logo
Advertisement

শারীরিক বাধায়ও দমে যাননি শিক্ষক অপূর্ব মণ্ডল, পাঠদানে মুগ্ধ শিক্ষার্থীরা

শারীরিক বাধায়ও দমে যাননি শিক্ষক অপূর্ব মণ্ডল, পাঠদানে মুগ্ধ শিক্ষার্থীরা
হুইলচেয়ারে বসে শিক্ষার্থীদের পাঠ দান করছেন শিক্ষক অপূর্ব লাল মণ্ডল। ছবি : এশিয়া পোস্ট

দুই পায়ে শক্তি নেই। দীর্ঘদিন ধরে স্বাভাবিকভাবে হাঁটতে পারেন না। নিজের কর্মস্থল বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার জন্য এখন তার ভরসা একটি হুইলচেয়ার। বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে কখনও শিক্ষার্থীরা এগিয়ে আসে, আবার বাড়ি ফিরতে তারাই তার ভরসা। তবে এত সব সীমাবদ্ধতাও তাকে দমাতে পারেনি। তার কাছে বিদ্যালয়ে যাওয়া শুধু কর্মস্থলে উপস্থিত হওয়া নয়, যেন নতুন প্রজন্মের কাছে দায়িত্ব পালনের অঙ্গীকার।

এভাবেই প্রতিদিন হুইলচেয়ারে করে বিদ্যালয়ে এসে শিক্ষার্থীদের পাঠদান করে চলেছেন ফরিদপুরের মধুখালী উপজেলার বামন্দী বালিয়াকান্দী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক অপূর্ব লাল মণ্ডল।

অপূর্ব মণ্ডল জানান, জন্মের পর স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে ওঠেন তিনি। পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সময় পায়ে সমস্যা দেখা দেয়। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেটি জটিল হতে থাকে। তবু পড়াশোনা বন্ধ করেননি। স্কুল, কলেজ শেষে করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি।

জানা গেছে, ১৯৯৯ সালে নিজ এলাকা বামন্দী বালিয়াকান্দী মাধ্যমিক বিদ্যালয়েই শিক্ষকতা শুরু করেন অপূর্ব লাল মণ্ডল। তখন সুস্থ-স্বাভাবিক ছিলেন। কয়েক বছর পর ধীরে ধীরে তার পায়ে সমস্যা শুরু হয়। আস্তে আস্তে শক্তি কমতে থাকে। একসময় দুই পায়ে ভর করে চলাফেরা করাও অসম্ভব হয়ে পড়ে।

চিকিৎসকের পরামর্শে গত প্রায় ১০ বছর ধরে হুইলচেয়ারে করে চলাচল করেন তিনি। কিন্তু শারীরিক এই প্রতিবন্ধকতাতেও পেশাগতভাবে দমে যাননি। প্রতিদিন বিদ্যালয়ে পৌঁছাতে কখনো একাধিক শিক্ষার্থীর সহযোগিতা নিতে হয় তাকে। কেউ হুইলচেয়ার এগিয়ে দেয়, কেউ হাত বাড়িয়ে সাহায্য করে। আবার পাঠদান শেষে বাড়ি ফেরার সময়ও শিক্ষার্থীরাই তার শেষ ভরসা।

শিক্ষক অপূর্ব মণ্ডলের আন্তরিকতা, যত্ন ও পাঠদানে শিক্ষার্থীরা মুগ্ধ হয়। ছবি: এশিয়া পোস্ট
শিক্ষক অপূর্ব মণ্ডলের আন্তরিকতা, যত্ন ও পাঠদানে শিক্ষার্থীরা মুগ্ধ হয়। ছবি: এশিয়া পোস্ট

তবে শিক্ষার্থী-শিক্ষকের এই সম্পর্ক শুধু সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। যে শিক্ষার্থীরা তাকে বিদ্যালয়ে ও বাড়িতে পৌঁছে দেয়, তারাই শ্রেণিকক্ষে তার কাছ থেকে আন্তরিকতা ও স্নেহের সঙ্গে ইংরেজি ও বিজ্ঞানের পাঠ নেয়। তার পাঠদানের ধরন, বিষয়ভিত্তিক ব্যাখ্যায় শিক্ষার্থীও সন্তুষ্ট।

শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, তাদের কাছে অপূর্ব মণ্ডল শুধু একজন শিক্ষক নন, তিনি ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণার একজন মানুষ। অপূর্ব মণ্ডলের ক্লাসে তার শারীরিক সীমাবদ্ধতার কোনো সমস্যাই তারা অনুভব করে না। বরং তার আন্তরিকতা, যত্ন ও পাঠদানের দক্ষতায় শিক্ষার্থীরা মুগ্ধ হয়।

বামন্দী বালিয়াকান্দী মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ফারদিন ইসলাম বলে, ‘স্যারকে আমরা শুধু ক্লাসে পড়ানোর মানুষ হিসেবে দেখি না, তিনি আমাদের অনেকটা অভিভাবকের মতো। স্যার হুইলচেয়ারে করে স্কুলে আসেন, আর আমরা তাকে সহযোগিতা করতে পারলে নিজেদের গর্বিত মনে করি। স্যারের কাছ থেকে আমরা শুধু ইংরেজি বা বিজ্ঞান শিখি না, জীবনে প্রতিকূলতার মধ্যেও কীভাবে এগিয়ে যেতে হয়, সেটিও শিখি।’

আরেক শিক্ষার্থী ইমরুল কায়েস বলে, ‘স্যার যখন স্কুলে আসেন, তখন তাকে সাহায্য করার জন্য আমাদের মধ্যে একধরনের আগ্রহ তৈরি হয়। স্যার আমাদের যে ভালোবাসা দিয়ে পড়ান, তার প্রতি আমাদেরও অনেক ভালোবাসা। তিনি কখনো নিজের কষ্টের কথা বলে ক্লাসে মনোযোগ হারান না। বরং হাসিমুখে পড়ান, উৎসাহ দেন। স্যারের এই মনোভাব আমাদের অনুপ্রাণিত করে।’

বিদ্যালয়ের সহকর্মীদের কাছেও অপূর্ব লাল মণ্ডল একজন দায়িত্বশীল শিক্ষক।

তারা জানান, শারীরিক প্রতিকূলতার মধ্যেও নিয়মিত পাঠদান চালিয়ে যাওয়া তার কাছে কোনো বিশেষ কৃতিত্ব নয়; বরং এটি তার স্বাভাবিক দায়িত্ব। হয়তো তিনি নিজের পায়ে হেঁটে বিদ্যালয়ে যেতে পারেন না। কিন্তু প্রতিদিন তার পাঠ, উৎসাহ ও আদর্শে বহু শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ এগিয়ে যাচ্ছে।