ে মানবপাচার চক্রের সদস্যরা জনিকে টেকনাফে নিয়ে যায়। সেখানে মাত্র ২০ হাজার টাকায় তাকে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এরপর মাছ ধরার ট্রলারে করে অবৈধ পথে তাকে পাচার করা হয় থাইল্যান্ডে। আর তার পরপরই শুরু হয় তার ওপর অমানবিক নির্যাতন।

প্রায় চার মাস থাইল্যান্ডের একটি গহিন জঙ্গলে আটকে রেখে জনিকে নির্যাতন করা হয়। তার পরিবারের কাছে দাবি করা হয় চার লাখ টাকা মুক্তিপণ। কিন্তু অভাবের সংসারে এত টাকা জোগাড় করা কোনোভাবেই সম্ভব হয়নি। একপর্যায়ে ছেলেকে আর জীবিত ফিরে পাওয়ার আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন স্বজনরা।

মুক্তিপণের টাকা না পেয়ে জনিকে অন্য একটি পাচারকারী চক্রের হাতে তুলে দেওয়া হয়। সেখান থেকে অবৈধ পথে তাকে পাঠানো হয় মালয়েশিয়ায়। সেখানেও প্রায় দুই মাস ধরে কঠোর নির্যাতনের শিকার হন তিনি। একপর্যায়ে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়লে একটি ক্লিনিকের সামনে অচেতন অবস্থায় জনিকে ফেলে রেখে পালিয়ে যায় চক্রটির সদস্যরা।

দীর্ঘ সাত মাসের ভয়াবহ দুঃস্বপ্ন শেষে অবশেষে দেশে ফিরেছেন নড়াইলের কালিয়া উপজেলার পহরডাঙ্গা ইউনিয়নের বাগুডাঙ্গা গ্রামের জনি খান। তবে দেশে ফিরেও স্বস্তি পাননি তিনি। শরীরজুড়ে অমানুষিক নির্যাতনের ক্ষত, আর পরিবারের সামনে এখন নতুন উদ্বেগ—কীভাবে হবে তার উন্নত চিকিৎসা?

জনি জানান, পরিবারের অভাব কিছুটা দূর করার আশায় তিনি ঢাকায় গিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানে আশানুরূপ কাজ না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়েন। এর মধ্যেই এক ব্যক্তির মাধ্যমে মানবপাচারকারী চক্রের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। ভালো কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তাকে টেকনাফে নিয়ে যাওয়া হয়। আর এর পরেই শুরু হয় একের পর এক ভয়াবহ ও করুণ অভিজ্ঞতা।

জনির বাবা ফোরকান খান বলেন, কাজ দেওয়ার কথা বলে প্রথমে জনিকে টেকনাফে নেওয়া হয়। সেখানে একটি দালাল চক্রের হাতে তুলে দেওয়ার পর মাছ ধরার নৌকায় করে জোরপূর্বক তাকে থাইল্যান্ডে পাচার করা হয়। সেখানে তার পরিবারের কাছে চার লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে পাচারকারীরা। টাকা দিতে না পারায় জনির ওপর চরম নির্যাতন চালানো হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

তিনি আরও বলেন, আমরা গরিব মানুষ। চার লাখ টাকা কোথা থেকে দেব? টাকা দিতে না পারায় ছেলেটাকে নির্মমভাবে মারধর ও নির্যাতন করা হয়েছে। প্রায় চার মাস পর তাকে আবার মালয়েশিয়ায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়।

জনির স্বজনরা বলেন, একটি সুন্দর ও স্বাবলম্বী জীবনের আশায় ঘর থেকে বেরিয়েছিল ছেলেটি। কিন্তু মানবপাচারকারীদের নির্মমতার শিকার হয়ে তাকে দীর্ঘ সাত মাস ধরে সীমাহীন নির্যাতন সহ্য করতে হয়েছে। তারা চান, এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া হোক। একই সঙ্গে জনির উন্নত চিকিৎসার জন্য সরকারি ও বেসরকারি সহায়তার জোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

এ বিষয়ে কালিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিন্নাতুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, বাংলাদেশ হাইকমিশনারের কার্যালয় থেকে তথ্য পাওয়ার পর তা সরেজমিনে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে। পরে জনিকে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে আনা হয়। নিয়মানুযায়ী আর্থিক সহায়তার জন্য আবেদন করা হলে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁর চিকিৎসার খরচ বহনের ব্যবস্থা করা হবে।