logo
Advertisement

মেহেরপুর থেকে কম্বোডিয়া/চাকরির লোভে পাচার ও নির্যাতন, ফিরে এসে প্রতারণার নতুন জাল

খান মাহমুদ আল রাফি
মেহেরপুর, খুলনা
চাকরির লোভে পাচার ও নির্যাতন, ফিরে এসে প্রতারণার নতুন জাল
(বাঁয়ে) কম্বোডিয়ায় পনম পেন শহর ও মানবপাচার চক্রের দুই মূল হোতা আলিফ ও বিপুল (ডানে)। ছবি: এশিয়া পোস্ট কোলাজ

ভালো চাকরি, মাসে মোটা বেতন, অফিসে কম্পিউটারে কাজ—এমন স্বপ্ন দেখিয়ে মেহেরপুর থেকে একের পর এক মানুষকে কম্বোডিয়ায় নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে কেউ প্রতারণার শিকার হচ্ছেন, কেউ আটকে থেকে নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। আবার কাউকে অর্থের বিনিময়ে অন্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে।

মেহেরপুর পৌর এলাকার ফাহাদের ঘটনা এর অন্যতম উদাহরণ। ভালো চাকরির আশায় কম্বোডিয়ায় পাড়ি দিয়ে আট মাস ধরে দেশটির কারাগারে বন্দি রয়েছেন তিনি। ছেলেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে গিয়ে প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ করে নিঃস্বপ্রায় হয়ে পড়েছেন তার বাবা ফারুক কসাই। শেষ পর্যন্ত ছেলেকে ফেরাতে তিনি ব্র্যাক মাইগ্রেশন সাপোর্ট সেন্টারের সহযোগিতা নিচ্ছেন।

ফারুকের অভিযোগ, মেহেরপুর সদর উপজেলা এলজিইডির কার্যালয়ের অফিস সহকারী নূর ইসলামের ছেলে বিপুলের মাধ্যমে ফাহাদকে কম্বোডিয়ায় পাঠানো হয়। কম্পিউটারে অফিসের কাজ দেওয়ার কথা বলে টাকা নেওয়া হলেও সেখানে গিয়ে তার ছেলে প্রতারণার শিকার হন।

ফারুক এশিয়া পোস্টকে বলেন, নূর ইসলাম আমাকে বলেছিল, তোমার ছেলেকে দাও। আমার ছেলে কম্বোডিয়ায় রয়েছে। সেখানে ভালো চাকরি দেব, অফিসিয়াল চাকরি, কম্পিউটারে কাজ করবে। তার কথায় বিশ্বাস করে ছেলেকে পাঠাই। এখান থেকে টাকা নিয়েছে নূর ইসলাম। আর কম্বোডিয়ায় গিয়ে আমার ছেলেকে বিক্রি করে দিয়েছে বলে জানতে পেরেছি।

তিনি বলেন, আমার ছেলে এখন আট মাস ধরে কম্বোডিয়ার জেলে। বিভিন্ন মাধ্যমে তাকে ছাড়ানোর চেষ্টা করেছি। একেক সময় একেকভাবে টাকা খরচ হয়েছে। বিদেশে পাঠানোর পর থেকে এখন পর্যন্ত প্রায় ১৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। কিন্তু আমার ছেলে এখনও দেশে ফিরতে পারেনি।

সম্প্রতি একটি নম্বর থেকে ফোন করে এক ব্যক্তি নিজেকে কম্বোডিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কর্মকর্তা পরিচয় দিয়ে ফাহাদকে জেল থেকে ছাড়ানোর কথা জানান। দেশে ফেরাতে বিমানের টিকিটের টাকা চান তিনি। তবে কথোপকথনের একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যরা ফোনের অপর প্রান্তের কণ্ঠ ফাহাদের বলে শনাক্ত করেন।

ফাহাদকে দেশে ফেরাতে বিভিন্ন ব্যক্তির দ্বারস্থ হয়েও সফল হতে পারেননি বলে জানান তার বাবা। বর্তমানে তিনি ব্র্যাক মাইগ্রেশন সাপোর্ট সেন্টারের সহযোগিতা নিচ্ছেন।

শুধু ফাহাদ নন, মেহেরপুরের আরও কয়েকজন কম্বোডিয়ায় গিয়ে প্রতারণা ও নির্যাতনের অভিযোগ করেছেন।

মেহেরপুরের মুজিবনগর উপজেলার যতারপুর গ্রামের মো. সাইফুল জানান, রংমিস্ত্রির কাজের আশায় মেহেরপুর পৌর শহরের আলিফ নামের এক দালালের মাধ্যমে ৫ লাখ ৪০ হাজার টাকা খরচ করে কম্বোডিয়া যান তিনি। সেখানে মাসে ৬০ হাজার টাকা বেতন দেওয়ার কথা থাকলেও তাকে দুই হাজার ও তিন হাজার ডলারে দুইবার বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

সাইফুলের দাবি, দেশে ফেরার ইচ্ছা প্রকাশ করলে তাকে একটি ঘরে আটকে রেখে কিল-ঘুষি ও লাথি মারা হয়। পরে দেশে ফেরার আগে তার পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। সেখানে ভবিষ্যতে কোনো টাকা দাবি বা মামলা করবেন না—এমন কথা লেখা ছিল।

তার অভিযোগ, পরে আলিফের বোন তার বাড়িতে গিয়ে বাবা-মায়ের কাছ থেকে আরও ৫২ হাজার টাকা নেন। নানা টালবাহানার পর শেষ পর্যন্ত তাকে বিমানের টিকিট দেওয়া হয়।

কম্বোডিয়ায় প্রতারণার শিকার হয়ে আট মাসের বেশি সময় ধরে দেশটির কারাগারে বন্দি থাকা মেহেরপুরের মো. ফাহাদ হোসেনসহ (৫ নম্বর) আট বাংলাদেশি তরুণ। ছবি: এশিয়া পোস্ট
কম্বোডিয়ায় প্রতারণার শিকার হয়ে আট মাসের বেশি সময় ধরে দেশটির কারাগারে বন্দি থাকা মেহেরপুরের মো. ফাহাদ হোসেনসহ (৫ নম্বর) আট বাংলাদেশি তরুণ। ছবি: এশিয়া পোস্ট

সাইফুলের দাবি, তাকে যেখানে আটকে রাখা হয়েছিল, সেখানে মেহেরপুরের সাহারবাটি ও রায়পুর গ্রামের দুজনসহ চুয়াডাঙ্গা ও ঝিনাইদহের কয়েকজনকেও আটকে রাখা হয়েছিল। মেহেরপুরের এক নারীও তার সঙ্গে কম্বোডিয়া থেকে দেশে ফেরেন। উচ্চ বেতনে ক্যাসিনোতে মডেল হিসেবে কাজ দেওয়ার প্রলোভনে ওই নারীকে নেওয়া হয়েছিল বলে জানান তিনি।

ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের অভিযোগ, কম্বোডিয়ায় মানবপাচার ও নির্যাতনের ঘটনা নিয়ে থানায় গেলে কিছু পুলিশ কর্মকর্তা মামলা গ্রহণের পরিবর্তে সালিশ-মীমাংসার মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির চেষ্টা করেছেন।

অভিযোগ রয়েছে, মানবপাচারের অভিযোগ তদন্তের বদলে ব্যাংক চেকের মাধ্যমে টাকা ফেরতের ব্যবস্থা করে কয়েক মাস সময় দেওয়া হয়েছে। পরে চেক ডিজঅনার হলে ভুক্তভোগীদের চেক প্রতারণার মামলা করতে হচ্ছে। এতে মানবপাচারের মূল অভিযোগটি আড়ালে চলে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চেক ডিজঅনারের অভিযোগ

সম্প্রতি মেহেরপুর সদর উপজেলা এলজিইডি কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো. নূর ইসলামের বিরুদ্ধে কম্বোডিয়া থেকে ফেরত আসা এক যুবকের পাওনা টাকা আত্মসাতের অভিযোগে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে।

ভুক্তভোগী মো. মহির উদ্দিন শেখের পক্ষে মেহেরপুর জজকোর্টের আইনজীবী মো. রাশেদুল হক (জুয়েল) গত ৩১ আগস্ট নোটিশটি পাঠান।

নোটিশে বলা হয়, মহির উদ্দিনের ছেলে মুবিনকে অবৈধ উপায়ে কম্বোডিয়ায় পাঠানোর পর তিনি দেশে ফেরত আসেন। পরে পুলিশের মধ্যস্থতায় পাওনা ৮ লাখ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের জন্য নূর ইসলাম একটি ব্যাংক চেক দেন। সোনালী ব্যাংকের মেহেরপুর কোর্ট বিল্ডিং শাখায় চেকটি জমা দিলে ‘অপর্যাপ্ত তহবিল’ দেখিয়ে তা ডিজঅনার হয়।

নোটিশে ৩০ দিনের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করলে নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্টস অ্যাক্ট, ১৮৮১-এর ১৩৮ ধারায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।

ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, তারা মানবপাচারের অভিযোগ নিয়ে থানায় গেলে তৎকালীন সদর থানার এসআই জহুরুল ইসলাম মামলা গ্রহণের পরিবর্তে নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে উভয়পক্ষের মধ্যে মীমাংসা করান। পাওনা টাকা ফেরতের নিশ্চয়তা হিসেবে নেওয়া চেকটি পরে ডিজঅনার হয়।

কম্বোডিয়া থেকে ফিরে এসে নিজেরাই স্ক্যামিংয়ে জড়িয়ে পড়া জিহাদ ও আবির। ছবি: এশিয়া পোস্ট
কম্বোডিয়া থেকে ফিরে এসে নিজেরাই স্ক্যামিংয়ে জড়িয়ে পড়া জিহাদ ও আবির। ছবি: এশিয়া পোস্ট

বর্তমানে বামন্দী পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ হিসেবে কর্মরত জহুরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি একটি মীমাংসার ঘটনা ঘটেছিল বলে স্বীকার করেন। তবে সংবাদে তার নাম না দেওয়ার অনুরোধ করেন।

একপর্যায়ে তিনি এশিয়া পোস্টের প্রতিনিধিকে ব্যক্তিগতভাবে দেখা করার প্রস্তাব দেন এবং বলেন, আসো, ওয়াপদা মোড়ে একসঙ্গে চা খাই। আমি রওনা হয়েছি।

বিপুলের পরিবারের বক্তব্য

একাধিক অভিযোগ পাওয়ার পর এশিয়া পোস্ট মানবপাচারকারী হিসেবে অভিযুক্ত বিপুলের বাবা নূর ইসলামের বাড়িতে সরেজমিনে যায়। এ সময় বিপুলের বাবা ও মা প্রথমে কম্বোডিয়ায় লোক পাঠানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করেন। পরে তারা ভিন্ন ভিন্ন বক্তব্য দেন।

বিপুলের মা বলেন, তার ছেলে ১৫-১৬ জনকে বিদেশে পাঠিয়েছেন। তার বাবা বলেন, ৭-৮ জনকে পাঠানো হয়েছে। তবে দুজনই বলেন, নিজেদের বসতভিটার বাড়ি ও জমি বিক্রি করে ভুক্তভোগীদের টাকা ফেরত দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন তারা।

এদিকে বিপুলের বাড়িতে যাওয়ার খবর পেয়ে বিপুল নিজেই মেসেঞ্জারে এশিয়া পোস্টের প্রতিনিধিকে ফোন করেন। তিনি দাবি করেন, তিনি কোনো মানবপাচার করেননি। অন্যদের সাহায্য করতে গিয়ে তিনি এ অবস্থায় পড়েছেন।

নিজেকে কম্বোডিয়ার একজন হোটেল ব্যবসায়ী দাবি করে বিপুল আরও বলেন, যারা ভুক্তভোগী সেজে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ দিচ্ছে, তারা আমার হোটেলে থেকে লাখ লাখ টাকা খাবারের বাকি করে দেশে ফিরে গেছে।

বিপুলের দাবি, দেশে ফিরে আসা ওই ব্যক্তিরাই বাংলাদেশে বসে স্ক্যামিং পরিচালনা করছেন। প্রয়োজন হলে এ বিষয়ে সব তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করা সম্ভব বলেও জানান তিনি।

চাকরির বিজ্ঞাপন থেকে ‘স্ক্যাম সেন্টার’

মেহেরপুরের ভুক্তভোগীদের অভিযোগের সঙ্গে কম্বোডিয়ার বৃহত্তর মানবপাচার পরিস্থিতিরও মিল রয়েছে। দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ক্যাসিনো, হোটেল ও বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন প্রতারণার ‘স্ক্যাম সেন্টার’ গড়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।

জাতিসংঘের অপরাধ ও মাদকবিষয়ক দপ্তর এ ধরনের ঘটনাকে জোরপূর্বক অপরাধে মানবপাচার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। অর্থাৎ চাকরির প্রলোভনে বিদেশে নেওয়া ব্যক্তিদের অনেক সময় আটকে রেখে অনলাইন প্রতারণার মতো অপরাধমূলক কাজে বাধ্য করার অভিযোগ রয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উচ্চ বেতন, ভালো কর্মপরিবেশ, ডিজিটাল মার্কেটিং, কাস্টমার সার্ভিস বা কম্পিউটারভিত্তিক কাজের বিজ্ঞাপন দিয়ে লোক সংগ্রহের পর গন্তব্যে নিয়ে পাসপোর্ট কেড়ে নেওয়া, চলাফেরায় বাধা দেওয়া এবং নির্দিষ্ট কাজের টার্গেট দেওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিকভাবে নথিভুক্ত হয়েছে।

প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে আইনজীবী মো. রাশেদুল হক (জুয়েল) কর্তৃক অভিযুক্তকে পাঠানো আইনি নোটিশের কপি। ছবি: এশিয়া পোস্ট
প্রতারণার শিকার ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষে আইনজীবী মো. রাশেদুল হক (জুয়েল) কর্তৃক অভিযুক্তকে পাঠানো আইনি নোটিশের কপি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ফলে মেহেরপুরের ফাহাদ, সাইফুল কিংবা মুবিনের পরিবারের অভিযোগ শুধু বিচ্ছিন্ন প্রতারণার ঘটনা কি না, নাকি এর পেছনে একটি সংঘবদ্ধ মানবপাচার নেটওয়ার্ক কাজ করছে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে মেহেরপুর থেকে যাদের কম্বোডিয়ায় পাঠানো হচ্ছে, তাদের গন্তব্য কোথায়, কারা তাদের পাঠাচ্ছে এবং বিদেশে গিয়ে শেষ পর্যন্ত কাদের নিয়ন্ত্রণে পড়ছেন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে স্থানীয় দালালচক্র থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক পর্যন্ত তদন্ত প্রয়োজন।

কারণ, ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে উঠে আসা অভিযোগগুলো বলছে, বিদেশে ভালো চাকরির স্বপ্ন এখন অনেক পরিবারের জন্য ঋণ, নিঃস্বতা, নির্যাতন ও অনিশ্চয়তার দুঃস্বপ্নে পরিণত হচ্ছে।

কম্বোডিয়া থেকে ফিরে অপরাধের নতুন জাল

মেহেরপুর থেকে বিপুল, আলিফ ও ওয়ার্ড বিএনপি নেতা সানোয়ারের ছেলে জনির মাধ্যমে মানবপাচারের শিকার হয়েছেন জেলার কয়েকশ তরুণ। তাদের মধ্যে কয়েকজন তরুণ দেশে ফিরে নিজেরাই প্রতারণা ও সাইবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মেহেরপুরে এমন একটি চক্র খুলনার পুলিশ সুপার তাজুল ইসলামের পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদা দাবি ও প্রতারণা করতে গিয়ে ডিবি পুলিশের হাতে ধরা পড়েছে। গ্রেপ্তার আবির ও জিহাদের মধ্যে জিহাদ মানবপাচারের অভিযোগে অভিযুক্ত বিপুলের ছোট ভাই এবং মেহেরপুর সদর উপজেলা এলজিইডির অফিস সহকারী নূর ইসলামের ছেলে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, কম্বোডিয়ায় থাকা আবিরের মাধ্যমে বিপুল বাংলাদেশি সচল সিম সংগ্রহের পরিকল্পনা করেন। মেহেরপুরের সুজনের মাধ্যমে দুই সিম বিক্রেতার কাছ থেকে কৌশলে ১৮ ও ১২টি—মোট ৩০টি সিম সংগ্রহ করে তা জিহাদের কাছে দেওয়া হয়। এসব সিমের ওটিপি ব্যবহার করে কম্বোডিয়া থেকে বিপুল হোয়াটসঅ্যাপে বিভিন্ন ব্যক্তিকে কল ও বার্তা দিয়ে ভয়ভীতি দেখাতেন। আর দেশে থাকা সহযোগীরা ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করতেন।

এরই একটি সিম ব্যবহার করে খুলনার পুলিশ সুপারের পরিচয়ে চাঁদা দাবি করা হচ্ছিল। পরে তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ঘোষপাড়া থেকে জিহাদকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।

চক্রটির প্রতারণার শিকার আবিরও মানবপাচারের ভুক্তভোগী ছিলেন। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাকে ছয় লাখ টাকার বিনিময়ে কম্বোডিয়ায় বিক্রি করে দেওয়া হয়। পরে পরিবার বিষয়টি জানতে পেরে আরও তিন লাখ টাকা দিয়ে তাকে দেশে ফিরিয়ে আনে।

তবে দেশে ফিরেও থামেনি এই অপরাধের চক্র। অনুসন্ধানে মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গার জীবননগর, যশোর ও খুলনার বিভিন্ন এলাকায় কম্বোডিয়া-ফেরত কয়েকজনের মাধ্যমে স্ক্যাম সেন্টার পরিচালনার তথ্য পাওয়া গেছে। এসব কেন্দ্র থেকে ভুয়া পরিচয়ে ভয়ভীতি দেখানো, ফিশিং লিংকের মাধ্যমে মুঠোফোনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া, অর্থ আত্মসাৎ, ব্ল্যাকমেলিং এবং ‘পিগ বুচারিং’-এর মতো সংঘবদ্ধ সাইবার প্রতারণার অভিযোগও পাওয়া গেছে।

মেহেরপুর জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট আসাদুল আযম খোকন বলেন, গত এক বছর ধরে মেহেরপুর থেকে কম্বোডিয়ায় মানবপাচার ও প্রতারণার ঘটনাগুলো প্রকাশ্যে আসছে। চার-পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে চাকরির প্রলোভনে মানুষকে কম্বোডিয়ায় নিয়ে গিয়ে আটকে রাখা এবং নির্যাতনের ছবি-ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে টাকা আদায়ের ঘটনাও তার কাছে এসেছে।

তিনি বলেন, বিদেশে যাওয়ার আগে দালালের কথায় অন্ধবিশ্বাস না করে বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বা জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে ভিসা ও চাকরির সত্যতা যাচাই করা উচিত।

থানায় অভিযোগ নিয়ে গেলে মামলা না করে সালিশ করার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, মামলা না নিয়ে সালিশ করার এখতিয়ার পুলিশের নেই। আদালতের নির্দেশ ছাড়া মামলার বিকল্প হিসেবে পুলিশের এ ধরনের সালিশ করার কোনো আইনগত এখতিয়ার নেই।

মেহেরপুরের পুলিশ সুপার উজ্জ্বল কুমার রায় এশিয়া পোস্টকে বলেন, কম্বোডিয়ায় কাউকে আটকে রেখে নির্যাতন করা, শোষণ করা বা মুক্তিপণ দাবি করা হলে সেটি মানবপাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন আইন ২০২৬ অনুযায়ী অপরাধের আওতায় পড়ে।

তিনি বলেন, এসব ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীর পরিবারকে সংশ্লিষ্ট থানায় অভিযোগ দায়ের করার পরামর্শ দেওয়া হবে। অভিযোগ দায়ের হলে পুলিশ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।