কিশোরগঞ্জে ৫০০ বছরের ঢাকের হাট, ২০ হাজার থেকে লাখ টাকায় মিলছে ঢাকি

শারদীয় দুর্গোৎসবকে ঘিরে কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীতে জমে উঠেছে প্রায় ৫০০ বছরের ঐতিহ্যবাহী ঢাকের হাট। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ঢাকি ও বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে হাট প্রাঙ্গণ। ঢাক-ঢোল, কাঁসি-সানাই, করতাল ও বাঁশির সম্মিলিত সুরে সৃষ্টি হয়েছে উৎসবমুখর পরিবেশ।
বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে নিজেদের দক্ষতা তুলে ধরছেন শিল্পীরা। তাদের পরিবেশনা শুনে পছন্দের বাদকদল বেছে নিচ্ছেন পূজা আয়োজকেরা। দল ও বাদ্যযন্ত্রের ধরন অনুযায়ী ২০ হাজার টাকা থেকে শুরু করে লাখ টাকারও বেশি সম্মানিতে চলছে দরদাম ও চুক্তি।
প্রতি বছরের মতো এবারও কটিয়াদী সদরের পুরান বাজার এলাকায় বসেছে ঐতিহ্যবাহী এ হাট। বুধবার (১৪ অক্টোবর) সকাল থেকে জমতে শুরু করা হাট চলবে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) ষষ্ঠীর গভীর রাত পর্যন্ত।
বাজার কমিটি-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, এবার দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে দুই শতাধিক বাদকদল হাটে এসেছেন। তবে হাটের সবচেয়ে বেশি জমজমাট অবস্থা দেখা যায় শেষের দিকে।

বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) বিকেলে হাটে গিয়ে দেখা যায়, ঢাকের গর্জন আর নানা বাদ্যযন্ত্রের সুরে মুখর পুরো এলাকা।
একেকটি দল নিজেদের বাদ্যযন্ত্র ও বাজানোর দক্ষতা তুলে ধরছে। পূজা আয়োজকেরা বিভিন্ন দলের পরিবেশনা শুনে পছন্দের দল নির্বাচন করছেন। এরপর চলছে দরদাম ও চুক্তি। যে দলের বাজনা আয়োজকদের মন কাড়ছে, নির্দিষ্ট সম্মানীর বিনিময়ে সেই দলকেই দুর্গাপূজার মণ্ডপে বাজানোর জন্য চুক্তিবদ্ধ করা হচ্ছে।
পছন্দের দল নিতে চলছে দরদাম
নরসিংদীর শিবপুর থেকে হাটে এসেছেন পূজা আয়োজক শুভাশিস সূত্রধর। তিনি বলেন, প্রতিবছর দুর্গাপূজার জন্য বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের দল নিতে এই ঐতিহ্যবাহী হাটে আসি। সকাল থেকে অনেকের বাজনা শুনেছি। এর মধ্যে একটি দলকে পছন্দ হয়েছে। তারা ভালো বাজায়। ৯০ হাজার টাকায় তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থেকে আসা তাপস বিশ্বাস বলেন, এবারই প্রথম এই হাটে এসেছি। এসে মুগ্ধ হয়েছি। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে বাদকদল এসেছে। তাদের মধ্যে বিক্রমপুরের পাঁচ সদস্যের একটি দল পছন্দ করেছি। ৮৫ হাজার টাকায় তাদের সঙ্গে চুক্তি হয়েছে।
বিক্রমপুর থেকে আসা ঢাকি হরলাল দাস বলেন, ফোনে অনেকে যোগাযোগ করেছিলেন, কিন্তু কোথাও যাইনি। এই হাটে না এলে মন মানে না। এখানে এলে অনেকের সঙ্গে দেখা হয়। এই আনন্দটাই আলাদা। আমি ৩০ হাজার টাকা চেয়েছি। দর-কষাকষি চলছে। কমবেশি করে চুক্তি করে চলে যাব।
লাখ টাকার বেশি চুক্তির অপেক্ষায় বাদকদল
বিক্রমপুর থেকে ১০ সদস্যের দল নিয়ে হাটে এসেছেন রণজিৎ মণি দাস। তার দলের সঙ্গে রয়েছে ঢাকসহ আধুনিক বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র। দলটির জন্য ১ লাখ ২০ হাজার টাকা সম্মানী চাইছেন তিনি। ইতোমধ্যে অনেকেই তার দলের সঙ্গে দরদাম করেছেন।
রণজিৎ মণি দাস বলেন, লাখ টাকার কম হলে বাজাতে যাব না। আমার বিশ্বাস, শুক্রবার রাতের মধ্যে লাখ টাকার বেশি সম্মানিতে চুক্তি হয়ে যাবে। এই হাটে এলে সারা দেশের অনেক বাদ্যযন্ত্রশিল্পীর সঙ্গে দেখা-সাক্ষাৎ হয়। একে এক ধরনের মিলনমেলা বলা যায়।
রাজধানীর নবাবপুর থেকে ঢাক নিয়ে এসেছেন নিবাস চন্দ্র মনিদাস। বাবার হাত ধরে এই হাটে আসা শুরু জয় তার। তার বাবা এসেছিলেন দাদার হাত ধরে। এভাবেই কয়েক প্রজন্ম ধরে তাদের পরিবারের সঙ্গে জড়িয়ে আছে কটিয়াদীর ঢাকের হাট।
নিবাস চন্দ্র মনিদাস বলেন, আগে দলবদ্ধভাবে হাটে আসতেন। তবে গত দুই বছর ধরে একাই আসছেন। গত বছর ১৬ হাজার টাকায় একটি চুক্তি পেয়েছিলেন। এবার তার প্রত্যাশা ২০ হাজার টাকা।
নারায়ণগঞ্জ থেকে ছয় সদস্যের দল নিয়ে এসেছেন পঙ্কজ সাহা। তিনি বলেন, গত ২৫ বছর ধরে এই হাটে আসি। এখানে যারা আসেন, তারা কেউ খালি হাতে ফিরে যান না। কোথাও না কোথাও একটা ব্যবস্থা হয়েই যায়। পূজা শেষে বাড়ি ফিরে পরেরবারের অপেক্ষায় থাকি, কখন আবার দুর্গাপূজা আসবে, আর আমরা ঢাকের হাটে যাব।
গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে আট সদস্যের দল নিয়ে এসেছেন বিশ্বজিৎ পণ্ডিত। হাটের পরিবেশ ও চুক্তির সুযোগ ভালো লাগলেও সেখানে প্রয়োজনীয় কিছু সুবিধার অভাব রয়েছে বলে জানান তিনি।
বিশ্বজিৎ পণ্ডিত বলেন, এখানে এলে ভালো দামে চুক্তি হয়। তবে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ঢাকিদের জন্য গোসলখানা বা শৌচাগারের ব্যবস্থা নেই। রাতে থাকতে গেলেও সমস্যায় পড়তে হয়। এ বিষয়ে বাজার কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
ধর্ম-বর্ণের সীমানা ছাড়িয়ে সম্প্রীতির মিলনমেলা
ঢাকের হাট এখন আর শুধু সনাতন ধর্মাবলম্বীদের আয়োজন নয়; এটি হয়ে উঠেছে বিভিন্ন ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে এক সর্বজনীন মিলনমেলা। বাদ্যযন্ত্রের সুর উপভোগ করতে স্থানীয় বাসিন্দাদের পাশাপাশি বিভিন্ন এলাকা থেকে ছুটে আসেন দর্শনার্থীরা। ঢাক-ঢোলের সম্মিলিত বাদ্য আর শিল্পীদের পরিবেশনায় পুরো হাট পরিণত হয় এক উৎসবের প্রাঙ্গণে।
কটিয়াদী পৌর এলাকার বাসিন্দা রতন কুমার সাহা বলেন, দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব হলেও ঢাকের হাটটি সার্বজনীন। এখানে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের মিলন ঘটে। এখানকার এই সম্প্রীতির ঐতিহ্য অনেক পুরোনো।
পাঁচ শতাব্দীর ঐতিহ্যের পেছনের ইতিহাস
স্থানীয় জনশ্রুতি রয়েছে, প্রায় ৫০০ বছর আগে ষোড়শ শতাব্দীর প্রথম ভাগে সামন্ত রাজা নবরঙ্গ রায়ের সময় কটিয়াদীর ঢাকের হাটের সূচনা হয়। রাজা কটিয়াদীর চারিপাড়ায় তার রাজপ্রাসাদে দুর্গাপূজার আয়োজন করতেন। পূজায় ঢাক, ঢোল ও বাঁশি বাজানোর জন্য সেরা শিল্পীদের খুঁজতে বিক্রমপুর পরগনায় বার্তা পাঠানো হয়। সেই আহ্বানে বহু বাদ্যযন্ত্রশিল্পী নৌপথে কটিয়াদীতে আসেন। রাজা নিজে তাদের বাজনা শুনে সেরা দল বেছে নেন। সেই থেকেই দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে কটিয়াদী পুরান বাজারে এই হাট বসার প্রচলন শুরু হয় বলে জনশ্রুতি রয়েছে।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন শ্রীমা সংঘ হাটটির তত্ত্বাবধান করে। সংগঠনটির সাধারণ সম্পাদক জীবন কুমার সাহা বলেন, রাজা নবরঙ্গ রায়ের আমল থেকেই এই ঐতিহ্যের যাত্রা। হাটে আসা বাদকদের থাকা-খাওয়া, নিরাপত্তা ও প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার চেষ্টা করে সংগঠনটি। কোনো বাদকদল ভাড়ায় যেতে না পারলে তাদের বাড়ি ফেরার ব্যবস্থাও করা হয়।
মোবাইল ফোনে চুক্তি, কমছে ঢাকিদের আগমন
ঐতিহ্যবাহী এ হাটে আগের তুলনায় ঢাকিদের আগমন কমেছে বলে জানিয়েছেন আয়োজক, স্থানীয় বাসিন্দা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা। তাদের মতে, মোবাইল ফোনে যোগাযোগের সুযোগ বাড়ায় এ পরিবর্তন এসেছে।
হাটে এসে একবার চুক্তিবদ্ধ হওয়ার পর পূজা আয়োজক ও বাদকদলের মধ্যে মুঠোফোনে যোগাযোগের তথ্য বিনিময় হয়। পরবর্তী সময়ে কোনো দলের পরিবেশনা ভালো লাগলে আয়োজকেরা সরাসরি ফোন করে সেই দলের সঙ্গে দরদাম ও চুক্তি করেন। ফলে উভয় পক্ষেরই পরের বছর হাটে আসার প্রয়োজন কমে যায়।
হবিগঞ্জ সদর থেকে ঢাকের হাটে আসা ঢাকি শ্রী বলরাম পণ্ডিত বলেন, তার একই এলাকার দুটি দল এবার হাটে আসার প্রস্তুতি নিয়েছিল। কিন্তু রওনা হওয়ার কিছুক্ষণ আগে গত বছরের আয়োজকেরা ফোন করে দল দুটিকে চুক্তিবদ্ধ করেন। ফলে তাদের আর হাটে আসা হয়নি। তিনি বলেন, অতীতে এই হাটে যতসংখ্যক ঢাকির সমাগম হতো, বর্তমানে তা অনেকটাই কমে এসেছে। এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘এখন তো মানুষ মোবাইল ফোনেই অনেক প্রয়োজন মিটিয়ে ফেলেন। ফলে আগের মতো ঢাকিদের খোঁজে হাটে আসার প্রবণতাও তুলনামূলকভাবে কমেছে। তারপরেও এখানে যে পরিমাণ লোকের সমাগম ঘটে সেটা অন্য কোথাও দেখা যায় না। এমন ঢাকের হাট আরও কোথাও নেই বলেও জানান তিনি।
একই কথা জানিয়েছেন কটিয়াদী পুরান বাজার পরিচালনা কমিটির সদস্য রতন কুমার সাহা। তিনি বলেন, গত বছর হাটে আসা অনেক ঢাকির সঙ্গে এবার মুঠোফোনেই চুক্তি হয়ে গেছে। এ কারণে তাদের কেউ কেউ এবার হাটে আসেননি।
নাম ঢাকের হাট, কেনা-বেচা হয় না বাদ্যযন্ত্র
নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে ঢাক-ঢোল কিংবা অন্য কোনো বাদ্যযন্ত্র কেনা-বেচা হয় না। বরং বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা তাদের দক্ষতা ও পরিবেশনা তুলে ধরেন, আর পূজা আয়োজকেরা বাজনা শুনে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য তাদের সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হন। দলের সদস্যসংখ্যা, বাদ্যযন্ত্রের ধরন ও শিল্পীদের দক্ষতার ওপর নির্ভর করে নির্ধারিত হয় সম্মানীর পরিমাণ।
কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামীমা আফরোজ মারলিজ এশিয়া পোস্টকে বলেন, বিক্রমপুর, কুমিল্লা, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর ও নরসিংদী, হবিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে বাদকদল হাটে এসেছেন। ঢাক-ঢোলের পাশাপাশি বাঁশি, সানাই, করতাল, খঞ্জনি, মন্দিরা, ঝনঝনিসহ বিভিন্ন আধুনিক বাদ্যযন্ত্রও নিয়ে এসেছেন তারা।
তিনি বলেন, হাটের নাম ঢাকের হাট হলেও এখানে কোনো বাদ্যযন্ত্র বিক্রি হয় না। নির্দিষ্ট সময়ের জন্য চুক্তি করে বাদ্যযন্ত্রশিল্পীরা পূজামণ্ডপে বাজাতে যান। অনেকে দুইদিন আগেই হাটে এসে উপস্থিত হয়েছেন।
কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জালাল উদ্দিন এশিয়া পোস্টকে বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে এই ঐতিহ্যবাহী হাট এখন কেবল বাদ্যযন্ত্রশিল্পীদের চুক্তির জায়গা নয়, বরং দুর্গোৎসবের অবিচ্ছেদ্য অংশ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ঢাকিদের পদচারণা, শত শত ঢাক-ঢোলের সম্মিলিত বাদ্য আর শিল্পীদের পরিবেশনায় হাটটি উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ঢাকিদের সুবিধার্থে হাটের উন্নয়নমূলক কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এবার তাঁরা এসব সুবিধা ভোগ করতে না পারলেও আগামীতে পারবেন বলে আশা করা হচ্ছে। শত শত বছরের এই ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখতে সর্বাত্মক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
