তাহিরপুরে হাওরাঞ্চলে আছে শিক্ষকশূন্য প্রাথমিক স্কুল, আবার কোথাও পরিপূর্ণ

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার হাওরাঞ্চলের দুর্গম এলাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘ দিন ধরে শিক্ষক সংকট ও পদশূন্যতা চলছে। কোনো কোনো বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক দিয়ে পাঠদান কার্যক্রম চলছে, আবার কোথাও শিক্ষক না থাকায় পাশের বিদ্যালয় থেকে অস্থায়ীভাবে শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় খোলা ও শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হচ্ছে। বিপরীতে যোগাযোগব্যবস্থা ভালো ও সুবিধাজনক এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষক পরিপূর্ণ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বদলির সুযোগ এলে অনেক শিক্ষক দুর্গম এলাকার বিদ্যালয় থেকে সুবিধাজনক স্থানে বদলি হয়ে যাওয়ায় সংকট প্রকট হচ্ছে। দুর্গম হাওরাঞ্চলের শিক্ষার্থীরা মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
জেলা শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়, তাহিরপুর উপজেলার সাতটি ইউনিয়নে মোট ১৩৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় রয়েছে। এসব বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের ১৩৪টি এবং সহকারী শিক্ষকের ৬৮৯টি পদ রয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে প্রধান শিক্ষক কর্মরত আছেন ৯২জন এবং সহকারী শিক্ষক রয়েছেন ৫৬৬ জন। ফলে প্রধান শিক্ষকের ৪২টি এবং সহকারী শিক্ষকের ১২৩টি পদ শূন্য রয়েছে।
১ অক্টোবর প্রাথমিকের সহকারী শিক্ষক নিয়োগ কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ায় এ উপজেলার ৪৯ জন শিক্ষক জেলা শিক্ষা অফিসে যোগদান করেছেন। আগামী ১১ অক্টোবর উপজেলার বিভিন্ন বিদ্যালয়ে তাদের পদায়নের আদেশ জারি হবে বলে জানা গেছে।
সংকট-সমস্যা কোথায়, কী
সরেজমিন তথ্য বলছে, উপজেলার সাতটি ইউনিয়নের মধ্যে তাহিরপুর সদর, বাদাঘাট, বালিজুরী ও উত্তর বড়দল ইউনিয়নের যেসব বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যবস্থা তুলনামূলকভাবে ভালো, সেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক পদশূন্যতার চিত্র কম। অনেক বিদ্যালয়ে প্রয়োজনীয় সংখ্যক শিক্ষক কর্মরত রয়েছেন।
হাওরবেষ্টিত দক্ষিণ শ্রীপুর, উত্তর শ্রীপুর ও দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ও দুর্গম এলাকার বিদ্যালয়গুলোতে দেখা দিয়েছে তীব্র শিক্ষক সংকট। এসব বিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন ধরে প্রধান ও সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে পাঠদান কার্যক্রম।
সম্প্রতি প্রতিস্থাপন সাপেক্ষে বদলি হওয়ার পর উপজেলার দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের শরীফপুর রাধাচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে কোনো শিক্ষক নেই। অন্য দুটি বিদ্যালয় থেকে দুইজন শিক্ষক দিয়ে বিদ্যালয় খোলা ও শিক্ষার্থীদের হাজিরার বিষয়টি দেখা হচ্ছে। দক্ষিণ বড়দল ইউনিয়নের পুরান খালাস সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে থাকা দুইজন শিক্ষক সুবিধাজনক স্থানে বদলির আদেশ পেয়েছেন।
উপজেলার উত্তর শ্রীপুর ইউনিয়নের শিবরামপুর, মন্দিয়াতা, জয়পুর, বাঁশতলা ও মনভোজ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দক্ষিণ শ্রীপুর ইউনিয়নের উক্তিয়ারগাঁও, কলাপাড়া ও মাহমুদপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় এবং উত্তর বড়দল ইউনিয়নের মাহরাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বর্তমানে একজন করে শিক্ষক রয়েছেন।
পরামর্শ, সমাধানের পথ
মন্দিয়াতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সানজু মিয়া বলেন, আমার বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকসহ পাঁচটি পদ রয়েছে। ১২ বছর ধরে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য। আমার বাড়ি কাছে হওয়ায় অনেক দিন ধরে আমি দায়িত্ব পালন করছি। অনেক সময় অন্য কোনো শিক্ষক থাকে না। আমি একাই প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব ও পাঠদান কার্যক্রম চালিয়েছি।
তিনি বলেন, মাঝেমধ্যে কাউকে পোস্টিং বা ডেপুটেশনে পদায়ন করা হলে তিনিও কোনো না কোনোভাবে বদলি হয়ে যান। বর্তমানে যিনি রয়েছেন তিনিও বদলির আদেশপ্রাপ্ত। নতুন শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে আমার বিদ্যালয়ে জরুরি ভিত্তিতে পর্যাপ্ত শিক্ষক প্রয়োজন।
শরীফপুর রাধাচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করছেন মোয়াজ্জেমপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক প্রীতম সরকার ও মানিকখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মিলন তালুকদার।
প্রীতম সরকার বলেন, শরীফপুর রাধাচরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে কোনো শিক্ষক না থাকায় উপজেলা শিক্ষা অফিসার আমাদের দুইজনকে বিদ্যালয়টি খোলা ও শিক্ষার্থীদের হাজিরা নিশ্চিত করার দায়িত্ব দিয়েছেন। আমরা দুইজন মিলে সমন্বয় করে দায়িত্ব পালন করি। বিদ্যালয়ে শিক্ষক না থাকায় শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির সংখ্যা কমে গেছে। অনেক শিক্ষার্থী কাজে লিপ্ত হয়ে গেছে। বিদ্যালয়টি সচল করতে শিক্ষক প্রয়োজন।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কমিটির সদস্য ও মধ্য তাহিরপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক শাখাওয়াত হোসেন পাটোয়ারী বলেন, দুর্গম এলাকা থেকে বদলি হয়ে সুবিধাজনক বিদ্যালয়ে আসার কারণে দুর্গম এলাকার শিশুরা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
সুনামগঞ্জ জেলা সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সাধারণ সম্পাদক ফজলুল করিম সাঈদ বলেন, নতুন নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে হাওরাঞ্চলে শিক্ষার বিষয়টি মাথায় রেখে পদায়ন করা প্রয়োজন। দুর্গম এলাকায় পদায়ন করা হলেও ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা আছে এমন স্কুলে তারা চলে আসেন।
তিনি বলেন, এমন অনেক স্কুল আছে যেখানে একজন শিক্ষক কর্মরত আছেন। শিক্ষার মানোন্নয়নে দুর্গম এলাকায় শিক্ষকরা যেন থাকতে পারেন, সেজন্য তাদের সুযোগ-সুবিধা বিশেষ করে যাতায়াত, আবাসন ও হাওর ভাতার ব্যবস্থা বিবেচনায় রাখা উচিত। হাওর পাড়ের মানুষের শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের স্বার্থে শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সবাইকে হাওর রেশনিংয়ের আওতায় আনা জরুরী।
আনোয়ারপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সদ্য অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক গোলাম সরোয়ার লিটন বলেন, নতুন শিক্ষক নিয়োগ হয়েছে। যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক শূন্য ও সংকট রয়েছে, সেগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পদায়ন করা হোক।
উপজেলার ভারপ্রাপ্ত প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা রাজন কুমার সাহা বলেন, উপজেলা থেকে যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক সংকট রয়েছে, সেগুলো অগ্রাধিকার ভিত্তিতে জেলা শিক্ষা অফিসে চাহিদা পাঠিয়েছি। বাকিটা জেলা শিক্ষা অফিস বিবেচনা করবে।
সুনামগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোহনলাল বলেন, সহকারী শিক্ষক পদায়নের বিষয়টি আমাদের কমিটির মাধ্যমে করা হবে। যেসব বিদ্যালয়ে শিক্ষক শূন্য রয়েছে, সেসব বিদ্যালয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
