Advertisement

পিরোজপুর/তীব্র লোডশেডিংয়ে ধুঁকছে বরফকল, সংকটে মৎস্য খাত

এশিয়া পোস্ট নিউজ, পিরোজপুর
তীব্র লোডশেডিংয়ে ধুঁকছে বরফকল, সংকটে মৎস্য খাত
ছবি: এশিয়া পোস্ট

ঘন ঘন লোডশেডিংয়ে পিরোজপুরে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। একই সাথে বিদ্যুৎ সংকটে বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছে জেলার বরফকলগুলো। সময়মতো বরফ না পাওয়ায় ইলিশের ভরা মৌসুমে অনেক জেলে নির্ধারিত সময়ে সাগরে যেতে পারছেন না। এতে মৎস্যনির্ভর অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

Advertisement

পিরোজপুরের পাড়েরহাট মৎস্য বন্দরে একসময় ১০টি বরফকল চালু থাকলেও নানা সমস্যায় বর্তমানে তা কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র দুটিতে। আর চালু থাকা এ দুটি বরফকলও নানা সংকটে ধুঁকছে। সম্প্রতি তীব্র বিদ্যুৎ সংকটের কারণে বরফ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় মালিক ও শ্রমিকরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। বিদ্যুৎ সংকটের কারণে গত ১০ থেকে ১২ দিনে এ পর্যন্ত প্রায় ১৪ থেকে ১৫ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করছেন মালিকরা।

বর্তমানে পাড়েরহাটের দীপ্তি চৈতী আইস অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজ ও রমনা আইস প্ল্যান্ট—এই দুটি বরফকলে মালিক-শ্রমিক মিলে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন কর্মরত রয়েছেন। ইলিশ ধরার মৌসুমে জেলেদের জন্য বরফ সরবরাহে এসব বরফকল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে চাহিদা অনুযায়ী বরফ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে বরফের জন্য জেলেদের অপেক্ষা করতে হচ্ছে এবং অনেকে সময়মতো মাছ ধরতে সাগরে যেতে পারছেন না।

বরফকলের শ্রমিকদেরও রয়েছে নানা দুর্ভোগ। বছরে ইলিশ ধরার ওপর দুই দফা নিষেধাজ্ঞার সময়ে বরফকলগুলো বন্ধ থাকায় শ্রমিকদের কর্মহীন থাকতে হয়। এতে আয়-রোজগার বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক শ্রমিককে মানবেতর জীবনযাপন করতে হয়। কারও কারও ঋণ থাকায় নিষেধাজ্ঞার সময় সংসারের খরচ চালানো আরও কঠিন হয়ে পড়ে।

শংকরপাশা ইউনিয়নের বাদুড়া গ্রামের বাসিন্দা ও রমনা আইস প্ল্যান্টের শ্রমিক মো. রাসেল বলেন, ইলিশ মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময়ে বছরে দুবার এই বরফকল বন্ধ থাকে। তখন পরিবারের খরচ চালাতে অনেক সমেস্যায় পড়তে হয়, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে খরচ চালিয়েছি। দুই থেকে তিনদিন আগে বেশকিছু দিন ধরে ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে সঠিকভাবে বরফ উৎপাদন করা যায়নি। দিনে ১২ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৩ থেকে ৪ ঘণ্টার বেশি বিদ্যুৎ থাকে নাই।

বরফকল। ছবি: এশিয়া পোস্ট
বরফকল। ছবি: এশিয়া পোস্ট

ট্রলার মালিক ও পার্শ্ববর্তী মোড়েলগঞ্জের চণ্ডীপুর গ্রামের বাসিন্দা মোকছেদ বেপারী বলেন, বিদ্যুৎ না থাকার কারণে বরফ উৎপাদন করতে পারছে না। এ কারণে আমরা বরফ পাচ্ছি না। এজন্য মাছ ধরতে সাগরে বোট পাঠাতে পারছি না। এই বর্ষায় ইলিশের ভরা মৌসুম কিন্তু মাছ শিকারে যেতে পারছি না। আমার দুটি ট্রলারে প্রায় ৩৫ জন জেলে আছে এদের সঠিকভাবে খরচ চালাতে হয়, তবে সাগরে সঠিক সময়ে না গেলে মাছ পাওয়া যায় না এবং মাছ না পেলে আমাদের অনেক টাকার ক্ষতি হয়।

দীপ্তি চৈতী আইস অ্যান্ড কোল্ড স্টোরেজের ম্যানেজার মো. নাজমুল বলেন, আমরা ৮ থেকে ৯ দিন ধরে বিদ্যুৎ সঠিকভাবে পাই না। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৫ থেকে ৬ ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাই তাও আবার ঘণ্টার পর ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে, এই সময়ের মধ্যে বরফ উৎপাদন করা যায় না। সঠিকভাবে বরফ উৎপাদন করতে হলে প্রায় ১৬ ঘণ্টা সময় লাগে। ট্রলারগুলো মাছ ধরার জন্য সাগরে যাবে কিন্তু তাদেরকে বরফ দিতে পারতেছি না, ছেড়ে দিতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, চলতি মাসে বিদ্যুৎ বিল আসছে প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকা কিন্তু আমরা শ্রমিকদের এখন পর্যন্ত বেতন দিতে পারি নাই, ভাবছি এই বিদ্যুৎ বিল কীভাবে দিব। সঠিকভাবে বিদ্যুৎ থাকলে প্রতিদিন প্রায় ১ থেকে দেড় লাখ টাকার বরফ বিক্রি করতে পারতাম। এই লোডশেডিংয়ের সময়ে আমাদের প্রায় ৫ থেকে ৬ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে।

রমনা আইস প্ল্যান্টের স্বত্বাধিকারী মনজ হালদার বলেন, পাড়েরহাটে এক সময় ১০টি বরফকল ছিল তবে বিভিন্ন সমস্যার কারণে বর্তমানে দুটি বরফকল টিকে আছে। বর্তমানে যে পরিস্থিতি এতে এ দুটি কলও চালানো আমাদের পক্ষে খুব কষ্ট হচ্ছে। এভাবে চললে আমরা কল চালাতে পারব না মনে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, আমরা তো মৎস্য নিয়েই কাজ করি। মাছ ধরায় যখন নিষেধাজ্ঞা থাকে তখন কিন্তু আমাদের এই কলও বন্ধ থাকে। এ সময় আমাদের বিভিন্ন ক্ষতি হয়, পাশাপাশি বর্তমানে বেশি ক্ষতি হয়েছে বিদ্যুতের সমস্যার কারণে। একটি বরফ হাউস তৈরি করতে বেশ কিছু টাকা খরচ হয়, তবে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে বিদ্যুৎ পেয়েছি মাত্র ৬ ঘণ্টা। এই সময়ের মধ্যে এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ চালালে দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। এতে যতটুকু বরফ তৈরি করি সেটুকু কিন্তু গলে যায়, যার কারণে এই কয়েকদিনে নয় লাখ টাকার লোকসান হয়েছে।

এদিকে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল নিয়ে গ্রাহকদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তাদের অভিযোগ, আগের তুলনায় বর্তমানে বিদ্যুৎ বিল অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেছে। দু’তিন মাস আগে যে পরিমাণ বিল আসত, বর্তমানে তাদের প্রায় দ্বিগুণ বিল পরিশোধ করতে হচ্ছে।

পাড়েরহাট ইউনিয়নের টগড়া গ্রামের বাসিন্দা ও চা দোকানি মো. বাদশা হাওলাদার বলেন, আমার দোকানের বিদ্যুৎ বিল আগের থেকে বর্তমানে অনেক বেশি আসে। দুই থেকে তিন মাস আগে বিল আসত ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা, বর্তমানে বিল আসে ১০০০ থেকে ১২০০ টাকা। বিদ্যুৎ অফিসে গিয়েও সমাধান পাইনি।

পিরোজপুর পৌরসভার মাছিমপুর এলাকার বাসিন্দা ক্ষুদ্র মাছ ব্যবসায়ী মো. জাকির হোসেন বলেন, বিদ্যুৎ না থাকার কারণে অনেক সমস্যা হচ্ছে। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে। এছাড়া বর্তমানে বিদ্যুৎ বিল অনেক বেশি আসে।

ছবি: এশিয়া পোস্ট
ছবি: এশিয়া পোস্ট

এ বিষয়ে পিরোজপুর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার মো. আলতাপ হোসেন বলেন, গত সপ্তাহে সারাদেশে লোডশেডিং ছিল। এলএনজি টার্মিনাল ডিজওয়াটার হয়েছিল, যার জন্য আমাদের পাইপলাইনে বিদ্যুৎ না আসায় একটু সমস্যা হয়েছে। তবে ১৮ ঘণ্টা বিদ্যুৎ ছিল না, এটা ঠিক না। আমরা এক ঘণ্টা পর পর লোডশেডিং দিয়েছি। এছাড়া গত দুদিনে আংশিক লোডশেডিং ছিল, বর্তমানে আমাদের কোনো লোডশেডিং নেই। এর পরে আরও ভালো হবে যেহেতু এলএনজি টার্মিনালের বিদ্যুৎ আমাদের পাইপলাইনে অলরেডি চলে আসছে।

বিদ্যুতের অতিরিক্ত বিলের অভিযোগের বিষয়ে তিনি আরও বলেন, বিদ্যুৎ বিল বেশি আসার বিষয়ে গ্রাহকরা জানালে আমরা সেটা অবশ্যই কারেকশন করে দিব। বিদ্যুৎ বিল বেশি বা কম করার কোনো সুযোগ নেই।

বিষয় :