logo
Advertisement

প্রশাসনের কাছে ৫ দিন ঘুরেছি, কোনো গুরুত্ব দেয়নি: নিহত শিশুর বাবা

প্রশাসনের কাছে ৫ দিন ঘুরেছি, কোনো গুরুত্ব দেয়নি: নিহত শিশুর বাবা
বাড়ির পেছন থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় কলির টুকরো টুকরো মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। ইনসেটে শিশু কলি। ছবি: এশিয়া পোস্ট

মেয়েকে জীবিত ফিরে পাওয়ার আশায় গতকাল মঙ্গলবারও রাস্তায় দাঁড়িয়েছিলেন বাবা-মা ও এলাকাবাসী। হাতে ছিল দাবি— নিখোঁজ ১০ বছরের কামরুন্নাহার কলিকে খুঁজে বের করে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে হবে। কিন্তু মানববন্ধনের একদিন পরই মিলল সেই শিশুর মরদেহ।নিহত শিশুর বাবারি দাবি, প্রশাসনের কাছে ৫ দিন ঘুরেছি, কোনো গুরুত্ব দেয়নি।

বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) সকাল ৭টার দিকে পাবনা সদর উপজেলার দোগাছী কলুনিয়া গ্রামের নিজ বাড়ির পেছন থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় কলির টুকরো টুকরো মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।

নিহত কামরুন্নাহার কলি ওই গ্রামের কামাল প্রামাণিকের (৪০) মেয়ে। মরদেহ উদ্ধারের পর কান্নায় ভেঙে পড়েন তার বাবা কামাল প্রামানিক ও মা মোছা. বিউটি আক্তার। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। দূরদূরান্ত থেকে মরদেহ দেখতে ভিড় করছেন জনগণ।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত ৯ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় বাবার সঙ্গে স্থানীয় শ্রীপুর বাজারে যায় কলি। বাজার শেষে বাবার সঙ্গে বাড়িতে ফিরে মায়ের হাতে বাজারের ব্যাগ তুলে দেয় সে। এরপর বাড়ির পাশের দিকে যায়। কিন্তু সন্ধ্যা পেরিয়ে গেলেও আর বাড়িতে ফেরেনি।

মেয়ের কোনো খোঁজ না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা আশপাশের বাড়ি, প্রতিবেশী ও সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি শুরু করেন। একপর্যায়ে বাড়ি থেকে প্রায় ২০০ গজ দূরে কলির পরা স্যান্ডেল পাওয়া যায়। পরে পাবনা সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তার বাবা।

এরপর টানা সাত দিন আত্মীয়-স্বজনের বাড়িসহ সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে মেয়ের সন্ধান চালান পরিবারের সদস্যরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও কলির ছবি দিয়ে সন্ধান চাওয়া হয়।

গত মঙ্গলবার (১৫ সেপ্টেম্বর) কলিকে উদ্ধারের দাবিতে পাবনা প্রেসক্লাবের সামনে মানববন্ধন করেন দোগাছী কলুনিয়া গ্রামের বাসিন্দা ও স্বজনরা। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যান তারা। পরে জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার বরাবর স্মারকলিপি দিয়ে দ্রুত শিশুটিকে উদ্ধারের দাবি জানান। কিন্তু সেই দাবির পরদিনই আসে হৃদয়বিদারক খবর। বুধবার সকালে বাড়ির পেছনে পাওয়া যায় কলির মরদেহ।

কলির বাবা কামাল প্রামানিক অভিযোগ করে বলেন, প্রশাসনের কাছে আমি পাঁচ দিন ঘুরেছি। প্রশাসন আমাকে কোনো সময় দেয়নি। পুলিশ মাঠে না নেমে আমার বাসায় এসে ঘুরে চলে যেত। গতকাল মানববন্ধন করার পর রাত ১২টার দিকে থানায় মামলা এন্ট্রি করাই। পরদিন সকালেই আমার মেয়ের লাশ দেখতে পাই। আমি এই ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিচার চাই।

কলির মা মোছা. বিউটি আক্তার বলেন, আমার মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই ফেসবুকের মাধ্যমে মেয়ের সন্ধান চেয়ে আসছিলাম। আজ আমার মেয়ের মৃতদেহ উদ্ধার করতে হলো। আমি আমার মেয়ের খুনিদের ফাঁসি চাই।

বাংলাদেশ কিন্ডারগার্টেন অ্যাসোসিয়েশনের পাবনা জেলা শাখার সভাপতি মাহফুজুর রহমান বলেন, পাবনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি দুর্বল থাকার কারণেই এ ধরনের ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটেছে। সাত দিন হয়ে গেলেও শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি, শেষ পর্যন্ত মৃতদেহ উদ্ধার করতে হলো। এতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

তিনি বলেন, প্রশাসন যেহেতু শিশুটিকে জীবিত উদ্ধার করতে পারেনি, তাই ২৪ ঘণ্টার মধ্যে এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের গ্রেপ্তার করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন অবস্থায় আমরা শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি।

তবে পুলিশের দাবি, শিশুটি নিখোঁজ হওয়ার পর থেকেই ঘটনাটি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছিল। পুলিশের কোনো গাফিলতি ছিল না।

পাবনার পুলিশ সুপার মো. আবু আশরাফ এশিয়া পোস্টকে বলেন, নিখোঁজের ঘটনার পর থেকেই থানা পুলিশ তাৎক্ষণিকভাবে কাজ শুরু করেছিল। গতকাল আমার সঙ্গে কথা হলে অপহরণ মামলা নেওয়া হয়েছে। আর আজ সকালে লাশটি পাওয়া গেছে। আমার ধারণা, গতকাল রাতে দুষ্কৃতিকারীরা লাশটি এখানে ফেলে গেছে।

তিনি আরও বলেন, খুনের রহস্য উদঘাটন ও আসামিদের গ্রেপ্তারের জন্য জেলা পুলিশের গোয়েন্দা টিম, থানার টিমসহ সবাই গুরুত্বসহকারে কাজ করছে। দ্রুত ঘটনার রহস্য উদঘাটন করে জড়িতদের গ্রেপ্তার করা হবে।