বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের জন্মবার্ষিকী আজ

মাটি, মানুষ ও তুলির আঁচড়ে গ্রামবাংলার জীবনচিত্রকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরা বরেণ্য চিত্রশিল্পী এস এম সুলতানের ১০৩তম জন্মবার্ষিকী আজ। কালজয়ী এই শিল্পীর জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে তার জন্মভূমি নড়াইলে দিনব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করা হয়েছে। একই সঙ্গে এ বছর শিল্পীর নামে প্রবর্তিত ঐতিহ্যবাহী ‘সুলতান সম্মাননা পদক-২০২৬’ দেওয়া হচ্ছে বিশিষ্ট চিত্রশিল্পী ও শিল্পশিক্ষাবিদ ড. মো. আব্দুস সাত্তারকে।
শিল্পী এস এম সুলতান ১৯২৪ সালের ১০ আগস্ট তৎকালীন নড়াইল মহকুমার মাছিমদিয়া গ্রামে বাবা মেছের আলী ও মা মাজু বিবির কোলে জন্মগ্রহণ করেন। তার পুরো নাম শেখ মোহাম্মদ সুলতান। শৈশবকাল থেকেই ছবি আঁকার প্রতি প্রবল ঝোঁক ছিল তার। পরবর্তী সময়ে নিজস্ব অনন্য শিল্পরীতিতে বাংলার কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ, প্রকৃতি ও গ্রামীণ আবহকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলে তিনি দেশের চারুশিল্পাঙ্গনে এক অবিস্মরণীয় অবস্থান তৈরি করেন।
সুলতানের উল্লেখযোগ্য কালজয়ী শিল্পকর্মের মধ্যে রয়েছে— ‘পাট কাটা’, ‘ধান কাটা’, ‘ধান ঝাড়া’, ‘ধান মাড়াই’, ‘ধান ভানা’, ‘চর দখল’, ‘জমি কর্ষণে যাত্রা’, ‘মাছ ধরা’, ‘নদীর ঘাটে’, ‘গুন টানা’, ‘ফসল কাটার ক্ষণে’, ‘শরতের গ্রামীণ জীবন’ ও ‘শাপলা তোলা’। তার আঁকা প্রতিটি চিত্রে কর্মজীবী মানুষের শারীরিক শক্তি, জীবনসংগ্রাম এবং বাংলার মাটির সঙ্গে মানুষের নিবিড় আত্মিক সম্পর্ক বিশেষভাবে ফুটে উঠেছে।
চিত্রশিল্পে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ এস এম সুলতান ১৯৮২ সালে একুশে পদক, ১৯৮৪ সালে বাংলাদেশ সরকারের রেসিডেন্ট আর্টিস্ট স্বীকৃতি, ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চারুশিল্পী সংসদ সম্মাননা এবং ১৯৯৩ সালে স্বাধীনতা পদকে ভূষিত হন। এ ছাড়া দেশ-বিদেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান থেকেও তিনি একাধিক সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।
১৯৯৪ সালের ১০ অক্টোবর চিকিৎসাধীন অবস্থায় যশোর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) মৃত্যুবরণ করেন প্রখ্যাত এই শিল্পী। পরবর্তীতে তার স্মৃতিবিজড়িত জন্মভূমি নড়াইল শহরের কুড়িগ্রাম এলাকায় এস এম সুলতান সংগ্রহশালা চত্বরে তাকে পূর্ণ সমাদরে সমাহিত করা হয়।
শিল্পীর ১০৩তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সোমবার (১০ আগস্ট) সকালে এস এম সুলতান শিশু স্বর্গে কোরআনখানি, তার সমাধিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন, আর্ট ক্যাম্প, শিশু-কিশোরদের চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, আলোচনা সভা ও মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
এস এম সুলতান সংগ্রহশালার কিউরেটর তন্দ্রা মুখার্জী জানান, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে এবং চারুকলা বিভাগের ব্যবস্থাপনায় এবার সুলতানের জন্মবার্ষিকী উদ্যাপিত হচ্ছে। পুরো আয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করছে এস এম সুলতান সংগ্রহশালা, জেলা শিল্পকলা একাডেমি ও নড়াইল জেলা প্রশাসন।
তিনি আরও উল্লেখ করেন, শিল্পী সুলতানের স্মৃতি ও অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাতে প্রতিবছর গুণী শিল্পীদের ‘সুলতান সম্মাননা পদক’ দেওয়া হয়। এ বছর এ সম্মাননার জন্য মনোনীত হয়েছেন চিত্রশিল্পী ড. মো. আব্দুস সাত্তার। জন্মবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠানে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী তার হাতে এই সম্মাননা পদক তুলে দেবেন।
পদকপ্রাপ্ত ড. আব্দুস সাত্তার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের ড্রইং অ্যান্ড পেইন্টিং বিভাগে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা ও শিক্ষকতা করেছেন। প্রাচ্য শিল্পরীতি, ঐতিহ্যবাহী ভারতীয় ও প্রাচ্য ম্যুরাল এবং আধুনিক শিল্পভাবনার মেলবন্ধনে শিল্পকর্ম সৃষ্টিতে তার বিশেষ খ্যাতি রয়েছে। শিল্পকলায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি একুশে পদক-২০২৬ লাভ করেন। তার রচিত ২০টিরও বেশি গবেষণা ও শিল্পবিষয়ক প্রকাশনা রয়েছে, যার বেশ কয়েকটি কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে রেফারেন্স বই হিসেবে পঠিত হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আবদুল ছালামের সভাপতিত্বে আয়োজিত উক্ত স্মারক অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চু ও নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলমের।
নড়াইলের মাটি ও মেহনতি মানুষের জীবনকে শিল্পের প্রাঞ্জল ভাষায় রূপ দেওয়া এস এম সুলতান আজও দেশের শিল্পপ্রেমীদের হৃদয়ে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় ভাস্বর। জন্মবার্ষিকীর এই আয়োজনের মধ্য দিয়ে আরও একবার পরম শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হচ্ছে এই মহীয়সী শিল্পী ও তার শিল্পদর্শনকে।
.png)


