চাঁদপুরের ৬৪২ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নেই প্রধান শিক্ষক, ব্যাহত পাঠদান

চাঁদপুর জেলার ১ হাজার ১৫৬টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৪২টিতেই নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। ফলে অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয় চলছে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক কার্যক্রম, সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষার মানে চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
জেলা ও উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, পদ শূন্য থাকায় সহকারী শিক্ষকরাই ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এতে একদিকে দাপ্তরিক দায়িত্ব, অন্যদিকে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান—দুই ধরনের কাজ একসঙ্গে সামলাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন তারা। ফলে শিক্ষার্থীদের শিক্ষাদান ব্যাপকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
সবচেয়ে সংকটাপন্ন অবস্থায় রয়েছে চরাঞ্চল অধ্যুষিত মতলব উত্তর উপজেলা। উপজেলা শিক্ষা অফিস সূত্র জানায়, সেখানকার ১৮০টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১১৭টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। এছাড়া দীর্ঘদিন ধরে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পদটিও শূন্য। সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার পাঁচটি পদের মধ্যে তিনটিই খালি থাকায় মাত্র দুজনকে দিয়ে পুরো উপজেলার প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
১৪টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত মতলব উত্তর উপজেলার এসব বিদ্যালয়ে বর্তমানে সাড়ে ২১ হাজার থেকে ২৫ হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করছে। প্রয়োজনীয় জনবলের অভাবে বিদ্যালয় তদারকি, দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা ও শিক্ষার গুণগত মান ধরে রাখতে হিমশিম খেতে হচ্ছে প্রশাসনকে। অন্যদিকে মতলব দক্ষিণ উপজেলার ১১৩টি বিদ্যালয়ের মধ্যে ৪০টিতেই প্রধান শিক্ষক নেই। জেলার অন্যান্য উপজেলাগুলোতেও চিত্র একই।
অভিভাবকদের অভিযোগ, একজন সহকারী শিক্ষক যখন ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পান, তখন তাকে দাপ্তরিক কাজ, অভিভাবকদের সঙ্গে সমন্বয়সহ নানা প্রশাসনিক কাজ সামলাতে হয়। ফলে তিনি নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারেন না। এতে পাঠদানে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে এবং স্বাভাবিক শিক্ষার পরিবেশ বিঘ্নিত হচ্ছে। তারা দ্রুত সব শূন্য পদে প্রধান শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান।
মতলব উত্তরের ১০০ নম্বর চরকালিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক আব্দুস সাত্তার জানান, গত ছয় বছর ধরে তাদের বিদ্যালয়ে নিয়মিত প্রধান শিক্ষক নেই। দাপ্তরিক কাজের ব্যস্ততার কারণে তার পক্ষে নিয়মিত ক্লাস পরিচালনা করা সম্ভব হয় না।
মতলব উপজেলা প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক সমিতির সভাপতি দেওয়ান আবুল খায়ের মোহাম্মদ বাহা উদ্দিন জানান, প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তা স্বল্পতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে এ উপজেলায় শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
ফরিদগঞ্জ উপজেলার বালিথুবা ইউনিয়নের রাজাপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলামও একই শঙ্কার কথা জানান। তিনি বলেন, ভারপ্রাপ্ত দায়িত্বের কারণে নিয়মিত শ্রেণির কাজে মনোযোগ দিতে পারছি না। এতে মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। সরকার দ্রুত নিয়োগ দিলে শিক্ষার মান উন্নত হবে।
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির কেন্দ্রীয় সহ-সম্পাদক মো. জাকির হোসেন বলেন, মন্ত্রণালয় থেকে ইতোমধ্যে গ্রেডেশন তালিকা প্রস্তুতের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তালিকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে জমা দেওয়ার পর শূন্য পদ পূরণের কার্যক্রম শুরু হবে।
আইনি জটিলতার কথা উল্লেখ করে মতলব উত্তর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত শিক্ষা কর্মকর্তা জামাল হোসেন বলেন, সহকারী শিক্ষকদের পদোন্নতির মাধ্যমে ৬৫ শতাংশ প্রধান শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ রয়েছে। এতদিন আইনি জটিলতার কারণে নিয়োগ বন্ধ থাকলেও বর্তমানে তার অবসান হয়েছে। আশা করছি অচিরেই এ সংকট দূর হবে।
এ বিষয়ে চাঁদপুর জেলা ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মুহাম্মদ মোছাদ্দেক হোসেন জানান, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী শিক্ষকদের গ্রেডেশন তালিকা প্রস্তুতের কাজ চলছে। আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই জেলার শূন্য পদগুলো পূরণের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
.png)


