অফিস সহকারী শফিকুলের ‘আলাদিনের চেরাগ’, স্বর্ণ-ফ্ল্যাটসহ কোটি কোটি টাকার সম্পদ

সরকারি চাকরির ১৬তম গ্রেডের একজন অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক। চাকরিতে যোগ দিয়েছেন প্রায় ৩৩ বছর আগে। মাস শেষে নির্ধারিত বেতন আর সীমিত আয়ের মধ্যেই চলে এমন কর্মচারীদের জীবনযাপন। কিন্তু সেই চাকরিজীবনের আড়ালে গড়ে উঠেছে বিপুল সম্পদের পাহাড়।
কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ে কর্মরত অফিস সহকারী মো. শফিকুল ইসলামের দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী ও স্থানীয় সূত্র পর্যালোচনা করে তার এবং পরিবারের নামে এই বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
তথ্য অনুযায়ী, শফিকুল ইসলাম ১৯৯৩ সালের ২৬ ডিসেম্বর সরকারি চাকরিতে যোগদান করেন। দীর্ঘ চাকরি জীবনে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল, কুমিল্লার বরুড়া ও বর্তমানে মুরাদনগর উপজেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন।
তার পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী তাছলিমা আক্তার (গৃহিণী), দুই মেয়ে ও এক ছেলে। বড় মেয়ে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে, ছোট মেয়ে কুমিল্লার ইবনে তাইমিয়া স্কুল অ্যান্ড কলেজে ও ছেলে কুমিল্লা জিলা স্কুলে পড়াশোনা করছে। তিন ছেলেমেয়ের নামী-দামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খরচ ও পাঁচ সদস্যের সংসারের ন্যূনতম ব্যয় মিলিয়ে এই পরিবারের মাসিক খরচ প্রায় ৮০ হাজার টাকা। একজন নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীর সীমিত আয়ের সাথে এই জীবনযাত্রার ব্যয় এবং বিশাল সম্পদের বৈপরীত্য স্থানীয় সচেতন মহলের মধ্যে তীব্র বিস্ময়ের জন্ম দিয়েছে।
গোপন সূত্রে পাওয়া শফিকুলের সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী, শফিকুল ইসলাম ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে উল্লেখ করা সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ কোটি ৬২ লাখ টাকার। তবে এই সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য দ্বিগুণেরও বেশি বলে দাবি স্থানীয়দের। এ ছাড়া সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ না থাকা বাড়ি, জমি ও ফ্ল্যাটের খোঁজ পাওয়া গেছে। যার আনুমানিক মূল্য প্রায় সাড়ে তিন কোটি টাকার বেশি।
সম্পদ বিবরণী অনুযায়ী, তার ব্যাংকে জমা ও গচ্ছিত অর্থ রয়েছে প্রায় ৯ লাখ টাকার বেশি। নগদ অর্থ রয়েছে ৫০ হাজার টাকা। এ ছাড়া জিপিএফ/সিপিএফ খাতে জমা রয়েছে ৩০ লাখ টাকারও বেশি। নিজের ও স্ত্রীর নামে ৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকার আসবাবপত্র ও ইলেকট্রনিক সামগ্রীর হিসাব দেখিয়েছেন তিনি।
তবে সবচেয়ে বেশি আলোচনার জন্ম দিয়েছে তার স্বর্ণালংকারের হিসাব। সম্পদ বিবরণীতে তিনি নিজের নামে ৫ ভরি ও স্ত্রীর নামে ২২ ভরি, মোট ২৭ ভরি স্বর্ণের তথ্য দিয়েছেন। এসব স্বর্ণের উৎস হিসেবে ‘উপহার’ উল্লেখ করা হলেও কোনো মূল্য দেখানো হয়নি। বর্তমান বাজারদরে যার মূল্য আনুমানিক ৬৪ লাখ টাকার বেশি।
স্থাবর সম্পদের তালিকায় কুমিল্লার আদর্শ সদর ও দেবিদ্বার উপজেলার বিভিন্ন মৌজায় শফিকুলের নামে বিপুল পরিমাণ কৃষি ও অকৃষি জমির মালিকানা রয়েছে।

২০১৪ সালে আদর্শ সদর উপজেলার খেতাসার ও কৃষ্ণনগর মৌজায় ১৪ শতক কৃষি জমি ১৬ লাখ ২৫ হাজার টাকায় ক্রয়ের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থের উৎস হিসেবে দেখানো হয়েছে অতীত সঞ্চয় ও স্ত্রীর কাছ থেকে নেওয়া ঋণ।
এ ছাড়া ২০০৮ সালে কৃষ্ণনগর মৌজায় সাড়ে চার শতক জমি ৬ লাখ ৬০ হাজার টাকায় কেনা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে। ওই অর্থের উৎস হিসেবে অতীত সঞ্চয়, সেলাই কাজ এবং প্রাইভেট টিউশনের আয় দেখানো হয়েছে।
দেবিদ্বার উপজেলার কাশারিখোলা মৌজায় স্ত্রীর নামে ১৬ শতক জমি হেবা-বিল-এওয়াজ দলিলের মাধ্যমে অর্জিত হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানে আরও একাধিক জমির মালিকানার তথ্য সম্পদ বিবরণীতে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে সম্পদ বিবরণীতে আদর্শ সদর উপজেলার মনোহরপুর মৌজায় ১ হাজার ৪২০ বর্গফুট আয়তনের একটি ফ্ল্যাটের তথ্য দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালে ২৬ লাখ টাকায় ফ্ল্যাটটি কেনা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
তবে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, মনোহরপুর এলাকায় তার নামে থাকা সম্পত্তির প্রকৃত মূল্য ঘোষিত মূল্যের এক কোটি টাকা বেশি হতে পারে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে জানা গেছে, সম্পদ বিবরণীতে ঘোষিত সম্পত্তির বাইরেও শফিকুলের একটি চারতলা ভবন ও বিস্তীর্ণ জায়গাজুড়ে নির্মিত আরেকটি ডুপ্লেক্স সদৃশ স্থাপনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, জমিসহ এসব দৃশ্যমান স্থাপনার বর্তমান বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা। সম্পদ বিবরণীতে আয়ের উৎস হিসেবে বেতনের অংশ, সঞ্চয়পত্রের মুনাফা, সেলাই ও টিউশনি দেখানো হলেও তা দিয়ে এই রাজকীয় সম্পত্তি অর্জন কোনোভাবেই সম্ভব নয় বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, একজন নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারীর ঘোষিত ও প্রকৃত সম্পদের মধ্যে যে আকাশপাতাল তফাত রয়েছে, তা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) কর্তৃক নিরপেক্ষভাবে তদন্ত হওয়া প্রয়োজন।
এ বিষয়ে অফিস সহকারী সফিকুল ইসলাম এশিয়া পোস্টকে বলেন, ‘আমার কিছুই বলার নাই। আমার উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আছে। ডিপার্টমেন্ট জানে। এই বিষয়ে আমার কিছু বলার নাই।’
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবেদ আলী এশিয়া পোস্টকে বলেন, অভিযোগের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের কাজ ও ব্যয়ের তথ্য যাচাই করা হবে। তদন্তে কোনো অনিয়ম বা দায়িত্বে অবহেলার প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

