logo
Advertisement

কুষ্টিয়ায় ৯ দিনে বিড়ালের আঁচড়ে র‍্যাবিসের টিকা নিলেন অন্তত ১১০০ জন

এশিয়া পোস্ট নিউজ, কুষ্টিয়া
কুষ্টিয়ায় ৯ দিনে বিড়ালের আঁচড়ে র‍্যাবিসের টিকা নিলেন অন্তত ১১০০ জন
কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে টিকা নিতে আসা মানুষের ভিড়। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সংসারের বাড়তি আনন্দ আর একাকিত্বের সঙ্গী হিসেবে কুষ্টিয়ায় আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পেয়েছে শখের বিড়াল পালনের প্রবণতা। কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত ১৭ থেকে ২৫ আগস্ট পর্যন্ত মাত্র নয় দিনে ৪৬১টি শিশি থেকে ১ হাজার ৮৪৪ জন মানুষ বিড়ালসহ অন্যান্য পশুর কামড় ও আঁচড়ে আক্রান্ত হয়ে জলাতঙ্ক প্রতিরোধী (র‍্যাবিস) টিকা ও চিকিৎসা নিয়েছেন।

Advertisement

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, আক্রান্ত এই ১ হাজার ৮৪৪ জনের মধ্যে অন্তত দুই-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ১১০০ জনেরও বেশি মানুষ সরাসরি বিড়ালের আঁচড় ও কামড়ের শিকার হয়ে হাসপাতালে এসেছেন। এ ছাড়া কুকুরসহ অন্যান্য প্রাণীর আক্রমণের শিকার হয়েও চিকিৎসা নিতে আসছেন অনেকে।

কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. ইকবাল হোসেন এশিয়া পোস্টকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

হাসপাতালের এই পরিসংখ্যান সামনে আসার পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে কুষ্টিয়ায় পোষা বিড়াল পালনের প্রবণতা।

বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) বেলা ১১টায় সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের জলাতঙ্ক নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রে দীর্ঘ লাইন। সবাই অপেক্ষা করছেন টিকা নেওয়ার জন্য, যাদের অধিকাংশেরই আক্রান্ত হওয়ার কারণ বিড়ালের আঁচড় ও কামড়।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছে, বিড়ালের আঁচড় বা কামড়ের চিকিৎসার জন্য প্রতিদিন ২০০ থেকে ২৫০ জন মানুষ এই টিকা নিচ্ছেন।

এদিকে শহরের জেলখানার মোড়, পৌরসভার আশপাশসহ বিভিন্ন এলাকায় গত এক থেকে দুই বছরের মধ্যে গড়ে উঠেছে একাধিক পেট কেয়ার বা পোষা প্রাণীর পরিচর্যাসামগ্রীর দোকান। এসব দোকানে বিড়ালের খাবার, বালু, শ্যাম্পু, ওষুধসহ নানা ধরনের সামগ্রী পাওয়া যাচ্ছে।

দোকানিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিশেষ করে তরুণ-তরুণীদের মধ্যে বিড়াল পালনের আগ্রহ বেড়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বয়সী মানুষ অনেকেই শখের পাশাপাশি ঘরের সঙ্গী হিসেবে বিড়াল পালন করছেন। তবে এর বিপরীত চিত্রও রয়েছে; বিড়াল আঁচড় দিলে জলাতঙ্কের আশঙ্কায় অনেকে আতঙ্কিত হয়ে পড়ছেন।

সম্প্রতি কুষ্টিয়ার ভেড়ামারায় পোষা বিড়ালের আঁচড়ের পর পাঁচ বছর বয়সী এক শিশুর অস্বাভাবিক আচরণের একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। শিশুটিকে ‘মিউ মিউ’ শব্দ করতে দেখা যায়। ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়।

শিশুটির অস্বাভাবিক আচরণ নিয়ে সর্বপ্রথম বিস্তারিত সংবাদ প্রকাশ করে জনপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল এশিয়া পোস্ট। এরপর মুহূর্তেই প্রতিবেদনটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা শুরু হয়। পরে অন্যান্য গণমাধ্যমেও ঘটনাটি গুরুত্ব পায়।

ওই ঘটনার পর বিড়াল পালন, বিড়ালের আঁচড় এবং জলাতঙ্কের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে সচেতনতা তৈরি হয়েছে।

পশুপ্রেমীরা বলছেন, বিড়াল পালন নিয়ে আতঙ্ক ছড়ানোর চেয়ে দায়িত্বশীলভাবে প্রাণী পালনের বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা জরুরি। নিয়মিত টিকা, পরিচ্ছন্নতা ও প্রাণীর স্বাভাবিক আচরণ সম্পর্কে ধারণা থাকলে ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব।

হাউজিং সি-ব্লকের বিড়াল পালনকারী কৌশিক বলেন, বিড়াল এখন অনেক পরিবারেরই পোষা প্রাণী। তাই আতঙ্কিত হয়ে বিড়াল ফেলে না দিয়ে বরং নিয়মিত টিকা ও পরিচর্যার বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া উচিত। শিশুদের সঙ্গে পোষা প্রাণী থাকলে বড়দেরও নজর রাখা দরকার।

অন্যদিকে কাস্টম মোড়ের বাসিন্দা রাজিব বলেন, বিড়াল পালনের আগে এর ঝুঁকি সম্পর্কে জানা দরকার। বিশেষ করে আঁচড় বা কামড়ের পর কী করতে হবে, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন হওয়া উচিত।

শহরের বাসিন্দাদের মধ্যেও এ বিষয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ বলছেন, বিড়াল পালন পরিবারের জন্য আনন্দের এবং শিশুদের মনেও প্রাণীর প্রতি মমত্ববোধ তৈরি করে। আবার কেউ মনে করছেন, ছোট শিশু থাকলে পোষা প্রাণী পালনে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন।

বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশনের (বিবিসিএল) সহসভাপতি শাহাবুদ্দিন মিলন বলেন, "বিড়াল বা অন্য প্রাণীকে শুধু ঝুঁকির চোখে দেখলে হবে না। প্রাণীটির যথাযথ পরিচর্যা, টিকাদান এবং মানুষের সচেতনতা নিশ্চিত করতে হবে। কোনো প্রাণী আঁচড় বা কামড় দিলে দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়েও প্রচার বাড়ানো প্রয়োজন।

সব মিলিয়ে কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের নয় দিনের পরিসংখ্যান বলছে, প্রাণীর আঁচড়-কামড়ের পর চিকিৎসা নিতে আসা মানুষের সংখ্যা কম নয়। তবে চিকিৎসক ও পশুপ্রেমীদের মতে, এতে বিড়াল পালনকে নিরুৎসাহিত করার চেয়ে প্রয়োজন দায়িত্বশীলভাবে প্রাণী পালন এবং আঁচড়-কামড়ের পর দ্রুত চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো।

কুষ্টিয়া সদর হাসপাতালের আরএমও ডা. ইকবাল হোসেন এশিয়া পোস্টকে বলেন, আমরা পোষা প্রাণী পালনে নিরুৎসাহিত করছি না। তবে বিড়াল বা অন্য কোনো প্রাণীর আঁচড় কিংবা কামড়কে হালকা করে দেখার সুযোগ নেই। চিকিৎসকের নির্দেশনামতো ক্ষতস্থান পরিষ্কার করতে হবে। ক্ষত ধোয়ার পদ্ধতি সঠিক না হলে র‍্যাবিসে আক্রান্ত হওয়া বা আরও বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

বিষয় :