logo

১ জোড়া মুরগির দাম লাখ টাকা

১ জোড়া মুরগির দাম লাখ টাকা

একটি ভালো জীবিকার সন্ধান ও পরিবারের আর্থিক অভাব-অনটন দূর করতে ইউরোপে যেতে চেয়েছিলেন ৪০ বছর বয়সী জাহাঙ্গীর হোসেন। দালালের খপ্পরে পড়ে ভারতে গিয়ে আটকা পড়েন। 

দীর্ঘদিন ভারতে চেন্নাইতে একটি মুরগির খামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন। সেখানে বিদেশি জাতের মুরগি পালনে আগ্রহ জন্ম নেয়। বাংলাদেশে ফিরে আসার সময় দুই জোড়া বিদেশি জাতের মোরগ-মুরগি উপহার নিয়ে আসেন।

এরপর গ্রামের বাড়িতে ফিরে শখের বশে বাড়ির উঠানে পালন শুরু করেন মুরগি। শখ থেকে নেশা, পরে বাণিজ্যিকভাবে পেশা হিসেবে গড়ে তোলেন বিদেশি জাতের মোরগ-মুরগির খামার। দিনে দিনে বিক্রি বাড়ছে তার। খামারের নাম দিয়েছেন ‘কালুখালী ফ্যান্সি মুরগির খামার’।

এখন তার খামারে বিদেশি মুরগি পালনের পাশাপাশি রয়েছে বিদেশি জাতের হাঁস, কোয়েল ও ময়ূর। এসব বিদেশি জাতের এক জোড়া মুরগির দাম লাখ টাকা পর্যন্ত। প্রতিমাসে এখন জাহাঙ্গীর হোসেন আয় করছেন প্রায় ৫০ হাজার টাকা। 

খামারি জাহাঙ্গীর হোসেন রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার বোয়ালিয়া ইউনিয়নের বড় বাংলাট গ্রামের আমির হোসেন ও জাহিদা বেগম দম্পতির ছেলে। দুই ভাই-বোনের মধ্যে জাহাঙ্গীর ছোট। তার স্ত্রী ও দুই ছেলে-মেয়ে রয়েছে।

জাহাঙ্গীরের সংগ্রহে রয়েছে, ৭০-৭৫ প্রজাতির বিদেশি মোরগ-মুরগি। এরমধ্যে ভিয়েতনামের এক জোড়া দংতাওয়ের দাম প্রায় দেড় লাখ টাকা। আমেরিকার ব্রাহামা, সেব্রাইট গোল্ডেন, সিল্কি, সিলভার সেব্রাইট, বাফ সেব্রাইট, পলিস ক্যাপ, ক্রেস্টেড ও পলিস ক্যাপমের এক জোড়ার দাম প্রায় এক লাখ টাকা। আরও আছে তুরস্কের উইন্ডোট, মিলি, বেলজিয়াম বিয়ার্ড, কলম্বিয়ার ব্রাহামা, ল্যাভেন্ডার ব্রাহমা, এরা কনা, বার্বু ডিনেভার, অনাকাডুরি, কসমো ও সবচেয়ে ছোট মুরগি মালয়েশিয়ার সেরমা। 

এসব মুরগি সংগ্রহ করতে তিনি ভারত, নেপাল, ভুটান, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ায় গেছেন। প্রতি জোড়া মুরগি সর্বোচ্চ দেড় লাখ টাকায় বিক্রি করছেন। এক বছর আগে খামারে যুক্ত হয়েছে ময়ূর, মেন্ডারিন হাঁস, কল্ডাক হাঁস, আমেরিকান উডডাক, কোকাটেল জাতের পাখি ও মালয় প্যাট্রিস। তার খামার থেকে বাচ্চা নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় অন্তত ২০টি খামার গড়ে উঠেছে।

খামারি মো. জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, আর্থিক অনটনে কলেজের পড়ালেখা শেষ করতে পারিনি। ২০০৮ সালে মালদ্বীপে যাই। সেখানে তেমন সুবিধা করতে পারিনি। ২০১১ সালের জুনের দিকে দেশে ফিরে আসি। ইউরোপের কোনো একটি দেশে যাওয়ার চেষ্টা করে দালাল চক্রকে দিই প্রায় ছয় লাখ টাকা। কিন্তু দালাল চক্র আমাকে ভারতের চেন্নাই শহরে নিয়ে ছেড়ে দেয়।

তিনি বলেন, ২০১১ সালের জুলাই মাসে চেন্নাই শহরে গিয়ে পৌঁছাই। উপায় না পেয়ে সেখানে মুরগির খামারে কাজ শুরু করি। বিভিন্ন জাতের বিদেশি মুরগি দেখে ভালো লাগে। প্রায় এক বছর পর সেখান থেকে দেশে ফিরে আসি। সেখান থেকে উপহার হিসেবে দুই জোড়া বিদেশি চায়নার সিল্কি ও কলম্বিয়ার ব্রাহামা জাতের মুরগি পেয়েছিলাম। দেশে ফিরে কিছুদিন সেগুলো লালনপালন করি। এরপর সিদ্ধান্ত নিই আর বিদেশে যাব না, দেশেই বিদেশি মুরগির খামার গড়ে তুলব।

জাহাঙ্গীর হোসেন জানান, ছোটবেলা থেকে পশু-পাখির প্রতি আলাদা ভালো লাগা কাজ করত আমার। ২০০৬ সালের শেষের দিকে যুব উন্নয়ন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র থেকে মুরগি পালনের ওপর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করি। বিদেশি মুরগি পালনের ক্ষেত্রে সেই প্রশিক্ষণ অনেক কাজে লেগেছে আমার।

জাহাঙ্গীর হোসেন আরও বলেন, প্রথমে শখের বশে দুই জোড়া মুরগি পালন করি। সেগুলো ডিম দেওয়া শুরু করলে বাণিজ্যিকভাবে খামার তৈরির চিন্তা করি। ২০১২ সালে অনলাইনে এবং ঢাকায় বিভিন্ন খামারিদের পরামর্শ নিয়ে খামারের যাত্রা শুরু। দিনে দিনে মুরগির সংখ্যা বাড়াতে থাকে। ২০১৬ সাল থেকে পুরোদমে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন শুরু হয়। মুরগি পালনের জন্য প্রায় ৮ লাখ টাকা ব্যয়ে ছোট-বড় পাঁচটি শেড নির্মাণ করি। এখন ডিম থেকে বাচ্চা ফোটানোর জন্য ইনকিবিউটর মেশিনও আছে। খামার থেকে মুরগির বাচ্চা বিক্রি করছি। সব মিলে প্রায় ৩৫ লাখ টাকার বিনিয়োগ করেছি। প্রতিমাসে খামারে খরচ হয় প্রায় এক লাখ টাকা। এখন খরচ বাদে প্রতি মাসে ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা আয় হচ্ছে।

রাজবাড়ী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. প্রকাশ রঞ্জণ বিশ্বাস এশিয়া পোস্টকে জানান, তরুণ উদ্যোক্তা জাহাঙ্গীরকে আমরা ধন্যবাদ জানাই। বেকারত্ব দূরীকরণে তিনি নিজে উদ্যোক্তা হয়ে আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। অন্য বেকার যুব সমাজের জন্য তিনি আদর্শ উদাহরণ।