চালু হচ্ছে ১৬ বছর ধরে বন্ধ ফেনীর দোস্ত টেক্সটাইল মিল

ফেনী সদর উপজেলার কাজিরবাগ এলাকার ঐতিহ্যবাহী ‘দোস্ত টেক্সটাইল মিলস’ দীর্ঘ ১৬ বছর ধরে বন্ধ রয়েছে। সরকারি-বেসরকারি টানাপোড়েন, অবহেলা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবেই মিলটি এতদিন ধরে অবহেলায় পড়ে ছিল। অবশেষে রাষ্ট্রীয় এই সম্পদ পুনরায় চালু বা সেখানে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
১৯৬৫ সালে স্থানীয় বেকারত্ব দূর করা ও অর্থনীতিকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে ফেনী সদর উপজেলার রানীরহাটে ২১ দশমিক ৪৭ একর জমির ওপর ব্যক্তিগত উদ্যোগে গড়ে ওঠে দোস্ত টেক্সটাইল মিলস। ১৯৭২ সালে এটি জাতীয়করণ করা হয় এবং ১৯৮১ সাল পর্যন্ত লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে এখান থেকে বিদেশে সুতা রপ্তানি করা হতো। তবে চাহিদা অনুযায়ী আধুনিকায়ন না করায় ১৯৯৩ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি লোকসানে পড়ে। অবশেষে ২০১১ সালে এটি স্থায়ীভাবে বন্ধ ঘোষণা করা হয়।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, এক সময়ের কর্মমুখর বিশাল কারখানা প্রাঙ্গণ এখন ঝোপঝাড় ও আগাছার দখলে। ভেতরের ভারী যন্ত্রপাতি, সুতা তৈরির সরঞ্জাম ও বিশাল শেডগুলো অযত্নে খসে পড়ছে। সীমানা প্রাচীর ভেঙে যাওয়ায় নিয়মিত চুরি যাচ্ছে লোহালক্কড় ও দামি মালামাল। এ ছাড়া পরিত্যক্ত এই বিশাল চত্বর সন্ধ্যার পর মাদকসেবী ও বখাটেদের আখড়ায় পরিণত হয়।
বিগত সরকারের সময়ে ২০২২ সালের ১৫ জুন দোস্ত টেক্সটাইল মিল চালুর বিষয়ে ফেনী সার্কিট হাউসে পরামর্শমূলক কর্মশালার আয়োজন করে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের অধীন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশন (বিটিএমসি) ও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) কর্তৃপক্ষ। এতে প্রশাসনের কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী নেতা ও সাংবাদিকরা অংশ নেন।
কর্মশালায় প্রধান অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস করপোরেশনের (বিটিএমসি) চেয়ারম্যান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. জাকির হোসেন। সে সময় তিনি জানিয়েছিলেন, ২১ দশমিক ৫৫ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত টেক্সটাইল মিলটি চালু করতে শিগগিরই দরপত্র আহ্বান করা হবে। এ জন্য তিনি ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান। কিন্তু এরপর পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও রহস্যজনক কারণে দরপত্রটি আর আলোর মুখ দেখেনি।
তবে সম্প্রতি কাজিরবাগ দোস্ত টেক্সটাইল মিলস লিমিটেড পুনরায় চালু অথবা সেখানে নতুন আধুনিক শিল্পপ্রতিষ্ঠান স্থাপনের বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গত ২৩ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের প্রটোকল অফিসার-১ ও ‘সংসদ সদস্যগণের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশিত কর্মসূচি বাস্তবায়ন সমন্বয় সেল’-এর সদস্য সচিব মো. উজ্জ্বল হোসেন স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়।
চিঠি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৮ আগস্ট ফেনী-২ আসনের সংসদ সদস্য জয়নাল আবেদীন বন্ধ থাকা দোস্ত টেক্সটাইল মিলটি চালু করা কিংবা ওই জায়গায় নতুন টেকসই টেক্সটাইল বা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি আধা-সরকারি (ডিও) পত্র পাঠান।
আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের সচিবকে বিধিমোতাবেক পরবর্তী প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে নেওয়া পদক্ষেপের অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানোর জন্য নির্দেশক্রমে অনুরোধ করা হয়। চিঠির অনুলিপি সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরেও পাঠানো হয়েছে।
দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা টেক্সটাইল মিলটি নিয়ে নতুন করে উদ্যোগ নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে আশা জাগছে। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, কারখানাটি পুনরায় চালু হলে কিংবা সেখানে নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠলে ফেনীতে বড় ধরনের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে এবং সার্বিক অর্থনীতিতে নতুন গতি আসবে। এ বিষয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মহলের সুদৃষ্টি কামনা করেছেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ ছাড়া কথা বলতে রাজি হননি দোস্ত টেক্সটাইল মিলের নতুন নির্বাহী পরিচালক বুলবুল আহমেদ। দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষার পর তার নিরাপত্তাকর্মীর মাধ্যমে চলে যেতে বলা হয়।
ফেনীর জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাহবুবুল করিম এশিয়া পোস্টকে বলেন, দোস্ত টেক্সটাইল মিলে নতুন একজন কর্মকর্তা দায়িত্ব পেয়েছেন। তিনি আমার সঙ্গে দেখা করে গেছেন। শুধু পরিচিত হয়েছেন, ব্যস এতটুকু। মিলটি চালু হওয়া বা না হওয়ার বিষয়ে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আমাকে কিছুই জানানো হয়নি। যদি এ রকম কিছু জানতে পারি, তাহলে অবশ্যই আপনাদের মাধ্যমে ফেনীবাসীকে জানানো হবে।
ফেনী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সহসভাপতি ও ফেনী সদর উপজেলা বিএনপির সদস্যসচিব আমান উদ্দিন কায়সার সাব্বির এশিয়া পোস্টকে বলেন, মিলটি চালু হওয়ার বিষয়ে দীর্ঘদিনের একটি জনদাবি রয়েছে। আমাদের সংসদ সদস্যের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সেখানে জনবলসহ প্রাথমিক কার্যক্রম শুরু হয়েছে বলে শুনেছি। যদি মিলটি চালু হয়, তাহলে আমাদের এ অঞ্চলে বহু লোকের কর্মসংস্থান হবে। ফেনীর মর্যাদা দেশে আরও উন্নত হবে।



