খাল খননের মাটিতে চাপা পড়ছে হতদরিদ্রদের আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘর

খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, কাঁঠালতলা এবং খর্নিয়া এলাকার সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্প লাগোয়া বুড়িভদ্রা নদী খননের কাজ শুরু হয়েছে। তবে নদী খনন করতে গিয়ে যত্রতত্র মাটি ফেলার কারণে অনেক জায়গায় আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলোর ওপর মাটি এসে পড়েছে। এতে ঘরগুলোতে বসবাস করা এবং নদীগর্ভে ধসে পড়ার হুমকিতে পড়েছে পরিবারগুলো।
সরেজমিনে দেখা গেছে, খালের মাটির কারণে কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাদের খাবার পানির তিনটি টিউবওয়েলের মধ্যে দুটিই ইতোমধ্যে নষ্ট হয়ে গেছে। ভেঙে ফেলা হয়েছে বেশির ভাগ ঘরের টয়লেট। খর্নিয়া ও কাঁঠালতলা এলাকার বেশ কয়েকটি পরিবার তাদের ঘরের খাট, হাঁড়ি-পাতিলসহ যৎসামান্য আসবাবপত্র বাইরে বের করে খোলা আকাশের নিচে এনে রেখেছেন। কখন তাদের শেষ সম্বলটুকু ভেঙে পড়বে, সেই প্রহর গুনছেন তারা।
রোববার (১৪ জুন) দুপুরে ওই এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নদী থেকে তোলা পলিমাটির প্রচণ্ড চাপে ঘরগুলোর পেছনের দেয়াল ও জানালা ভেঙে ভেতরে কাদা ঢুকে গেছে। নদী খননের মাটি যেভাবে ঘরের গা ঘেঁষে স্তূপ করে রাখা হয়েছে, তাতে যেকোনো মুহূর্তে পুরো ঘর ধসে পড়ার আশঙ্কা করছেন দরিদ্র বাসিন্দাদের। তাদের এখন খাবার রান্না করার জায়গা নেই, শিশুদের নিয়ে ঘুমানোর নিরাপদ আশ্রয় নেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্প-২ এর আওতায় ২০২১ সালের ২৩ জানুয়ারি ও ২০ জুন এবং ২০২২ সালে—তিনটি ধাপে ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর, খর্নিয়া এবং কাঁঠালতলা এলাকায় শতাধিক ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করে তৎকালীন সরকার। চুকনগর, খর্নিয়া এবং কাঁঠালতলা এলাকায় খাস জমি চিহ্নিত করে দুই কক্ষবিশিষ্ট সেমিপাকা ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়। জমিসহ ঘরের দলিল হস্তান্তর করা হয় হতদরিদ্র মানুষগুলোকে। যারা একসময় রেললাইনের ধারে বা অন্যের বারান্দায় রাত কাটাতেন।
অন্যদিকে যশোর ও খুলনার ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা নিরসনে হরিহর, হরি-তেলিগাতী, আপারভদ্রা, টেকা ও শ্রী নদীর ৮১ দশমিক ৫ কিলোমিটার পুনঃখননকাজের উদ্যোগ নেয় সরকার।
চলতি বছরের জানুয়ারিতে ডুমুরিয়া উপজেলার চুকনগর বাজার সংলগ্ন এলাকায় নদী খননের কারণে ভেঙে ফেলা হয় ৮০টি পরিবারের শেষ আশ্রয়স্থল। নির্বাচনের সময় সব দলের নেতাকর্মীরা গৃহহীন এই মানুষদের ‘নির্বাচনের পরে সব ঠিক করে দেওয়ার’ প্রতিশ্রুতি দিলেও তা এখনও আলোর মুখ দেখেনি। উল্টো গত মে মাসজুড়ে নতুন করে বিপাকে পড়েছে কাঁঠালতলার ২৬টি এবং খর্নিয়া এলাকার আরও ২৫টি পরিবার।
কাঁঠালতলা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা রহিমা বেগম (৬৫) অশ্রুসিক্ত চোখে বলেন, ‘নদীতে ভাঙনে সব হারায়ে এইহানে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই পাইছিলাম বাবা। সরকার ঘর দিছিল। এহন নদীর কাদা মাটি এনে আমাদের ঘরের ওপর ফেলছে। ঘরের দেয়াল চড়চড় করে ফাটতেছে। রাইতে ঘুমাতে পারি না, মনে হয় এই বুঝি মাটি চাপা পড়ে মরে গেলাম। জিনিসপত্র সব বাইরে এনে রাখছি।’
খর্নিয়া এলাকার দিনমজুর আব্দুল জলিল বলেন, ‘নদী কাটার সময় মেশিন দিয়ে ঘরের একদম গোড়া পর্যন্ত গর্ত করা হয়েছে। একটু বৃষ্টি হলেই ঘরগুলো নদীতে ধসে পড়বে। আমরা গরিব মানুষ, আমাদের তো আর যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। বাথরুম সব ভেঙে দেওয়া হয়েছে। তিনটি পানির কলের দুটিই নষ্ট। এখন ২৬ পরিবারের একমাত্র ভরসা একটি মাত্র টিউবওয়েল।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সবিতা সরকার ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘ডুমুরিয়ার বরাতিয়া, কাঁঠালতলা ও খর্নিয়ার গৃহহীন পরিবারের ঘরগুলোতে নদী খননের মাটি উঠে গেছে, এই ঘটনা সত্য। আমি ইতোমধ্যে যশোর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলেছি। ওনারা বিষয়টি অবগত এবং খুব তাড়াতাড়ি ভূমিহীন এসব পরিবারের জন্য ব্যবস্থা নেবেন।’
চুকনগরের উচ্ছেদ হওয়া পরিবারগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘চুকনগরের যে পরিবারগুলো ছিল, তারা এখন পাশের হাটের জায়গায় বসবাস করছে। কিছুদিন আগে কয়েকটি পরিবারকে অন্য আশ্রয়ণ প্রকল্পে সরিয়ে নেওয়ার জন্য প্রস্তাব দেওয়া হলেও তারা সেখানে যাননি। পুরো বিষয়টি জেলা প্রশাসক স্যারকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।’


